হৃদয়_পাঁজরে_বসন্ত

হৃদয়_পাঁজরে_বসন্ত


ফাইয়ান ডাক্তারদের ইশারায় শান্ত হতে বলে নিজেই কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখল। নার্স যখন তার বাহুর ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছিল, তখনো ফাইয়ানের তীক্ষ্ণ ও ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল শ্রাবন্তীর ওপর। শ্রাবন্তী তখনো ছুরিটা হাতছাড়া হওয়ার পর বিছানার কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে, তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর ভয়।
ড্রেসিং শেষ হতেই ফাইয়ান উঠে দাঁড়াল। নিজের রক্তাক্ত শার্টের দিকে তাকিয়ে সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর শ্রাবন্তীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো— "তুমি আসলেই একটা স্টুপিট মেয়ে! এখানে সবাই তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, আর তুমি কি না মানুষের ওপর এভাবে চড়াও হচ্ছো? নিজেকে যদি সুরক্ষিত রাখতে চাও, তবে এই পাগলামি বন্ধ করতে হবে। এটা হসপিটাল, কোনো যুদ্ধের ময়দান নয়।"
ফাইয়ানের এই হালকা বকা বা ধমকের পর শ্রাবন্তী আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না, শুধু চোখ বন্ধ করে মাথাটা হাঁটুর ওপর গুঁজে দিল।
ফাইয়ান কেবিন থেকে বেরিয়ে আসার সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নাভিদকে উদ্দেশ্য করে বলল, "নাভিদ, তুমি এখানেই থাকবে। ওর ওপর কড়া নজর রাখো। কোনো রকম অস্বাভাবিক কিছু দেখলে বা ও আবার উত্তেজিত হলে ডাক্তারদের জানাবে। আর হ্যাঁ, কেবিনের আশেপাশে যেন ধারালো কোনো কিছু না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখবে।"
— "জি বস, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি সব সামলে নিচ্ছি," নাভিদ মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করল।
কেবিন থেকে কয়েক কদম এগিয়ে হঠাৎই ফাইয়ানের পা থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় দাঁড়িয়ে রইল সে। একটু আগের ঘটনাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি কাজ করল। শ্রাবন্তীর বর্তমান মানসিক অবস্থায় তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা রাখা নিরাপদ নয়।
ফাইয়ান আবার নাভিদের দিকে ফিরে তাকাল— "নাভিদ, শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিলেই হবে না। আমার মনে হচ্ছে শ্রাবন্তীর জন্য চব্বিশ ঘণ্টার একজন সিনিয়র নার্সের ব্যবস্থা করা দরকার।"
নাভিদ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,— "ঠিক বলেছেন, বস। আমি এখনই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছি।"
ফাইয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,— "অভিজ্ঞ আর ধৈর্যশীল কাউকে চাই। ওর মানসিক অবস্থা এখন খুবই নাজুক। কোনো অবস্থাতেই ওকে একা ফেলে রাখা যাবে না। ওষুধ, খাবার, বিশ্রাম—সবকিছু নিয়মমতো হচ্ছে কি না, সেটাও নার্স নিশ্চিত করবে।"
— "জি বস, আমি এখনই ব্যবস্থা করছি।"
হাসপাতালের করিডোর ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল ফাইয়ান। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একের পর এক চিন্তা। ঠিক তখনই করিডোরের মোড়ে হঠাৎ কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগল তার।— "ওহ! সরি..."
কথাটা বলতে বলতেই দু'জনেই মুখ তুলে তাকাল।ফাইয়ানকে দেখে সামনের মানুষটা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।
— "ফাইয়ান? ব্রো তুই এখানে?"
সে আর কেউ নয়, ফাইয়ানের মামাতো ভাই, হাসপাতালের খ্যাতনামা চিকিৎসক ডাঃ পরশ শাহরিয়ার।পরশ অবাক হয়ে ফাইয়ানের হাতের ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে বলল,— "আমি তো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না! তুই হাসপাতালে? আমার জানামতে তোদের পরিবারের কেউ অসুস্থ নয়। কী হয়েছে?"
