শ্রাবণের_সে_অপেক্ষা

 

শ্রাবণের_সে_অপেক্ষা

আজ আমার ভাই বোন এসে, বাবার রে‌খে যাওয়া সকল সম্প‌ত্তির সমানভা‌গ চাইল। আমি প্রথ‌মে একটু অবাক হ‌লেও আমার অজ্ঞাত মন যেন এস‌বের জন্য প্রস্তুত ছিল। তাই বললাম,

'ঠিক আছে কাল ছো‌টো মামা‌কে ডা‌কি। দ‌লিল পত্র সব তার কা‌ছে। সে সব বু‌ঝি‌য়ে দিবে।'
দুজনেই তখন গম্ভীর মু‌খে ঠিকা‌ছে ব‌লে চ‌লে গেল।
প‌রের‌দিন,
‌ছো‌টোমামা সবাই‌কে সুন্দরভা‌বে সব‌কিছু বু‌ঝি‌য়ে দি‌লেন এবং বল‌লেন ক‌দিন পর একজন আমিন ডেকে জায়গা মে‌পে যার যার সীমানা ঠিক ক‌রে দিব। সবাই সম্ম‌তি জানালাম। তখন সা‌মিয়া, শফিক বলল,
'সব জমির বুঝ পে‌লেও একটা জ‌মির বুঝ পেলাম না।'
মামা বল‌লেন,
'‌কোনটা?'
'আমা‌দের উত্তর ভিটার জ‌মিটা।'
'‌সেটা তো নয় বছর আগে সায়ন বি‌ক্রি করে টাকা ব্যবসায় খাটা‌লো।'
শ‌ফিক বলল,
'‌সেখা‌নে ‌তো আমা‌দেরও ভাগ আছে। ভাইয়া তার দাম আমা‌দের দি‌বে না?'
সা‌মিয়া বলল,
'হুম। ব্যবসা ভাইয়া কর‌ছে। টাকা ও কামা‌চ্ছে। আমা‌দের ভা‌গের জ‌মির টাকা দি‌য়ে ভা‌লোই ব্যবসা ক‌রে‌ছে। এখন আমা‌দের টাকা ফেরৎ দিক।'
আ‌মি চূড়ান্ত বি‌স্মিত হ‌য়ে বললাম,
'‌তো‌দের সেই জ‌মির টাকা লাগ‌বে?'
দুজ‌নেই বেশ শক্ত ক‌ণ্ঠে বলল,
'হ্যাঁ।'
আ‌মি এত অবাক খুব সময়ই কমই হ‌য়ে‌ছি। যে ভাই বোন‌দের জন্য এত করলাম তারা আজ...! ক‌ষ্টে বুকটা ফে‌টে যা‌চ্ছিল। বললাম,
'‌ঠিক আছে দি‌য়ে দিব। সে দা‌মে জ‌মি বি‌ক্রি ক‌রে‌ছি সে হিসা‌বে সা‌মিয়া ২ লাখ আর শ‌ফিক চার লাখ পায়। সা‌মিহা তোর লাগ‌বে?'
সা‌মিহা বেশ রাগী ক‌ণ্ঠে বলল,
'পাগল হ‌য়ে‌ছিস, ভাইয়া? আ‌মি অকৃতজ্ঞ, ইতর, লোভী না। আগেই বল‌ছি এসব ভাগ টাগ আমি নি‌ব না। আমি শুধু ভাই‌য়ের কা‌ছে সবসময় ভা‌লোবাসাটা চাই। এর ব্যতিত কিছু না।'
আমি দীর্ঘশ্বাস ছে‌ড়ে সা‌মিয়া, শ‌ফি‌কের দি‌কে তা‌কি‌য়ে বললাম,
'আমা‌কে একটু সময় দে। আমি তো‌দের সব টাকা দি‌য়ে দিব। আপাতত আমার কা‌ছে এত টাকা নেই।'
সা‌মিয়া বলল,
'কি‌সের দুই লাখ? নয় বছ‌রে জ‌মির দাম ডাবল হ‌য়ে‌ছে। আমার চার লাখ আমার চাই।'
শ‌ফিক বলল,
'আমার আট লাখ।'
ছো‌টো মামা সা‌থে সা‌থে বললেন,;
'‌তো‌দের ম‌তো নিমক হারাম জীব‌নে দেখি‌নি।'
মামা আর কিছু বলার আগে শ‌ফিক বলল,
