প্রেয়সীর_তরে_রজনীগন্ধা

প্রেয়সীর_তরে_রজনীগন্ধা

 'তোমার পিরি*য়ড হয়েছে কতদিন আগে?'

দেখতে আসা পাত্রের মুখে এ ধরনের প্রশ্ন শুনে রেগে গেলো নাওফিয়া।হাত তুলে চড় দিতে যাবে তার আগেই সামনে দাঁড়ানো মিরসাদ কায়সার ওর হাত টেনে ধরে ঘুরিয়ে পেছনে নিয়ে মুচড়ে ধরলো।পেছন থেকে ফিসফিস করে বলল,'আমার হাতে সময় অনেক কম।তাই আমি চাই সাগরে যাওয়ার আগে বউয়ের সাথে ভালো সময় কাটিয়ে যেতে।'
'তোর মত বেয়াদবকে বিয়ে করছে কে?'
'তুমি!'
'আমার এত খারাপ দিন আসে নি।'
'এসেছে,কারণ যতদূর জানি তুমি তোমার দাদুর কথা ফেলতে পারো না।সে চায় তোমার বিয়ে আমার সাথে হোক।বিশ্বাস না হলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।তোমার দাদুর এত রিকুয়েষ্টের কারণেই আমি রাজি হয়েছি।'
'ও তাই নাকি?আমি আমার দাদুকে বুঝিয়ে নেবো,তবুও আপনাকে বিয়ে করব না।চলে যান।'
'এত অফেন্ডেড হওয়ার কি আছে কাপকেক?'
'এটা কেমন ধরনের নাম?'
'কাপকেক আমার ফেভারিট আর তুমিও।'
এটা বলেই মিরসাদ নিজের পুরুষ্টু ঠোঁট জোড়া জিহ্বা দ্বারা ভিজিয়ে নিয়ে নাওফিয়ার গলায় ছুয়ে দিয়ে ওকে ছেড়ে চলে গেলো নিচে।ঘটনার আকস্মিকতা নাওফিয়া কিছুক্ষণ সেখানেই ভূতগ্রস্তেতর মত দাঁড়িয়ে রইলো।একটু পর নাওফিয়ার ছোটো বোন নাজনীন এসে ডাক দিল,'কি,রে আপু!নিচে নামবি না?'
নাওফিয়ার হুশ ফিরতেই ও বলল,'যা,আসছি।'
নাজনীন চলে যাওয়ার পর নাওফিয়া নিজের মাথাটা ধরে রাগ কমানোর চেষ্টা করলো।লোকটা এতবড় লম্পট জানলে কখনোই এভাবে ছাদে দেখা করতে আসতো না ও।যেভাবেই হোক এই বিয়েটা আটকাতে হবে নাওফিয়ার।ও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই শুনতে পেলো বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে আগামী শুক্রবার।নাওফিয়া তখনই দাদুর রুমে চলে গেলো।হোসেন আলী তখন পান চিবুতে ব্যস্ত।নাতনীকে দেখে নরম স্বরে বললেন,'আয়,বস।'
নাওফিয়া চেয়ার টেনে দাদুর সামনে বসে বলল,'দাদু,আমি এই বিয়েটা করতে চাই না।'
'কেনো,রে?'
'লোকটা ভালো না।'
'কি করেছে?'
এখন নাওফিয়া কি করে ছাঁদের ঘটনা বলবে!অসম্ভব রকমের বিরক্ত আর আড়ষ্টতা কাজ করছে ওর।ও ওই ঘটনা না বলে শুধু বলল,'আমার ভালো লাগে নি।'
'দাদুভাই মিরসাদ অনেক ভালো ছেলে।আমি চাই ওর সাথে তোর বিয়েটা হোক।আমার তো আর সময় নেই জানিসই।মরার আগে এই ইচ্ছেটা পূরণ করে দে না!'
দাদুর কথা শুনে নাওফিয়া নিজেও ইমোশনাল হয়ে গেলো।হোসেন আলীর ফোর্স স্টেজ লিম্ফোমা ক্যান্সার।ডাক্তার বলেছেন হাতে আর সময় নেই ওনার।আর শেষ দিনগুলো তিনি বাড়িতেই থাকতে চান বলে অনেক বাঁধার পর তিনি বাড়িতেই ফিরেছেন।হাসপাতালে মরার চেয়ে বাড়িতে মরা ভালো।
এই অবস্থায় নাওফিয়া আর না করতে পারে নি নিজের দাদুকে।ভাবলো দাদু যতদিন আছে ততদিনই ও লোকটাকে সহ্য করবে তারপর দাদু চলে গেলেই ডিভোর্স দিয়ে আলাদা হবে।
নাওফিয়া দাদুকে স্বান্তনা দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে নিজের প্রেমিক রাসেলকে ফোন করলো।রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে রাসেল বলল,'পাত্রপক্ষ গেছে?না করেছো ওদের?'