ফাইয়ান হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল,— "রিল্যাক্স। তেমন কিছু না। দুইদিন আগে আমার গাড়ির সঙ্গে একটা মেয়ের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। অবস্থা খারাপ ছিল, তাই এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম।"
পরশ ভ্রু কুঁচকে ফাইয়ানের হাতে বাঁধা ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,— "তাহলে তোর হাতে এই ব্যান্ডেজ?"
ফাইয়ান একবার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।— "মেয়েটা জ্ঞান ফেরার পর খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে হঠাৎ একটা ধারালো ছুরি দিয়ে আমার ওপর আক্রমণ করে বসে। ভাগ্য ভালো, আঘাতটা খুব গভীর হয়নি।"
পরশ কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে রইল। তারপর অবিশ্বাসের সুরে বলল,— "তোর মতো ঠান্ডা মাথার মানুষকে কেউ ছুরি মেরেছে, আর তুই এত শান্তভাবে সেটা বলছিস? সত্যিই তুই বদলাইনি।"
ফাইয়ান ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে বলল,— "ও ইচ্ছে করে করেনি। ও এখন মানসিকভাবে খুব ট্রমার মধ্যে আছে। তাই ওর ওপর রাগ করার কোনো মানে হয় না।"
পরশ গভীর দৃষ্টিতে ফাইয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁধে হাত রেখে বলল,
— "চল, আগে পুরো ঘটনাটা আমাকে খুলে বল। মনে হচ্ছে বিষয়টা যতটা শুনতে সহজ, আসলে তার চেয়েও অনেক জটিল।"
ফাইয়ান নীরবে মাথা নেড়ে পরশের সঙ্গে হাসপাতালের করিডোর ধরে সামনে এগিয়ে গেল।
সিতারা বেগম এতক্ষণ সোফায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন, ফারহানাও তার পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। ড্রইংরুমের এই থমথমে অবস্থা এবং মেঝেতে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো দেখে নাফিজ আহমেদ কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— "কী হয়েছে এখানে সিতারা? ফারহানা, ইশানি... তোমরা সবাই এভাবে চুপ করে আছো কেন? আর ড্রইংরুমের এই অবস্থা কেন?"
সিতারা বেগম স্বামীর গলার আওয়াজ পেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সোফা থেকে উঠে এসে নাফিজ আহমেদের হাত জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন। কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় তিনি বলতে শুরু করলেন:
— "আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে গো! কাল রাতে ইফান আমাদের শ্রাবন্তীকে ডিভোর্স দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে! আর আজ... আজ ও অনামিকাকে বিয়ে করে এই বাড়িতে নতুন জামাই সেজে বরণ হতে এসেছিল!"
— "কী?!" নাফিজ আহমেদ আর নয়ন একসাথে চিৎকার করে উঠলেন। নয়নের হাত মুঠো হয়ে গেল রাগে।সিতারা বেগম আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে এবার নিজের গলাটা শক্ত করলেন। তার ভেতরের মাতৃত্বের কষ্টের চেতে উঠলো,, নাফিজ আহমেদ এবং নয়ন পুরো ঘটনা শোনার পর ড্রইংরুমের পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে উঠল। সিতারা বেগমের কান্নার আওয়াজের মাঝেই নাফিজ আহমেদ একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখে-মুখে মেয়ের জন্য কোনো দুশ্চিন্তা বা সমবেদনা ফুটল না, বরং এক চরম উদাসীনতা আর কঠোরতা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
নাফিজ আহমেদ অত্যন্ত কাঠকাঠ গলায় সিতারা বেগম এবং ড্রইংরুমে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বললেন:— "সিতারা, শান্ত হও। আর কান্নাকাটি করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছি—শ্রাবন্তীকে কেউ খোঁজার চেষ্টা করবে না। আমাদের এমন মেয়ের কোনো দরকার নেই!"
