দুই পৃথিবী

 দুই পৃথিবী



আদিবকে ঘুম পাড়িয়ে যখন নিজের ঘরে ফিরলাম, তখন ঘড়িতে রাত এগারোটা। সায়ন বিছানায় শুয়ে আছে, কিন্তু ওর চোখ খোলা। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ও কী যেন ভাবছে। আমি ঘরে ঢুকতেই ও একটু চমকে উঠল, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে চট করে একটা স্বাভাবিক হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল।☔
"আদিব ঘুমিয়েছে আফ্রা?" ওর গলায় স্পষ্ট একটা জড়তা, যেন নিজের অবচেতনের অপ*রাধবোধটাকে ঢাকতে চাইছে।
"হ্যাঁ, ও তো ঘুমালেই বাঁচি। সারা দিন যে কী পরিমাণ দুষ্টুমি করে!" আমি খুব স্বাভাবিকভাবে আলমারি থেকে নাইট ড্রেস বের করতে করতে বললাম। আয়নায় সায়নের প্রতিবিম্বটা দেখছিলাম। ও আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। ও এখনো নিশ্চিত হতে পারছে না আমি সত্যিই সবকিছু ধরে ফেলেছি, নাকি কেবলই একটা কাকতালীয় ঘটনা নিয়ে ঠাট্টা করছি।☔
আমি ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে এসে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লাম। সায়ন একটু ইতস্তত করে আমার দিকে এগিয়ে এল। আমার কাঁধে হাত রেখে খুব চেনা একটা মায়াবী গলায় বলল, "আজকে চেম্বারের ওই কেসটার কথা বলছিলে না? আসলে ভাবছিলাম, দুনিয়ায় কত রকম অদ্ভুত মানুষ থাকে! চেহারার মিল থাকলেই কি আর এক মানুষ হয়? তুমি মিছেমিছি ওসব নিয়ে মাথা ঘামিও না, জানু।"☔
ওর হাতের স্পর্শে আমার পুরো শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠল। ইচ্ছে করছিল ওর হাতটা ঝটকা মে*রে সরিয়ে দিই। কিন্তু আমি মনে মনে হাসলাম। সায়ন ধরে নিয়েছে আমি এখনো অন্ধকারে আছি। ও ভাবছে আফরিনের নামের মিল আর চেহারার মিলটাকে ও একটা কাকতালীয় দুর্ঘ*টনা বলে পার পেয়ে যাবে। ও দুই নৌকায় পা দিয়েই চলতে চাইছে—এদিকে আমার মতো প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার স্ত্রী আর ফুটফুটে সন্তান, ওদিকে আফরিনের মতো সরল, অল্পবয়সী নতুন একটা মেয়ে। ও কোনো পক্ষই হারাতে চায় না।☔
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর দিকে তাকালাম। চোখে এক আকাশ সরলতা ফুটিয়ে বললাম, "তা ঠিক বলেছ সায়ন। আমিও পরে ভাবলাম, আমি আসলেই পাগ*লের মতো ভাবছিলাম। আমার সায়ন কি আর তেমন মানুষ? তুমি তো আমার আর আদিবের জন্য দিন-রাত এক করে খাটছ। আই অ্যাম সরি, আমি আসলে আজ চেম্বারে প্রচণ্ড টায়ার্ড ছিলাম তো, তাই উল্টোপাল্টা ভেবে ফেলেছি।"☔
আমার মুখে এই কথা শুনতেই সায়নের পুরো শরীর যেন এক নিমেষে শিথিল হয়ে গেল। ওর বুকের ওপর থেকে যেন মস্ত বড় একটা পাথর নেমে গেল। ও এক গাল হেসে আমার কপালে একটা চুমু খেল। "পাগ*লী একটা! ঘুমাও এখন, অনেক ধকল গেছে আজ তোমার ওপর দিয়ে।"☔
ও পাশ ফিরে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর নিয়মিত নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল—ও ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আমার চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। অন্ধকার ঘরের দিকে তাকিয়ে আমি মনে মনে ভাবলাম, সায়ন, তুমি ভেবেছ তুমি খুব চালাক? তুমি এই আফ্রাকে এখনো চেনোনি। তুমি যখন দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার খেলাটা খেলছ, তখন আমি নিশ্চিত করব যেন মাঝনদীতে গিয়ে তোমার দুটো নৌকাই একসাথে ডুবে যায়।☔
পরদিন সকালে সায়ন অন্য দিনগুলোর চেয়ে একটু বেশিই কেয়ারিং আচরণ করল। ব্রেকফাস্ট টেবিলে নিজ হাতে আমাকে অমলেট এগিয়ে দিল, আদিবের সাথে হাসাহাসি করল। ও ভাবছে, একটু বেশি ভালোবাসা দেখালে আমার মনের ভেতরের সুপ্ত সন্দেহটুকুও মুছে যাবে।
"আফ্রি— আই মিন, আফ্রা, আমি আজ একটু ঢাকার বাইরে যাচ্ছি," অফিস ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে সায়ন বলল। "মুন্সিগঞ্জে একটা ফ্যাক্টরি ভিজিট আছে। ফিরতে ফিরতে কাল দুপুর হতে পারে।"☔
মুন্সিগঞ্জ! অথচ আমি ভালো করেই জানি, ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা আফরিন সুলতানা হয়তো আজ ওর জন্য বিশেষ কোনো রান্না করে অপেক্ষা করছে। সায়ন সেখানে গিয়ে 'সংসার' করবে।
"আচ্ছা, সাবধানে যেও। পৌঁছানো মাত্র আমাকে একটা কল দিও," আমি ওর গালে আলতো করে হাত রেখে বিদায় জানালাম। সায়ন তৃপ্তির হাসি হেসে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। ও ভাবল, ও আবার জিতে গেল।☔
সায়ন বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক বিশ মিনিট পর আমি আমার চেম্বারের এসিস্ট্যান্ট রনিকে ফোন করলাম। রনি আমার খুব বিশ্বস্ত, ও আমার মেডিকেলের শুরুর দিনগুলো থেকে আমার সাথে আছে।
"হ্যালো রনি, আজ আমার চেম্বারে আসতে একটু লেট হবে। তুমি একটা কাজ করো। গতকাল আফরিন সুলতানা নামের যে পেশেন্ট এসেছিল, ওনার ফাইলে ওনার একটা লোকাল নম্বর আর অ্যাড্রেস দেওয়া আছে। নম্বরটা আমাকে এখনই টেক্সট করো। আর শোনো, বিষয়টা যেন একদম আমাদের দুজনের মধ্যেই থাকে।"☔
"জি ম্যাম, এখনই দিচ্ছি," রনি আর কোনো প্রশ্ন না করে লাইনটা কেটে দিল।
এক মিনিটের মধ্যে আমার মোবাইলে আফরিনের নম্বরটা চলে এল। আমি নম্বরটার দিকে তাকিয়ে গভীর একটা শ্বাস নিলাম। সায়ন এখন মুন্সিগঞ্জের কথা বলে ধানমন্ডির দিকে যাচ্ছে। ও ভাবছে ও দুই দিকেই ব্যালেন্স করে সুখে থাকবে। কিন্তু ও জানে না, এই দুই পৃথিবীর সুতোটা এখন আমার হাতে।☔
আমি আফরিনের নম্বরে ডায়াল করলাম। ফোনের ওপাশ থেকে রিং হওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। সায়নের অজান্তেই, ওর তৈরি করা তাসের ঘরটা এবার ভাঙার সময় এসেছে।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post