'না,না করতেই পারি না।'
'কেনো?ছেলে পছন্দ হয়ে গেছে?বেটার অপশন পেয়ে গেছো?'
'শাটআপ রাসেল!আমাকে ব্লেইম দিচ্ছো কেনো?তোমাকে গত দু'বছর ধরে বলছি একটা চাকরি জোটাও,বিয়ে করো আমাকে।বাসায় ফ্যামিলি আনো।আনতে পেরেছো?'
'তাই বলে বেটার অপশন পেয়ে ঝুলে পড়বে?তোমরা মেয়েরা ছলনাময়ী।'বলতে বলতেই কেঁদে ফেললো রাসেল।
নাওফিয়ার মায়া হলো ভীষণ!ও নরম স্বরে বলল,'দাদু চাইছে আমি এই লোকটাকে বিয়ে করি তাই আর না করতে পারি নি।তুমি তো জানোই দাদুর কি অবস্থা!এই সময়ে ওনার কোনো ইচ্ছা তো অপূর্ণ রাখতে পারি না আমি।'
রাসেল মনে মনে হোসেন আলীকে 'চ' সূচক কিছু বিশ্রী গালি দিয়ে বলল শালার বুইড়ার বাচ্চা মরেও না।কিন্তু মুখে করুন স্বরে বলল,'তাহলে একটা বার এসে দেখা করে যাও।শেষবারের মত!'
'ঠিকাছে।কাল বিকেলে আসব।'
'আচ্ছা।'
ফোন রাখতেই রাসেল কুটিল হেসে চোখের পানি মুছে ফেললো।তারপর দুই বন্ধুকে ফোন করে গ্রুপ কলে এনে বলল,'দোস্ত!ওই যে নাওফিয়া *গী টা বিয়া ঠিক হইসে।শা*লী তো একবারও লা*গাইতে দেয় নাই।কালকে বিকালে আইবো দেখা করতে।তিনজনে মিলে একসাথে শা*লীরে!'
বলেই হাসতে লাগলো রাসেল।ওর বাকি বন্ধুদের একজন বলল,'মজা হইবো,দোস্ত।'
'হ।'
বলেই তিনজন অট্টহাসি হাসতে লাগলো।
রাতের খাবার শেষে রুমে আসতেই কল এলো নাওফিয়ার ফোনে।আন-নোন নাম্বার!নাওফিয়া রিসিভ করে বলল,'হ্যালো,কে বলছেন?'
'হাই,কাপকেক।'
'প্লিজ,এরকম অসহ্য নামে ডাকবেন না।'
'তাহলে কি সুইটি,হানি,ডার্লিং,বেবি,জান,সোনা,ময়না,টিয়া,কলিজা,হার্টবিট এগুলা ডাকব?কোনটা পছন্দ করো তুমি?'
'এটাও না।ইয়াক!'
'কেনো?সুন্দর তো নামগুলো।হাসবেন্ড,ওয়াইফ এগুলোই ডাকে আমি রিসার্চ করে জানতে পেরেছি।'
'রিসার্চ নাকি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন?'
'অভিজ্ঞতা আসলে হয় নি!'
'মিথ্যে কথা।'
'ওয়েল,বিশ্বাস না করলে তো কিছু করার নেই।'
'তাহলে ছাঁদে যেটা করলেন সেটা কিভাবে করলেন অভিজ্ঞতা না থাকলে?'
'ও আচ্ছা,এসব করতে অভিজ্ঞতা লাগে না-কি?একচুয়েলি আমার তোমাকে তখন চুমু খাওয়ার ইনটেনশন ছিলোই না কিন্তু তোমার গলায় যে জোড়া তিল আছে সেটা দেখে আমার আর কন্ট্রোল হলো না,কি করবো বলো তো কাপকেক!'
'আচ্ছা মানলাম প্রেম করেন নি কিন্তু এর আগে মেয়ে তো দেখেছেন।তখন কাউকে এরকম চুমু খান নি?'
'না,ইচ্ছে হয় নি।ওদের আমি পিরিয়ডের বিষয়েও জিজ্ঞেস করি নি কারণ আমি কাউকেই বিয়ে করতাম না বাট তোমাকে করব বলেই জিজ্ঞেস করেছিলাম।এটা জানা ইম্পোর্টেন্ট!বলো,কবে হয়েছিল?'
'গতকালই শেষ হয়েছে।'
'বাহ,তাহলে তো সময় ভালোই।আমি যাওয়া পর্যন্ত আর সমস্যা নেই।ইয়াহুউউউ!'
নাওফিয়া মনে মনে হাসলো।কারণ ও মিথ্যে বলেছে।ওর পিরিয়ত হিসাব মতে সামনের শুক্রবার ওর বিয়ের দিনই পড়ে।
'আচ্ছা কাপকেক,হানিমুনে কোথায় যেতে চাও?যদিও তোমাকে তো ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছি না,তবুও দেখি মাঝেমধ্যে পনেরো,বিশ মিনিটের জন্য বের হতে দেব।'
'কোথাও যাব না।'নাওফিয়া কাট কাট স্বরে বলল।