বাবার কথার পরপরই নয়ন এক পা এগিয়ে এসে তীব্র বিরক্তির সুরে যোগ করল:— "বাবা একদম ঠিক বলেছেন। যে মেয়ে চার বছরে একটা সংসার ধরে রাখতে পারল না, যার জন্য আজ আমাদের এভাবে অপমানিত হতে হলো, তাকে খুঁজে এনে লাভ কী? কাল যখন জানাজানি হবে যে বিয়ের চার বছর পর মেয়েকে জামাই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন লোকে কী বলবে? সমাজে আমাদের একটা মান-সম্মান আছে। পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনদের মুখে মুখে আমাদের বংশের নাম ছড়াবে। এই লোকলজ্জা আর কলঙ্ক আমরা মাথায় নিতে পারব না।"
নাফিজ আহমেদ ছেলের কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন:
— "হ্যাঁ, সমাজের মানুষের কথার জবাব আমরা দিতে পারব না। যে নিজের ভাগ্য নিজে ধ্বংস করেছে, সে যেখানে খুশি যাক। আজ থেকে এই বাড়িতে শ্রাবন্তীর নাম যেন আর কেউ মুখে না আনে। ও আমাদের জন্য মৃত।"
নিজের জন্মদাত্রী মা, বাবা আর ভাইয়ের মুখ থেকে এমন নির্মম আর লোকলজ্জার দোহাই দেওয়া কথা শুনে ইশানি ও ফারহানা স্তব্ধ হয়ে গেল। যে বোনটার বিপদে সবার আগে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল, তারা আজ সমাজের ভয়ে নিজের রক্তকে এভাবে অস্বীকার করছে!
ইশানি দুই হাত দিয়ে নিজের চোখের জল মুছে সজোরে মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠস্বরে এবার তীব্র ঘৃণা আর জেদ প্রকাশ পেল। সে সবার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল:
— "তোমাদের কাউকে ওকে খুঁজতে হবে না। তোমরা তোমাদের ওই তথাকথিত সমাজ আর সম্মান নিয়ে সুখে থাকো। আমার বোনকে আমি নিজেই খুঁজে বের করব!"
কথাটা শেষ করেই ইশানি আর এক মুহূর্তও সেই বাড়িতে দাঁড়াল না। তীব্র এক জেদ আর বুকে একরাশ কষ্ট নিয়ে সে সদর দরজা খুলে বাইরের রোদে পা বাড়াল। তার একটাই লক্ষ্য—যেভাবেই হোক শ্রাবন্তীকে খুঁজে বের করা।
____________________
অনামিকা আর সালমা বেগম ড্রইংরুমের সব বড় বড় গিফট বক্স সরালেও সালমা বেগমের আসল নজর ছিল সোনার গয়না আর মূল্যবান উপহারগুলোর দিকে। তিনি অনামিকাকে আড়ালে ডেকে বেশ চতুর গলায় বললেন,
— "শোনো অনামিকা, শাড়ি-কাপড় যা নেওয়ার নেও। কিন্তু বৌভাতে পাওয়া সোনার যত গিফট আছে, ওগুলো সব তুমি আমার কাছে দিয়ে দেও। আমার কাছে ওগুলো বেশি নিরাপদে থাকবে। পরে সুযোগ বুঝে তোমাকে দিয়ে দেব।"
অনামিকা শাশুড়ি মায়ের এমন প্রস্তাব শুনে মনে মনে একটু দমে গেলেও মুখে চিলতে হাসি ফুটিয়ে রাখল। সে খুব ভালো করে জাও। সোনা একবার শাশুড়ি মায়ের হাতে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া সহজ হবে না। তাই সে মিষ্টি সুরে বলল,— "মা, আপনি তো জানেনই এই বাড়ির মানুষজন আমাকে কেমন বাঁকা চোখে দেখছে। এখন যদি গয়নার বাক্সগুলো আপনার ব্যাগে যায়, তবে জেবা আর চাচিআম্মা তিলকে তাল বানিয়ে বড় একটা ঝামেলা পাকাবে। তার চেয়ে বরং আমি কৌশলে এই সব জিনিস এখনই আমার নিজের আলমারির লকারে তালা মেরে রেখে আসি। তাহলে কারো কিছু বলার সুযোগ থাকবে না।"
সালমা বেগম অনামিকার এই চতুরতায় মনে মনে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও বৌয়ের মুখের ওপর আর জোর খাটাতে পারলেন না। অনামিকা অত্যন্ত সাবধানে আর চটজলদি সব সোনার উপহার নিজের আঁচলে চেপে ধরে ড্রইংরুম থেকে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলো।
দূর থেকে তাদের এই সোনা আর গয়না নিয়ে টানাটানি আর ফিসফিসানি স্পষ্ট দেখছিলেন ফিহা বেগম আর জেবা।
জেবা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ফিহা বেগমের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
— "দেখলেন চাচিমনি? শাশুড়ি বৌয়ের কী নিখুঁত অভিনয় আর লোভের খেলা!