'মামা, জ‌মির ভাগ হয়ে‌ছে, আপ‌নি সব বু‌ঝি‌য়ে দি‌য়ে‌ছেন এবার আপ‌নি আস‌তে পা‌রেন। আমরা ভাই‌বোন নি‌জে‌দেরটা বু‌ঝে নিব।'
মামা যেন চরম বি‌স্মিত। হুট ক‌রে আমার যে কী হল, আমি মৃদু হে‌সে বললাম,
'মামার হিসাব করা বা‌কি আছে। হিসাব যখন ক‌রছিস তখন স‌ঠিকভাবে কর। আমিও স‌ঠিকভা‌বেই হিসাব করব।'
ওরা খা‌নিকটা অবাক হ‌য়ে তাকালে আমি বললাম,
'জ‌মির দাম তোরা বর্তমা‌নের দাম ধ‌রে নি‌তে চা‌চ্ছিস। ঠিকাছে সেটাই দিব। তোদের জ‌মির দাম যে‌হেতু বর্তমা‌নের দাম হিসা‌বে ধরবি, সে‌হেতু‌ আমি তো‌দের পিছ‌নে মোটা অং‌কের যে টাকা খরচ ক‌রে‌ছি সে দামও বর্তমা‌নের হিসা‌বে ধরব। খুচরা নাহয় বাদই দিলাম।'
শ‌ফিক বলল,
'মানে?'
'মানে ত‌ুই জ‌মির বর্তমান দাম হিসা‌বে আট লাখ টাকা দা‌বি কর‌ছিস। তো‌কে আটলাখই দিব, কিন্তু তার আগে তুই আমার টাকা ফেরত দে।'
'‌কি‌সের টাকা।'
'‌তোর স্মৃ‌তি শ‌ক্তি দেখ‌ছি জঘণ্য খারাপ। বছর দ‌ুই আগে তোর চাক‌রির জন্য দশ লাখ টাকা ঘুষ দি‌য়ে‌ছিলাম সেটা ফেরত দি‌বি। ছো‌টো ভাই‌য়ের চাক‌রির ঘু‌ষের টাকা দেওয়ার দা‌য়িত্ব ব‌ড়ো ভাইয়ের না। এ কথা না ধ‌র্মে খাট‌বে, না আইনে। দশলাখ টাকা দুই বছর ব্যাং‌কে থাক‌লে মা‌সে দশ হাজার ক‌রে লাভ আস‌লেও দুই বছ‌রে হ‌তো দুই লাখ চ‌ল্লিশ হাজার। তো মোট হ‌লো বারো লাখ চ‌ল্লিশ হাজ‌ার। বছর তি‌নেক আ‌গে চাক‌রির কথা ব‌লে আরও এক লাখ টাকা নি‌য়ে‌ছি‌লি। মোট তেরো লাখ চ‌ল্লিশ হাজার। তোর খাওয়া, পরা, পড়া-লেখার এবং যাবতীয় খরচ না হয় বাদই দিলাম।'
শ‌ফিক হতভম্ব হ‌য়ে বলল,
'এসব কী বল‌ছো, ভাইয়া?'
আমি মৃদু হে‌সে বললাম,
'‌তো‌দের কষ্ট না করা টাকার এত দাম আর আমার ঘাম ঝরানো ক‌ষ্ট করে আয় করা টাকার কো‌নো দাম নেই? ঐ তেরো লাখ টাকা ব্যবসায় খাটালে এতদিনে ক‌য়েকগুণ হ‌য়ে ফি‌রে আসত। যাক এখন তে‌রো লাখ থে‌কে তোর পাওনা আট লাখ বাদ দি‌লে আমি তোর কা‌ছে পাই পাঁচ লাখ চ‌ল্লিশ হাজার। সেটা ক‌বে দি‌বি? না‌কি তোর জ‌মি বি‌ক্রি ক‌রে উসুল করব?
