রাইসার জীবন বাইরে থেকে দেখতে ছিল একদম স্বাভাবিক, এমনকি অনেকের কাছে ঈর্ষণীয়। ঢাকার এক মধ্যবিত্ত এলাকায় ছোট একটা ফ্ল্যাটে সে আর তার স্বামী আরিফ থাকত। পাঁচ বছরের সংসার। বাইরে থেকে তাদের সম্পর্ক ছিল নিখুঁত—হাসি, ছবি, ছোট ছোট সুখ, আর একসাথে জীবন কাটানোর গল্প।
রাইসা একজন স্কুল শিক্ষিকা। শান্ত, দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল। আরিফ একটি বেসরকারি কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি করত। মাস শেষে নিয়মিত আয়, আর সেই আয় দিয়ে তারা ছোট ছোট স্বপ্ন গড়ত—একদিন বড় ফ্ল্যাট, গাড়ি, হয়তো সন্তান নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ।
সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল—অন্তত বাইরে থেকে।
কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়।
প্রথমে খুব ছোট ছোট জিনিস। আরিফ রাতে দেরি করে ফিরতে শুরু করল। অফিসের অজুহাত, মিটিং, ক্লায়েন্ট, ডেডলাইন—সবকিছুই যেন তার সময়ের অংশ হয়ে গেল। প্রথমদিকে রাইসা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিল। সে ভাবত, “চাকরির চাপ থাকতেই পারে।”
কিন্তু এরপর পরিবর্তন আসে আচরণে।
আরিফ আগের মতো কথা বলে না। একসাথে বসে সময় কাটানো কমে যায়। ফোন এলেই সে অন্য ঘরে চলে যায়। মেসেজ এলে স্ক্রিন লুকিয়ে রাখে। রাইসা যখন কিছু জিজ্ঞেস করে, সে বিরক্ত হয়।
একটা অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হতে থাকে তাদের মধ্যে।
রাইসা বুঝতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস করতে চায় না। কারণ বিশ্বাস ভাঙার চেয়ে অন্ধ থাকা সহজ।
একদিন সকালে রাইসা আরিফের শার্ট ইস্ত্রি করছিল। হঠাৎ সে কলারের পাশে হালকা লিপস্টিকের দাগ দেখে থেমে যায়।
এক মুহূর্ত।
তার হাত স্থির হয়ে যায়।
সে আবার ভালো করে দেখে। দাগটা নতুন না, কিন্তু স্পষ্ট।
আরিফ তখন বাথরুমে ছিল। কিছুই জানত না।
রাইসা কোনো শব্দ করে না। না চিৎকার, না প্রশ্ন। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভেতরে যেন কিছু একটা নীরবে ভেঙে যায়।
সে শার্টটা আগের মতো ভাঁজ করে রাখে।
কিন্তু সেই ভাঁজের ভেতরে একটা সম্পর্কও ভাঁজ হয়ে যায়।
সেই দিন আরিফ অফিসে চলে যায় স্বাভাবিকভাবে। আর রাইসা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে শহরের শব্দ, গাড়ির হর্ন, মানুষের চলাফেরা—সব স্বাভাবিক। শুধু তার ভেতরটা অস্বাভাবিক।
তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরতে থাকে— “আমি কি তার জীবনের অংশ, নাকি আমি শুধু একটা অভ্যাস?”
সেই রাতে আরিফ আগের মতোই ঘুমিয়ে পড়ে। ফোন পাশে রেখে, নিশ্চিন্তে।
আর রাইসা ঘুমায় না।
সে শুধু শুয়ে থাকে, অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
তার মনে হয়, তার জীবন এখন আর আগের মতো নেই। কিছু একটা বদলে গেছে—এমনভাবে, যেটা আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না।
সেই রাতটা ছিল তার জীবনের প্রথম রাত, যখন সে বুঝতে পারে—সব নীরবতা শান্তি নয়, কিছু নীরবতা আসলে ধীরে ধীরে ধ্বংসের শুরু।

0 Comments