ফিহা বেগমও উপহাসের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন,
— "ঠিকই বলেছিস জেবা। পাপের টাকায় গড়া সংসারে এমনই হয়। এরা আজ সোনা-দানা নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে করুক, আমরা কিচ্ছু বলব না। আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদের এই সস্তা ড্রামা আর মজা দেখব। অনামিকা ভাবছে সে খুব চালাক, কিন্তু অভিশাপের হাত থেকে সে নিজেকে লুকাতে পারবে না।"
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর ফাইয়ান কোনো কথাই শুনল না। প্রায় জোর করেই পরশকে নিজের সঙ্গে বাড়িতে নিয়ে এলো।গাড়ি বাড়ির আঙিনায় ঢুকতেই পরশ হালকা বিরক্তির সুরে বলল,
— "ব্রো, আমি কিন্তু হাসপাতালে ডিউটিতে ছিলাম। এভাবে টেনে নিয়ে এলি কেন?"
ফাইয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
— "সারাদিন রোগী দেখিস, আজ নিজের মানুষগুলোর সঙ্গেও একটু সময় কাটিয়ে যা।"
দু'জন পাশাপাশি ড্রইংরুমে ঢুকতেই সোফায় বসে থাকা সৃষ্টির দিকে নজর গেল পরশের। মুহূর্তেই তার মুখে পরিচিত হাসি ফুটে উঠল।
— "আরে... সোনা বৌদি! কেমন আছেন?"
সৃষ্টি হেসে উঠে দাঁড়াল— "আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি পরশ ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?"
— "আমি তো একদম ভালো আছি। তবে আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা হয় না বলেই আফসোস লাগে।"
সৃষ্টি মুচকি হেসে বলল,
— "আপনার তো হাসপাতাল আর রোগীদের নিয়েই সারাদিন কেটে যায়। পরিবারের জন্য সময় কোথায়?"
পরশ মাথা চুলকে লজ্জিত হাসল— "ডাক্তারি পেশায় ঢোকার পর বুঝেছি, নিজের সময় বলে কিছু থাকে না।"
এমন সময় সৃষ্টির চোখ পড়ল ফাইয়ানের হাতে বাঁধা ব্যান্ডেজে। হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে বলল,— "ফাইয়ান! তোমার হাতে ব্যান্ডেজ কেন? কী হয়েছে?"
পরশ সঙ্গে সঙ্গে ফাইয়ানের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে বলল,
— "ফাইয়ানের হবু বৌ, আপনার জামাই কিন্তু আজকাল আপনাকে রোমাঞ্চকর জীবন কাটাচ্ছে। পুরো ঘটনাটা শুনলে আপনিও অবাক হয়ে যাবেন।"
ফাইয়ান ভ্রু কুঁচকে পরশের দিকে তাকিয়ে বলল,— "বেশি নাটক না করে চুপচাপ বস।"
পরশ হেসে ফেলতেই ড্রইংরুমের পরিবেশ কিছুটা হালকা হয়ে উঠল। তবে সৃষ্টির চোখে তখনও স্পষ্ট উদ্বেগ—ফাইয়ানের হাতে ব্যান্ডেজ দেখে তার মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।ঠিক তখনই রান্নাঘরের দিক থেকে ট্রেতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর হালকা নাস্তা নিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকলেন ফাইয়ানের বড় ভাবি, মিসরি।সবার সামনে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে তিনি মুচকি হেসে পরশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "নিন ডাক্তার সাহেব, আগে চা খান। আমাদের কথা তো আপনাদের এই দেবরের মনে আর থাকেই না। এতদিন পর আপনাকে ধরে এনে তবেই দেখা হলো!"
