ক্লাস টেনের শেষ দিন আজ বিদায় অনুষ্ঠান।
স্কুলের মাঠে সবাই জড়ো হয়েছে। কেউ সাদা শার্টে বন্ধুদের নাম লিখছে, কেউ চোখ মুছছে আড়ালে গিয়ে। হেডস্যার মাইকে বিদায়ী ভাষণ দিচ্ছেন, কিন্তু রাফির কানে কিছুই ঢুকছে না।
ওর চোখ শুধু এক জায়গায় আটকে আছে - দোতলার বারান্দায়, যেখানে নিলা দাঁড়িয়ে আছে।
নিলা ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। ক্লাস ফাইভ থেকে একসাথে। এক বেঞ্চে বসা, একসাথে টিফিন ভাগ করা, ঝগড়া করে আবার পাঁচ মিনিট পরেই কথা বলা।
আজকের পর সব শেষ।
নিলার বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহেই ওরা ঢাকায় চলে যাবে। রাফি জানতো এই দিনটা আসবে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে ভাবেনি।
অনুষ্ঠান শেষ হতেই রাফি দৌড়ে গেল ওর কাছে।
"কই যাবি? তোর সাথে আমার কথা আছে।"
নিলা হাসার চেষ্টা করলো, কিন্তু চোখ লাল।
"রাফি, আমার শার্টটা এখনো ফাঁকা আছে। তুই কিছু লিখবি না?"
রাফি পকেট থেকে মার্কার বের করলো। সবাই লিখেছে "Best of luck", "Miss you", "Never forget me"। রাফি নিলার শার্টের একদম কোণায় ছোট করে লিখলো -
"এই দিন আর আসবে না"
নিলা লেখাটা পড়ে চুপ করে গেল।
"মানে কি?"
"মানে, আজকের মতো করে আমরা আর কখনো স্কুলের বারান্দায় দাঁড়াবো না। তুই আর আমি, একই ড্রেসে। এই দিনটা সত্যিই আর আসবে না, নিলা।"
তখনই নিলা কেঁদে ফেললো। এতক্ষণ আটকে রাখা কান্না।
রাফি কি করবে বুঝতে পারলো না। আশেপাশে সবাই তাকিয়ে আছে। ও আস্তে করে বললো, "একটা জিনিস দিবি আমাকে?"
"কি?"
"তোর ওই নীল বেন্ডটা। যেটা তুই সবসময় পরে থাকিস।"
নিলা অবাক হয়ে মাথা থেকে বেন্ডটা খুলে দিল।
"বিনিময়ে তুই কি দিবি?"
রাফি তার স্কুল ব্যাগ থেকে একটা ছোট, পুরনো খাম বের করলো। খামটা অনেকদিনের পুরনো, ভাঁজ পড়ে গেছে।
"এটা বাড়ি গিয়ে খুলবি। এখন না। প্রমিস কর।"
নিলা প্রমিস করলো।
সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে দুজন দুদিকে চলে গেল। রাফি বাড়ি ফিরে জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলো রাস্তার দিকে। ও জানে নিলা খামটা খুলেছে।
খামের ভেতর কি ছিল?
একটা ছেঁড়া কাগজ, যেখানে ক্লাস সিক্সে রাফি প্রথমবার লিখেছিল - "নিলা + রাফি = বেস্ট ফ্রেন্ডস ফরএভার"
আর নিচে ছোট করে লেখা - "ঢাকায় গিয়ে ভুলে যাস না।"
রাত ১ টা। রাফির ফোনে একটা মেসেজ এলো। নিলার নাম্বার থেকে।
মেসেজে শুধু লেখা - "আমি খামটা খুলেছি।"
তারপর আর কোনো রিপ্লাই নেই।
রাফি সারাত ফোন হাতে নিয়ে বসে রইলো।
********
রাত ১:০২ মিনিট।
মেসেজটা সিন হয়েছে, কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসছে না।
রাফি ফোনটা হাতে নিয়ে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে। ও ভাবছে, নিলা কি রাগ করলো? ওই লেখাটা কি খুব বাচ্চাদের মতো হয়ে গেছে?