'না না যেতে হবে পরে নয়তো বলবে আমি না বলেছি বলে নিয়েই যাবে না!কি কঞ্জুস বাবা!'
'আপনি এত বাঁচাল কেনো?'
'আসলে তুমি তো কাছে নেই তাই কথা বলেই কাজ চালাচ্ছি।বিশ্বাস করো কাছে থাকলে একটুও কথা বলব না,একটা শব্দও না!কারণ তখন আমার ঠোঁট তো অন্য কাজে ব্যস্ত থাকবে।'
'অশ্লীল,অসভ্য,ইতড় লোক আপনি!'
'আর তুমি একটা মিষ্টি কাপকেক।'
রাগে ফোনটাই কেটে দিলো নাওফিয়া।এমন লম্পট লোক দু'টো দেখে নি ও।একদিনের দেখায় কেউ এত ফ্রী কিভাবে হয় জানে না নাওফিয়া!তারওপর বলছে না-কি প্রেম করে নি!মিথ্যে কথারও লিমিট থাকে এই লোকের তাও নেই।
পরেরদিন ক্লাস করে দুপুরের একটু পর ক্যাম্পাস থেকে বের হলো নাওফিয়া।এর মধ্যেই রাসেল ফোন করলো।রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাসেল বলল,'কোথায় আছো?'
'বের হলাম মাত্র ক্যাম্পাস থেকে।'
'একটু দাঁড়াও তাহলে আমি আসি।'
'না না।আমিই আসছি।'
'উঁহু,তুমি দাঁড়াও আসছি।'
এই বলে রাসেল কেটে দিলো ফোন।অগত্যা নাওফিয়া দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।রাসেল মিনিট দশেক পরই এলো।নিজের বাইক থাকায় বেশি সময়ও লাগে নি।বাইক থেকে নেমে নাওফিয়ার দিকে এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরতে যাবে তখনই একটা ফুটবল এসে ওর মাথায় লাগলো বেশ জোরালোভাবে।তৎক্ষণাৎ সেখানেই পড়ে গেলো ও।নাওফিয়া ওকে তুলতে যাবে তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো 'কাপকেক' ডাকটা।ও পেছনে তাকাতেই দেখলো মিরসাদকে।লোকটা ভীষণ মাঞ্জা মেরে এসেছে।নীল-সাদা চেক শার্ট,কালো প্যান্ট,লেদার শু আর সানগ্লাস শার্টের বোতামে ঝুলিয়ে হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।ততক্ষণে রাসেল উঠে দাঁড়িয়ে নাওফিয়াকে জিজ্ঞেস করলো,'এই লোক কে নাওফু?'
'ওনার সাথেই বিয়ে ঠিক হয়েছে আমার।'
রাসেল এগিয়ে গিয়ে ইমোশনাল হবার ভান করে বলল,'ভাই আপনি তো সারাজীবনের জন্য আমার কলিজাটাকে নিয়া যাইতাসেন!অন্তত আজকে বিকালটা ওরে ছাইড়া দেন।'
'ঠিকাছে।নিয়ে যা।'
মিরসাদের কথা শুনে নাওফিয়া অবাক।এই লোক তাকে এত সহজে নিয়ে যেতে দিচ্ছে!এদিকে রাসেল মনে মনে মিরসাদকে বলদ বলল।তবে মুখে আন্তরিক হাসি দিয়ে নাওফিয়াকে নিয়ে এগিয়ে যেতে নিলেই পেছন থেকে মিরসাদ আবার বলল,'রিমি,বয়স ১৭ বছর,গার্লস কলেজে পড়ে তাই না?'
এইটুকু শুনেই রাসেলের পায়ের তলার মাটি সরে গেলো।ও ফিরে এসেই মিরসাদের কলার চেপে ধরলো শক্ত করে।মিরসাদ হাসলো কেবল।রাসেল রাগান্বিত স্বরে বলল,'কি করেছিস ওর সাথে?'
'কিছু এখনও করি নি।'
'যদি চাস বোন বেঁচে থাকুক তাহলে নাওফিয়ার থেকে দূরে থাকবি আর শুধু ও কেনো অন্য কোনো মেয়ের ক্ষতি করার কথাও যদি ভাবিস তাহলে তোকে কোনো শাস্তি দেব না।শাস্তি পাবে তোর বোনেরা,তোর মা,তোর গোষ্ঠীর সব মেয়ে!মাথায় রাখিস।'
মিরসাদের কথা শুনে রাসেল ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেলো সেখান থেকে।এদিকে নাওফিয়া এই দৃশ্য দেখে আগামাথা কিছু না বুঝেই এসে মিরসাদের গালে থাপ্পড় দিলো।

Post a Comment

0 Comments