পরশ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,— "বড় ভাবি, দোষটা কিন্তু আমার না। আপনার এই দেবর বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে পড়ছে অথচ আপনারা মেয়ে খুঁজে পাচ্ছেন না!সেই শোকে সব বাদ দিয়ে কাজ করি,,আজও হাসপাতালে ডিউটি করছিলাম, জোর করে টেনে নিয়ে এসেছে।"
মিসরি ঠোঁট বাঁকিয়ে ফাইয়ানের দিকে তাকালেন— "আমি তো সেই কবে থেকে বলছি, একদিন সবাইকে নিয়ে বসে গল্প করব। কিন্তু আমাদের দেবর সাহেবের সময়ই হয় না।"
পরশ সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ লুফে নিয়ে হেসে বলল,— "আসলে কী জানেন ভাবি, এখন এত ব্যস্ত যে আত্মীয়স্বজনদের জন্য আলাদা করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। মনে হয় আগে পিএর সঙ্গে কথা বলতে হবে, তারপর দেখা করার অনুমতি মিলবে!"
পরশ, ফাইয়ান, সৃষ্টি, মিসরি, ফারাহ—সবাই নাস্তা করতে করতে গল্পে মেতে উঠল। অনেকদিন পর সবাইকে একসঙ্গে পেয়ে হাসি-আড্ডায় জমে উঠল বিকেলটা।হঠাৎ মিসরি দুষ্টু হেসে ফাইয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,— "শোনো, এবার কিন্তু তোমার বিয়ের কথাটা সিরিয়াসলি ভাবতে হবে। বাড়িতে আর কতদিন একা একা ঘুরে বেড়াবে?"
কথাটা শুনতেই সবাই একসঙ্গে ফাইয়ানের দিকে তাকাল।পরশ মুখ টিপে হেসে বলল,— "একদম ঠিক বলেছেন, ভাবি। আমার তো মনে হয় ব্রোর বিয়ের কার্ড ছাপানোর সময় হয়ে গেছে।"
সৃষ্টি মৃদু হেসে ফাইয়ানের দিকে তাকাতেই ফাইয়ান বিরক্তির ভান করে বলল,— "তোমাদের আর কোনো বিষয় নেই? দেখা হলেই শুধু বিয়ে, বিয়ে!"
পরশ হেসে বলল,— "তা না হলে কী? তুই তো আর নিজে থেকে কিছু বলবি না!"
পরশের কথা শুনে সৃষ্টি অকারণেই লজ্জা পেয়ে গেল। তার গাল দুটো টুকটুকে লাল হয়ে উঠতেই মিসরি মুচকি হেসে বললেন,— "এই যে সৃষ্টি, তুমি আবার লজ্জা পাচ্ছ কেন?
সৃষ্টি আরও অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করে চায়ের কাপে চোখ রাখল। আর তার সেই লাজুক মুখ দেখে সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই ফারাহ কথার মোড় ঘুরিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
— "আচ্ছা, তোমরা যা-ই বলো, আগামী শুক্রবার কিন্তু সবাইকে নিয়ে শপিংয়ে যাব। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয় না। নতুন কালেকশনও নাকি এসেছে!"
মিসরি সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলেন,— "আমি তো রাজি। আমারও কিছু কেনাকাটা বাকি আছে।"
ঘড়ি রাত বারোটার ঘরে মা ছেলে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে,,জিনাত খন্দকারের এই অনীহা এবং ক্ষোভের মুখে ফাইয়ান শান্তভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করল। মায়ের এই ধরণের প্রতিক্রিয়া সে আগেই আঁচ করতে পেরেছিল, কারণ একজন মা হিসেবে নিজের ছেলের হাতের ক্ষত দেখে তিনি স্থির থাকতে পারবেন না—এটাই স্বাভাবিক।
ফাইয়ান তার মার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "মা, তুমি শুধু শুধু রেগে যাচ্ছো। মেয়েটির কোনো দোষ নেই, ও চরম একটা মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি দুর্ঘটনার পর , সেই ধাক্কাটা ও এখনো সামলে উঠতে পারেনি।
জিনাত:মেয়েটার কাছে তুমি আর যাবে না,,
