অচেনা_জোয়ার

অচেনা_জোয়ার


আমি কখন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলাম, সেটা আমার নিজেরও মনে নেই।
শুধু অস্পষ্টভাবে মনে আছে, চারপাশে সবাই চিৎকার করছে। কেউ আমাকে ডাকছে, কেউ পানি আনছে। কানে যেন সব শব্দ দূর থেকে ভেসে আসছিল।
আম্মুর কাঁপা কণ্ঠটা প্রথম শুনতে পেলাম।
— "ওরে আল্লাহ... নাওমি! কী হয়েছে তোর? গয়নাগুলো কোথায়? মানুষজন আমাদের শেষ করে দেবে!"
রায়হান ততক্ষণে আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। আমার কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতে শক্ত করে ধরে খুব শান্ত গলায় বলল,
— "নাওমি... আমার দিকে তাকাও। কী হয়েছে? তুমি শুধু সত্যিটা বলো। গয়নাগুলো কোথায়? আমি নিজেই গিয়ে নিয়ে আসব। তুমি ভয় পেও না।"
আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম।
সেই চোখে রাগ ছিল না, ছিল শুধু উদ্বেগ আর বিশ্বাস।
আর সেই বিশ্বাসটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল।
আমি জানতাম, এখন যদি মিথ্যা বলি, তাহলে হয়তো কয়েক মিনিট সময় পাব। কিন্তু পরে সত্যিটা বের হলে সবকিছু আরও ভয়ংকর হয়ে যাবে।
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল।
অনেক কষ্টে ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করে বললাম,
— "গয়নাগুলো... নেই।"
রায়হান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
আমি কান্নায় ভেঙে পড়ে বললাম,
— "গয়নাগুলো... আমার কাছে নেই..."
এই কথাটা শুনেই আম্মু যেন নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। মাথা ঘুরে পাশেই বসে পড়লেন। আশপাশের সবাই ছুটে এল।
ঠিক তখনই রায়হানের মা পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।
আমাদের সবার দিকে একবার তাকিয়ে ঠান্ডা, কঠিন গলায় বললেন,
— "কী হয়েছে? এত নাটক কিসের?"
কেউ কিছু বলার আগেই তিনি আবার বললেন,
— "গয়নাগুলো কোথায়? নাকি বিক্রি করে দিয়েছেন?"
আমি মাথা নিচু করে কাঁদছিলাম।
তিনি আরও কঠিন স্বরে বলতে লাগলেন,
— "যদি টাকার দরকার ছিল, আগে বললেই হতো। মানুষের বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেলতে হয়?"
রায়হান এবার আর চুপ থাকতে পারল না।
— "আম্মু, এখন এসব কথা বলার সময় না।"
কিন্তু তিনি থামলেন না।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অতিথিদের উদ্দেশে বললেন,
— "আপনারা সবাই চলে যান। আজ আর কোনো অনুষ্ঠান হবে না।"
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিবেশ বদলে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসি-আনন্দে ভরা ছিল চারপাশ, সেখানে এখন শুধু ফিসফাস, বিস্ময় আর অপমান।
এক এক করে অতিথিরা চলে যেতে লাগলেন।
যাওয়ার সময় অনেকেই আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন, যেন আমরা ভয়ংকর কোনো অপরাধ করেছি।
রায়হান কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
ওর চোখে রাগের চেয়ে কষ্টটাই বেশি ছিল।
সেই দৃষ্টিটা আজও আমি ভুলতে পারিনি।
কোনো কথা না বলেই ও নিজের পরিবারের সঙ্গে চলে গেল।
আমাদের পৃথিবীটা যেন সেদিন এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছিল।
বাড়িতে ফিরে কেউ কোনো কথা বলছিল না।
নীরবতাই যেন সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
একসময় আব্বু আমাকে সামনে বসিয়ে বললেন,
— "সব সত্যি খুলে বল।"
আমি আর কিছু লুকালাম না।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব বললাম।
কীভাবে সাবিহা বারবার অনুরোধ করেছিল...
কীভাবে আমি না করতে করতে শেষ পর্যন্ত ওর কথায় রাজি হয়েছিলাম...
সবকিছু।
আমার কথা শেষ হওয়ার পর ঘরে নীরবতা নেমে এল।
আব্বু মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
তারপর খুব ধীরে বললেন,
— "মানুষকে বিশ্বাস করা দোষ না। কিন্তু বিশ্বাস করারও একটা সীমা থাকে। একটা ভুল সিদ্ধান্তে শুধু নিজের নয়, পুরো পরিবারের সম্মান ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।"
আব্বুর গলায় অভিমান ছিল, কষ্ট ছিল।
আমি মাথা নিচু করে শুধু কাঁদছিলাম।
আমার বড় ভাই আদনান এতক্ষণ চুপচাপ ছিল।
হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— "আমি আর বসে থাকব না। যা হয়েছে, হয়েছে। আগে গয়নাগুলো কোথায় গেছে সেটা জানতে হবে।"
ঠিক তখনই সাবিহার বাড়ি থেকে খবর এল।
জানা গেল, সে হাসপাতালে ভর্তি।
আমরা আর দেরি করলাম না।
আব্বু, আদনান আর আমি হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম।
ওয়ার্ডে ঢুকতেই দেখি সাবিহা বিছানায় শুয়ে আছে।
মুখে-হাতে আঘাতের দাগ।
মাথায় ব্যান্ডেজ।
আমাকে দেখেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— "নাওমি... আমাকে মাফ করে দে। আমি এমন কিছু চাইনি।"
আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সে চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগল,
— "বাসায় ফিরে গয়নার বাক্সটা আমার স্বামী দেখে ফেলে। এত দামি গয়না দেখে ওর সন্দেহ হয়। আমি লুকাতে চাইছিলাম, কিন্তু ও জোর করে বাক্সটা কেড়ে নেয়। আমি বাধা দিতেই আমাকে মারধর শুরু করে..."
সাবিহা আর কিছু বলতে পারল না।
সে শুধু কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মনে হচ্ছিল, সামনে আরও ভয়ংকর সত্যি অপেক্ষা করছে...

Post a Comment

0 Comments