আজ রাতে এই বাড়িতে ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা খাদিজাকে দেখে আমার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। তার হাতে রান্নাঘরের বড় ছুরি। চোখদুটো অস্বাভাবিক স্থির। সেই চোখে কান্নাও আছে, আবার ভয়ংকর শূন্যতাও আছে।
আমার পেছনে আয়রা কাঁপছে।
আমি খুব আস্তে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরলাম।
খাদিজা এক ধাপ নিচে নামল।
“তুমি-ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, ইয়াসিন?”
আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম। “খাদিজা… ছুরিটা নামাও।”
সে হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই।
“সবাই প্রথমে এমনভাবেই কথা বলে। তারপর একদিন চলে যায়।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, এখন সামান্য ভুলও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
আমি ধীরে বললাম, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না। শুধু আয়রা ভয় পেয়েছে।”
খাদিজার চোখ এবার সরাসরি আয়রার দিকে গেল।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে আমার পেছনে আরও লুকিয়ে গেল।
সেই দৃশ্যটা দেখে খাদিজার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। কষ্ট, রাগ আর অপমান একসঙ্গে ফুটে উঠল।
“দেখলে?” সে ফিসফিস করে বলল। “ও-ও এখন আমাকে দানব ভাবে।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কারণ এই মুহূর্তে তার সঙ্গে তর্ক করার মানে নেই।
খাদিজা ধীরে নিচে নেমে এল। এখন সে আমাদের থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে।
“রাফিনও এমন করত,” সে নিচু গলায় বলল। “প্রথমে ও-ও আমাকে শান্ত করতে চাইত। তারপর একদিন আয়রাকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল।”
আমার বুকের ধুকপুক আরও বেড়ে গেল।
আমি খুব সাবধানে বললাম, “সেদিন কী হয়েছিল?”
খাদিজা থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
তারপর সে খুব আস্তে হাসল। “তুমি সত্যিটা জানতে চাও?”
আমি চুপ করে রইলাম।
সে সোফার দিকে তাকিয়ে যেন অতীতের কোনো দৃশ্য দেখছিল।
“সেদিন রাতেও অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। রাফিন বলল সে আয়রাকে নিয়ে চলে যাবে। বলল আমি নাকি অসুস্থ। বিপজ্জনক।”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে কাঁপছিল।
“আমি ওকে বলেছিলাম… আমি শুধু চাই আমার পরিবার আমাকে ছেড়ে না যাক।”
আমার বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি জমতে লাগল।
খাদিজা আবার বলল, “কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি।”
“তারপর?”
সে এবার সরাসরি আমার চোখে তাকাল।
“তারপর ও আমাকে ধাক্কা দিল।”
আমার শ্বাস আটকে গেল।
“আর তারপর সবকিছু খুব দ্রুত ঘটেছিল।”
তার হাতের ছুরিটা কেঁপে উঠল।
“ও পড়ে গেল।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কোথায় পড়ে গেল?”
খাদিজার চোখে পানি চলে এলো।
“স্টোররুমে।”
আমার মাথার ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।
পোড়া দাগ।
আগুন।
রাফিনের হারিয়ে যাওয়া।
সবকিছু একসঙ্গে জোড়া লাগতে শুরু করল।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তুমি… তাকে মেরেছিলে?”
খাদিজা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “আমি চাইনি এটা হোক!”
আয়রা কেঁপে উঠল।
খাদিজার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।
“ও পড়ে মাথায় আঘাত পায়। অনেক রক্ত ছিল… অনেক…”
সে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল।
“আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
আমার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।
“তারপর তুমি কী করেছিলে?”
খাদিজা কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না।
তারপর খুব আস্তে বলল, “আগুন সবকিছু মুছে দেয়।”
আমার পুরো শরীর জমে গেল।
আয়রা কাঁদতে শুরু করল। “মা প্লিজ…”
খাদিজা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে এমন অস্থিরতা ছিল যে আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে আয়রার দিকে এগোতে লাগল।
“আমি তোমার জন্যই সব করেছি…”
আমি দ্রুত আয়রাকে নিজের পেছনে সরালাম। “খাদিজা, থামো।”
সে দাঁড়িয়ে গেল।
তার চোখে এবার ভয়ংকর শূন্যতা।
“তুমি-ও এখন আমাকে ছেড়ে যাবে।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “কেউ তোমাকে আঘাত করতে চাইছে না।”
“মিথ্যা!”
তার চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।
“সবাই মিথ্যা বলে! সবাই!”