ফাইয়ান তার মায়ের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "মা, তোমাকে পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে। এটা শুধু কোনো এক্সিডেন্ট বা টাকার ব্যাপার না, ইটস অ্যাবাউট হিউম্যানিটি এটা মানবতার বিষয়। একটা মেয়ের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছে, আর আমি তাকে এভাবে মাঝরাস্তায় ফেলে দিতে পারি না। আই অ্যাম রেসপন্সিবল ফর দিস কারণ আমার গাড়ির সাথেই ঘটনাটা ঘটেছে।"
জিনাত খন্দকার কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু ফাইয়ান হাত তুলে তাকে আলতো করে থামিয়ে দিল। সে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "প্লিজ ডোন্ট ওরি আমি নিজের খেয়াল রাখতে জানি।তুমি খেয়ে নাও, আমার কিছু জরুরি কাজ আছে।"
কথাটা শেষ করেই ফাইয়ান আর সেখানে দাঁড়াল না। মায়ের উত্তরের অপেক্ষা না করে সে দ্রুত পায়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
____________________
রাত গভীর। সারাদিনের কোলাহল থেমে গেছে। আলো-ফুলে সাজানো বাসরঘরটা এখন অদ্ভুত নীরব।ধীরে ধীরে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল ইফান। তার মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, বরং ক্লান্তি আর বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। দরজা বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল সে।
খাটের একপাশে মাথা নিচু করে বসে আছে অনামিকা। ভারী লাল বেনারসি, গা ভরা গয়না আর সারাদিনের ক্লান্তিতে তার মুখটাও বিবর্ণ হয়ে আছে।নীরবতা ভাঙল অনামিকাই।
— "আজকের দিনটা... এমন হবে, কখনো ভাবিনি।"
ইফান কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে কোটটা খুলে সোফার ওপর রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ পর অনামিকা আবার বলল, "ওই সময়ে ঘটনায়.. খুব কষ্ট পেয়েছো।"
ইফান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।— "যা হওয়ার ছিল, তাই হয়েছে। এখন এসব নিয়ে আর কথা বলতে চাই না।"
অনামিকার মাথা নিচু করে বলবো।—সব দোষ আমার
ইফান এবার ঘুরে তাকাল— "তুমি যদি নিজেকে অপরাধী ভাবো, তাহলে এই সম্পর্ক এগোবে কীভাবে?"
ইফান ধীরে ধীরে অনামিকার সামনে এসে দাঁড়াল।
— "একটা কথা বলি?"
অনামিকা মাথা তুলে তাকাল।
— "হুম..."
— "আজ সারাদিন অনেক ঝড় গেছে। কিন্তু আমি চাই, আমাদের নতুন জীবনটা সেই ঝড় দিয়ে নয়, বিশ্বাস দিয়ে শুরু হোক।"
অনামিকার চোখ ভিজে উঠল। সে মৃদু হাসল।
— "আমিও তাই চাই।"
ইফান আস্তে করে তার হাতটা নিজের হাতে নিল। কোনো তাড়াহুড়ো নয়, কোনো চাপ নয়—শুধু নীরব এক আশ্বাস।
— "যদি কখনো কোনো বিষয়ে অস্বস্তি লাগে, আমাকে বলবে। আমরা দু'জন মিলেই সব সামলে নেব।"
অনামিকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে স্বস্তির হাসি।কয়েক মুহূর্ত পর ইফান আলতো করে তার কপালে একটি স্নেহভরা চুম্বন এঁকে দিল। অনামিকা লাজুক চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
বাইরে রাত আরও গভীর হলো। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে এসে পড়ল। দু'জনের নীরব কথোপকথন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর একে অপরের প্রতি জন্ম নেওয়া বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম রাতটি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।
