দুই পৃথিবী

 

দুই পৃথিবী


ড্রয়িংরুমের বাতাসটা তখন বরফের মতো জমে গেছে। সায়নের কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, আর ও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কাঁপছে। ও হয়তো ভাবছিল আমি এখনই চিৎকার করব, ওর কলার চেপে ধরব কিংবা আফরিনের সামনে ওর আসল রূপটা ফাঁস করে দেব। কিন্তু আমি সায়নকে এত সহজে মুক্তি দেব না। মানসিক যন্ত্র*ণার যে নর*কে আমি গত ২৪ ঘণ্টা ধরে পু*ড়ছি, ওকেও আমি সেই নর*কের স্বাদ দেব। তবে বিষাক্ত কোনো উপায়ে নয়, একদম ধীরস্থির এবং শৈল্পিক উপায়ে।
আমি সোফা থেকে ব্যাগটা হাতে নিলাম। তারপর আফরিন আর সায়নের দিকে তাকিয়ে মুখে একটা মায়াবী, মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তুললাম।
আফরিনের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আন্তরিক গলায় বললাম, "আফরিন, এই যুগে এসে এত কেয়ারিং আর ভালো একটা স্বামী পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। আপনার স্বামী আপনাকে কতটা ভালোবাসে, তা ওনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আপনাদের দুজনের জন্য আমার মন থেকে দোয়া রইল। আজকে আমি আসি, ভালো থাকবেন আপনারা।"
আফরিন আমার এই আকস্মিক প্রশংসায় যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। ও লাজুক হেসে বলল, "অনেক ধন্যবাদ ম্যাম। ওনার মতো মানুষ সত্যিই ভাগ্য করে পাওয়া যায়।"
আমি এবার দরজার দিকে পা বাড়ালাম। যাওয়ার সময় দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে সায়নের দিকে সরাসরি তাকালাম। সায়নের চোখ দুটো তখন অপরা*ধবোধ আর তীব্র ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। ও পলকহীন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন ও কোনো জীবন্ত বো*মার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—যা যেকোনো মুহূর্তে ফে*টে যেতে পারে।
আমি সায়নের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম, "আপনার বউয়ের বেশি বেশি যত্ন নিবেন এখন। এই সময় একজন বিশ্বস্ত আর ভালোবাসার মানুষ প্রয়োজন একজন নারীর জীবনে। আপনার মতো স্বামী তো আর সবার কপালে জুটে না। ভালো থাকবেন।"
কথাটা শেষ করেই আমি ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে এলাম। লিফটের ভেতরে আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। আমার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল। সায়নকে আমি যে মানসিক টর্চারের মধ্যে রেখে এসেছি, ও এখন প্রতি সেকেন্ডে ম*রবে। ও এখন ভাববে—আফ্রা কি সত্যিই কিছু বোঝেনি? নাকি ও সবকিছু জেনেবুঝেই এই নাটকটা করে গেল?
গাড়িতে বসে আমি ড্রাইভারকে বললাম বাসার দিকে যেতে। সারাটা পথ আমি আদিবের কথা ভাবলাম। আমার এই ছোট্ট বাচ্চাটার জন্য আমাকে একটা নিখুঁত প্ল্যান করতে হবে, যাতে আইনিভাবে সায়নের সমস্ত সম্পত্তি আর আদিবের দায়িত্ব আমি একাই পাই।
বাসায় পৌঁছে আমি একদম স্বাভাবিক মানুষের মতো হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হলাম। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা আঁচড়ে একটা ক্যাজুয়াল খোঁপা করলাম। আমি জানতাম, সায়ন ধানমন্ডির ওখান থেকে ঝড়ের গতিতে রওনা দিয়েছে। ও এক মুহূর্তও ওখানে শান্তিতে বসতে পারেনি। আমার শান্ত রূপটাই ওকে সবচেয়ে বেশি তাতিয়ে তুলেছে।
ঠিক এক ঘণ্টা পর, কলিংবেলে প্রচণ্ড জোরে শব্দ হলো। যেন কেউ খুব মরিয়া হয়ে দরজা খোলার জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি গিয়ে দরজাটা খুললাম। সামনে সায়ন দাঁড়িয়ে আছে। ওর চুলগুলো উসকোখুসকো, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, আর ও হাপাচ্ছে। লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে ও মনে হয় সিঁড়ি দিয়েই একপ্রকার দৌড়ে ওপরে উঠেছে।
সায়ন ঘরের ভেতর পা দিয়েই আমার হাত দুটো ধরার জন্য ব্যাকুল হয়ে এগিয়ে এল। ওর মুখে তখন একরাশ কৈফিয়ত আর ক্ষমা চাওয়ার আকুলতা, "আফ্রা! আমাকে একটা বার বলতে দাও... আমি আসলে..."
আমি ওর মুখের কথা কেড়ে নিলাম। ওর হাত দুটো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে মুখে একটা চওড়া, স্বাভাবিক হাসি টেনে বললাম, "আরে সায়ন! এত তাড়াতাড়ি তোমার মুন্সিগঞ্জের কাজ শেষ হলো? আমি তো ভাবলাম তুমি কাল দুপুরে ফিরবে!"
আমার এই অতি স্বাভাবিক প্রশ্নে সায়ন যেন মাঝরাস্তায় ব্রেক কষা গাড়ির মতো থমকে গেল। ওর মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। ও হা করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ও বুঝতেই পারছে না যে এই আফ্রা আর ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের সেই ডক্টর আফ্রা কি একই মানুষ, নাকি অন্য কেউ!
খেলাটা এবার আমার কোর্টে, সায়ন। তুমি যেভাবে চালবে, আমি তার চেয়ে দশ ধাপ এগিয়ে খেলব।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post