আর সা‌মিয়া, মে‌য়ে‌দের বি‌য়ে দেওয়ার দা‌য়িত্ব বাবা মা‌য়ের, ব‌ড়ো ভাই এর না। তো তোর বি‌য়ে‌তে তোর বর ইমন‌কে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ক্যাশ দিয়ে‌ছিলাম। তো‌দের দুজন‌কে স্বর্ণ দি‌য়ে‌ছিলাম পাঁচ ভ‌রি। তোর ঘ‌রে ফ্রিজ, টি‌ভি, সোফা থেকে শুরু ক‌রে তরকা‌রি নাড়ার খু‌ন্তিটা পর্যন্ত মা‌য়ের কথায় কি‌নেছিলাম। তো সেসব মি‌লি‌য়ে আজ‌কের দাম হিসা‌বে পাঁচ লা‌খের অনেক বে‌শি খরচ হ‌য়ে‌ছে, কিন্তু আমি পাঁচ লাখই ধরলাম। তারপর তোর বি‌য়েতে তোর শ্বশুর বা‌ড়ির আর আমা‌দের স‌তে‌রো গু‌ষ্ঠির যে হাজার লোক খাই‌য়ে‌ছি তা বাদ দিলাম। তো তোর কা‌ছে মোট দশলাখ পাই। দশ লাখ থে‌কে চার লাখ বাদ দি‌লে ছয় লাখ পাই। ক‌বে দি‌বি বল?
সা‌মিয়া বিস্ফ‌রিত চো‌খে তা‌কি‌য়ে বলল,
'এসব কী বল‌িছিস, ভাইয়া?'
'‌হিসাব কর‌ছি। যেমনটা তোরা হিসাব কর‌লি ঠিক তেমন হিসাব করলাম।'
মা এতক্ষণ চুপচাপ শুন‌লেও এবার বল‌লেন,
'সায়ন, তুই ঠিক কর‌ছিস না।'
'‌কেন? কী কর‌ছি?'
'শ‌ফিক, সা‌মিয়ার সা‌থে অন্যায় কর‌ছিস। তোর কথা যু‌ক্তি ছাড়া। ব‌ড়ো ভাই বাবারই ম‌তো। সে তার কর্তব্য পালন কর‌বে এটাই নিয়ম। তুই সেটার হিসাব চাইতে পা‌রিস না।'
মা‌য়ের কথা শুনে অ‌তি কষ্টে আমি হে‌সে ফেললাম। ছো‌টো মামা বললেন,
'‌ছি শোভ‌া! তোর এত অধঃপতন! একই গ‌র্ভে রে‌খে চার সন্তান‌কে তুই চার চো‌খে দেখ‌ছিস?‌তোর স্বামী মারা যাবার পর কী ক‌রে‌নি সায়ন তো‌দের জন্য? ওরা নাহয় ভাই-‌বোন; ত‌াই লোভী, স্বার্থপ‌রের ম‌তো কথা বল‌ছে। তুই তো মা। তুই কীভা‌বে এমন এক‌চোখা‌গি‌রি কর‌ছিস?'
মা বললেন,
'এক চোখ‌া‌গি‌রি কর‌ছি না। ভাগ যখন হয়ে‌ছে তখন সব কিছুর ভাগ সমানই হ‌বে।'
মামা বল‌লেন,
'সমানই হ‌য়ে‌ছে। সায়ন ব্যবসা করার জন্য যে জ‌মি বিক্রি ক‌রে‌ছিল ও ব্যবসা ক‌রে, ব্যবসায় উন্নতি ক‌রে নি‌জের জন্য কী ক‌রে‌ছে দেখা আমাকে? ঠিক বয়‌সে বি‌য়েটা পর্যন্ত কর‌তে পা‌রে‌নি। যা ক‌রে‌ছে সব তো‌দের জন্য ক‌রে‌ছে। আর বে‌শি দি‌য়ে‌ছে শফিক এর সামিয়া‌কে। আজ ওরা তার ভা‌লো প্র‌তিদান দি‌চ্ছে। ওরা যখন হিসাব চে‌য়ে‌ছে তখন সায়ন হিসাব চাই‌তে পার‌বে না? সায়ন একদম ঠিক ক‌রেছে। বি‌ক্রিত জ‌মির ভাগ চে‌য়েছে, হিসাব চে‌য়ে‌ছে তা-ও বর্তমান দা‌মের হিসা‌বে। তো সায়ন হিসাব দি‌য়ে‌ছে। এখন সায়ন ওদের কা‌ছে যে টাকা পায় সেটা যেন জল‌দি ওরা দি‌য়ে ‌দেয়। নয়তো টাকা কীভা‌বে উসুল কর‌তে হয় আমার জানা আছে।'

Post a Comment

0 Comments