______________________
সাতটি দিন যেন পলকের মাঝেই কেটে গেল। ফাইয়ানের কর্পোরেট লাইফের ব্যস্ততা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে হাসপাতালের দিকে যাওয়ার ফুসরত মেলেনি। তবে নাভিদ নিয়মিত তাকে শ্রাবন্তীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার আপডেট দিয়ে যাচ্ছিল। অভিজ্ঞ নার্সের তত্ত্বাবধানে এবং ডাঃ আন্তরিক চিকিৎসায় শ্রাবন্তী আগের চেয়ে অনেকটাই শান্ত হয়েছে, তার ভেতরের সেই তীব্র আতঙ্ক ও আক্রমণাত্মক ভাবটা এখন আর নেই।
এদিকে ইশানি পাগলের মতো শহরের এমাথা-ওমাথা খুঁজে বেড়াচ্ছে তার বোনকে। শ্রাবন্তীর বন্ধুবান্ধব, পরিচিত জায়গা—কোথাও সে খোঁজ নিতে বাকি রাখেনি। বাবা আর ভাইয়ের অমন নির্মম আচরণের পর ইশানির জেদ আরও বেড়ে গেছে। সে প্রতিজ্ঞা করেছে, যেকোনো মূল্যে বোনকে উদ্ধার করবেই।
শুক্রবার সকালে অফিসের কিছু জরুরি ফাইল সই করে ফাইয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাত থেকে কলমটা নামিয়ে রেখেই তার মনে পড়ল শ্রাবন্তীর কথা। গত এক সপ্তাহে সহসস খোঁজ নেওয়া হয়নি।
ফাইয়ান মাথা চেপে ধরে বসে আছে কেভিনে। নাভিদের কথা শুনে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। এত কড়া নিরাপত্তা আর সিনিয়ার নার্সের চব্বিশ ঘণ্টার পাহারার পরও মেয়েটি কীভাবে উধাও হয়ে গেল, সেটা সে কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারছিল না।
ফাইয়ান ফোনটা কানের কাছে আরও শক্ত করে চেপে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "নাভিদ! এটা কীভাবে সম্ভব? আই টোল্ড ইউ টু কিপ অ্যান আই অন হার (আমি তোমাকে ওর ওপর নজর রাখতে বলেছিলাম)! হাসপাতালের সিকিউরিটি আর নার্সরা তখন কী করছিল?"
ওপাশ থেকে নাভিদের কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট ভয় আর অপরাধবোধ ফুটে উঠল, "আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, বস। আমাদের ধারণা, নার্স যখন সকালের ওষুধের জন্য ডিউটি ডেস্কে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই ফাঁকে ও ওখান দিয়ে বের হয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হচ্ছে, কিন্তু এখনো কোনো হদিস মেলেনি।"
ফাইয়ান:"স্টপ দিস ননসেন্স অ্যান্ড ফাইন্ড হার! (এই ফালতু কথা বন্ধ করো আর ওকে খুঁজে বের করো!)" ফাইয়ান আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওয়ালেট টা পকেটে ঢুকিয়ে সে বলল, "আমি নিজেই হাসপাতালে আসছি।
ফাইয়ান তড়িৎ গতিতে অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসল। পুরো পথজুড়ে তার মাথায় নানারকম দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল—একটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেয়ে এই অচেনা শহরে একা একা কোথায় যাবে?
হাসপাতালে পৌঁছানোমাত্রই নাভিদ ও হাসপাতালের সিকিউরিটি ইনচার্জ হন্তদন্ত হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল। ফাইয়ানের মুখের গম্ভীর আর রাগান্বিত ভাব দেখে কারও মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা শ্রাবন্তীর কেবিনে গেল। বিছানাটা শূন্য পড়ে আছে, একপাশে তার অর্ধেক খাওয়া সকালের নাস্তার ট্রে।
ফাইয়ান কঠোর ও গম্ভীর কণ্ঠে নাভিদের দিকে তাকিয়ে বলল, "হাসপাতালের সব কটা এক্সিট গেটে গার্ড বসাও। এই এলাকার আশেপাশের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে যতগুলো রাস্তা, গলি আর সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, সব চেক করো। আমার সব লোকবলকে কাজে লাগাও। যেকোনো মূল্যে ওই মেয়েকে খুঁজে বের করতে হবে, ও এখন আমার কাছে একটা আমানত!"