সে হঠাৎ ছুরিটা শক্ত করে ধরল।
আমি বুঝলাম, পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে।
আমি ধীরে বললাম, “আয়রার দিকে তাকাও। ও ভয় পাচ্ছে।”
খাদিজার চোখ ধীরে মেয়ের দিকে গেল।
আয়রা কাঁদছে।
ছোট্ট শরীরটা পুরো কাঁপছে।
“মা… প্লিজ…”
এই শব্দটা যেন খাদিজাকে থামিয়ে দিল।
সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “তুইও আমাকে ভয় পাস?”
আয়রা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করল।
এই এক মুহূর্তেই যেন খাদিজার ভেতরের সব শক্তি ভেঙে পড়ল।
তার হাত থেকে ছুরিটা ধীরে মেঝেতে পড়ে গেল।
টং শব্দটা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
খাদিজা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মেঝেতে বসে পড়ল।
তারপর ভেঙে পড়া মানুষের মতো কাঁদতে শুরু করল।
আমি জীবনে বহু মানুষের কান্না শুনেছি। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিদিন মানুষ ভাঙে। কিন্তু সেই রাতের কান্নাটা অন্যরকম ছিল।
সেটা শুধু দুঃখের কান্না না।
সেটা বহু বছরের চাপা অন্ধকার, অপরাধবোধ আর ভয়ের কান্না।
খাদিজা ফিসফিস করে বলতে লাগল, “আমি কাউকে হারাতে চাইনি…”
আয়রা আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর ধীরে ফোন বের করলাম।
পুলিশে কল দিলাম।
খাদিজা কোনো বাধা দিল না।
সে শুধু মেঝেতে বসে কাঁদছিল।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
আকাশ হালকা ধূসর।
মনে হচ্ছিল বহুদিনের জমে থাকা দমবন্ধ অন্ধকারের পর অবশেষে কোথাও একটু আলো আসছে।
প্রায় কুড়ি মিনিট পর পুলিশের গাড়ি এসে থামল।
সবকিছু এরপর খুব দ্রুত ঘটল।
পুলিশ স্টোররুম তল্লাশি করল।
মেঝের নিচের অংশ খুলে আরও প্রমাণ পাওয়া গেল। পোড়া কাপড়ের অংশ, পুরোনো রক্তের চিহ্ন।
খাদিজা কোনো কিছু অস্বীকার করল না।
সে শুধু একটাই কথা বারবার বলছিল।
“আমি চাইনি ও চলে যাক…”
যখন পুলিশ তাকে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে একবার আয়রার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে প্রথমবার আমি সত্যিকারের অনুশোচনা দেখলাম।
সে কাঁপা গলায় বলল, “মা… আমি তোকে ভালোবাসতাম।”
আয়রা কিছু বলল না।
সে শুধু আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
খাদিজাকে গাড়িতে তোলার পর ভোরের বাতাস হালকা ঠান্ডা লাগছিল।
পুরো বাড়িটা তখন অদ্ভুত নিস্তব্ধ।
কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আগের মতো ভয়ের না।
বরং যেন ঝড় চলে যাওয়ার পরের শূন্যতা।
সেদিন সকালে আয়রা প্রথমবার আমার হাত শক্ত করে ধরে নিজে থেকে বলেছিল, “তুমি কি এখনো যাবে না?”
আমার বুক ভরে উঠল।
আমি হাঁটু গেড়ে তার চোখের সমান হয়ে বললাম, “না মা। এবার আর কোথাও না।”
তার চোখে পানি চলে এলো।
কিন্তু সেই কান্নার ভেতরে আজ ভয়ের বদলে অন্য কিছু ছিল।
নিরাপত্তা।
পরের কয়েক মাস খুব সহজ ছিল না।
আয়রা মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠত। আগুন দেখলে ভয় পেত। জোরে দরজা বন্ধ হলে কেঁপে উঠত।
আমি ধীরে ধীরে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করলাম।
স্কুলে নিয়ে যেতাম।
রাতে গল্প পড়ে শোনাতাম।
একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম, অনেকদিন পর সে আবার ছবি আঁকছে।
আমি চুপচাপ পাশে বসে ছিলাম।
সে ছবিটা শেষ করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেলাম।
ছবিতে একটা ছোট্ট মেয়ে। তার পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
দুজনের ওপরে বড় সূর্য আঁকা।
কোনো আগুন নেই।
কোনো অন্ধকার ঘর নেই।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কে?”
আয়রা খুব আস্তে হাসল।
“আমি আর তুমি।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।
বাইরে তখন বিকেলের নরম আলো।
জানালার পাশে রাখা টবে নতুন ফুল ফুটেছে।
আমি বুঝলাম—
সব ক্ষত হয়তো পুরোপুরি মুছে যায় না।
কিছু ভয় মানুষের ভেতরে বহুদিন থেকে যায়।
কিন্তু তারপরও…
ভালোবাসা কখনো কখনো একটা ভাঙা জীবনকে আবার নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
'''সমাপ্ত '''

0 Comments