রাত ১:১৫ মিনিটে ফোনটা ভাইব্রেট করলো।
নিলা লিখেছে - "ছাদে আয়।"
রাফি লাফ দিয়ে উঠলো। ওদের বাড়ি পাশাপাশি। মাঝখানে শুধু একটা পাঁচিল। ছোটবেলা থেকে ওরা ছাদে দাঁড়িয়ে কথা বলতো।
ছাদে গিয়ে রাফি দেখলো নিলাও দাঁড়িয়ে আছে। চোখ ফুলে আছে, হাতে রাফির দেওয়া সেই ছেঁড়া কাগজটা।
"তুই এখনো রেখে দিয়েছিস এটা?" নিলার গলা ধরা।
"ফেলে দিতে পারিনি।"
নিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, "জানিস রাফি, আমার ঢাকায় যেতে ইচ্ছা করছে না। ওখানে আমার কেউ নেই। আমার স্কুল নেই, তুই নেই।"
"নতুন বন্ধু হবে।"
"তোর মতো কেউ হবে না।"
রাফির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। যে কথাটা ও পাঁচ বছর ধরে বলতে পারেনি, আজ মনে হলো বলে ফেললে হয়তো এই দিনটা আরেকটু লম্বা হবে।
"নিলা, তোকে একটা কথা বলার ছিল..."
"আমাকেও।"
দুজনেই চুপ। বাতাসে শুধু পাশের বাড়ির আম গাছের পাতা নড়ার শব্দ।
নিলাই প্রথম বললো, "আমরা কি আর কখনো দেখা করবো না?"
রাফি পকেট থেকে নিলার নীল বেন্ডটা বের করলো। অন্ধকারেও নীলটা জ্বলজ্বল করছে।
"এটা আমার কাছে থাকবে। যেদিন তুই ফিরবি, সেদিন ফেরত দেব। তখন বুঝবো তুই ভুলিসনি।"
নিলা হাসলো। কান্না ভেজা হাসি।
"আর যদি কখনো না ফিরি?"
এই প্রশ্নের উত্তর রাফির কাছে ছিল না।
পরদিন সকাল।
নিলাদের বাড়ির সামনে একটা ট্রাক। সব মালপত্র তোলা হচ্ছে। রাফি দূর থেকে দেখছে, যেতে পারছে না। গেলে আবার কান্না পাবে।
যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে নিলা দৌড়ে এলো রাফিদের বাড়িতে। হাঁপাচ্ছে।
"রাফি!"
রাফি বেরিয়ে এলো।
নিলা ওর হাতে একটা ছোট বক্স দিল।
"এটা তোর জন্য। কিন্তু এখন খুলবি না। আমি চলে যাওয়ার পর খুলবি। প্রমিস?"
এবার রাফির প্রমিস করার পালা।
নিলাদের গাড়িটা ধীরে ধীরে মোড় ঘুরে চলে গেল। রাফি হাতে বক্সটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ধুলোর মধ্যে মিলিয়ে গেল গাড়িটা।
রাফি কাঁপা হাতে বক্সটা খুললো। প্রমিস রাখতে পারলো না।
বক্সের ভেতর কি ছিল জানো?
একটা নতুন নীল বেন্ড, আর একটা চিরকুট।
চিরকুটে লেখা - "গাধা, এটা তোর জন্য কিনেছিলাম। আমারটা তো তুই নিয়েই নিয়েছিস। পরেরবার যখন দেখা হবে, তখন দুজনে একসাথে নীল পরবো। আর হ্যাঁ, আমি তোকে..."
এর পরের লেখাটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে মুছে গেছে। নাকি ইচ্ছা করেই মুছে দিয়েছে নিলা?
রাফি চিরকুটটা বুকে চেপে ধরলো। ওই অসম্পূর্ণ বাক্যটাই ওকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।
এরপর কেটে গেছে ৭ বছর।
আজ রাফি ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষে। আজও তার মানিব্যাগে সেই নীল বেন্ডটা থাকে।
আজ সকালে রাফির কাছে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এসেছে।
"হ্যালো, রাফি চিনতে পারছিস? আমি নিলা। আমি ফিরেছি। আমাদের পুরনো বাড়িটায় আছি। দেখা করবি?"

0 Comments