নাভিদ ফাইয়ানের এই রূপ দেখে আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে তার দলবল এবং সিকিউরিটি টিমকে নির্দেশ দিতে শুরু করল। ফাইয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন হাসপাতালের বাইরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে নিবদ্ধ। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যতক্ষণ না শ্রাবন্তীকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পাচ্ছে, ততক্ষণ সে শান্ত হবে না।
হাসপাতালের চারপাশ, করিডোর, এমনকি পেছনের বাগান—কোথাও শ্রাবন্তীর কোনো খোঁজ মিলল না। ফাইয়ানের ভেতরের উদ্বেগ এবার চরম সীমায় পৌঁছে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে হাসপাতালের পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে বাইরের রাস্তা আর গলির দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। নাভিদ ও সিকিউরিটি গার্ডদের ভিন্ন ভিন্ন দিকে পাঠিয়ে সে নিজে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল হাসপাতালের ঠিক পেছনের একটি নির্জন গলির দিকে।
কিছুদূর এগোতেই ফাইয়ানের কানে এল কয়েকজন বখাটে ছেলের অট্টহাসি আর একটা মেয়ের কান্নার অবরুদ্ধ আওয়াজ। ফাইয়ানের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে শব্দ লক্ষ্য করে দৌড়ে গেল।
গলির এক কোণে, দেওয়ালের সাথে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে শ্রাবন্তী। তার চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেছে। তিন-চারজন বখাটে ছেলে তাকে ঘিরে ধরে অসভ্যতা করছে। একজন তো সাহস বাড়িয়ে শ্রাবন্তীর গায়ের ওড়নাটা টেনে ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করেছে! শ্রাবন্তী নিজের ওড়নাটা দুহাতে জাপটে ধরে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে আর ভয়ে কাঁপছে।
এই দৃশ্য দেখা মাত্রই ফাইয়ানের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। নিজের রাগ আর সে ধরে রাখতে পারল না। সে বাঘের মতো গর্জে উঠে এক লাফে সামনে এগিয়ে গেল।
"হেই! স্টপ ইট রাইট নাও! হাউ ডেয়ার ইউ টাচ হার?—ফাইয়ানের বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর গলিটায় প্রতিধ্বনিত হলো।
হঠাৎ এমন সুঠামদেহী আর ক্রুদ্ধ এক যুবককে সামনে দেখে বখাটেরা থমকে গেল। ওড়না ধরে থাকা ছেলেটি কড়া গলায় বলল, "এই মিয়া, আপনি কে? ফুটি মারতে আসছেন কেন? রাস্তা মাপেন!"
ফাইয়ান আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে সটান ছেলেটির কলার চেপে ধরে চোয়ালে এক প্রচণ্ড ঘুষি বসিয়ে দিল। ছেলেটি ছিটকে গিয়ে ড্রেনের পাশে পড়ল। বাকিরা তেড়ে আসতে নিলেই ফাইয়ান নিজের চোখ দুটো রাগে লাল করে চরম আক্রোশে চেঁচিয়ে উঠল, "নড়ার চেষ্টাও করবি না একদম! আমি তোদের সব কটাকে শেষ করে দেব! পুলিশ ডাকার আগে এখান থেকে দূর হ!
ফাইয়ানের এই ভয়ংকর রূপ আর আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মারমুখী ভাব দেখে বখাটেরা বুঝতে পারল এরা কোনো সাধারণ মানুষের সাথে পাঙ্গা নিয়েছে। মার খাওয়া ছেলেটাকে টেনে তুলে নিয়ে তারা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, লেজ গুটিয়ে গলি থেকে দৌড়ে পালাল।
চারপাশটা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। সে নিজেকে কিছুটা শান্ত করে শ্রাবন্তীর দিকে তাকাল।
শ্রাবন্তী এতক্ষণ দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে কাঁপছিল। যখন সে বুঝল বিপদ কেটে গেছে, সে আস্তে আস্তে চোখ মেলল। সামনে ফাইয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ভেতরের সমস্ত ভয়, একাকীত্ব আর সারাদিনের মানসিক যন্ত্রণা বাঁধ ভাঙা কান্নায় রূপ নিল।
শ্রাবন্তী আর কোনো কিছু চিন্তা না করে, এক ছুটে গিয়ে ফাইয়ানের বুক জড়িয়ে ধরল। ফাইয়ানের শার্টের কাপড় খামচে ধরে সে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার কান্নায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল শুধু এক চরম অসহায়ত্ব আর সুরক্ষার আকুতি।
ফাইয়ান প্রথমে কিছুটা স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মেয়েটি কিছুদিন আগে তাকে দেখেই আক্রমণ করে বসলো, সে আজ তাকেই নিজের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় ভেবে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। সে মাথায় হাত বুলিয়ে অত্যন্ত নরম ও শান্ত গলায় বলল, "**ইটস ওকে... রিল্যাক্স। আই অ্যাম হিয়ার। ইউ আর সেফ নাও। আর কোনো ভয় নেই...

Post a Comment

0 Comments