"গোপন পরিচয়ের প্রথম দরজা..." 

ভোর পাঁচটা। 
চারদিকে এখনও হালকা কুয়াশা।
চৌধুরী বাড়ির সবাই তখন গভীর ঘুমে।
কিন্তু...
আরহাম অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে গেছে।
আলমারির ভেতর থেকে একটি ছোট কালো ব্যাগ বের করল।
তার ভেতর কয়েকটি ফাইল, একটি ল্যাপটপ আর সেই ধাতব পরিচয়পত্র।
সে কয়েক সেকেন্ড পরিচয়পত্রটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব যত্ন করে আবার ব্যাগে রেখে দিল।
ফিসফিস করে বলল—
— "আর কিছুদিন... তারপর সব সত্যি জানবে সবাই।" 
সকালে...
মেহরীন ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
শীতল বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। 
নিচে তাকিয়ে দেখল...
আরহাম বাগানের ফুলগাছে পানি দিচ্ছে।
তার মুখে আজও সেই শান্ত হাসি।
মেহরীনের মুখেও দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
— "আজকে আবার একটু জ্বালানো যাক।" 
সে নিচে নেমে আস্তে করে পানির পাইপটা ঘুরিয়ে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে...
পানির ধারা ঘুরে সোজা আরহামের গায়ে এসে পড়ল। 

— "আরে!"
আরহাম পুরো ভিজে গেল।
উপরে তাকাতেই দেখল...
মেহরীন দুই হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
— "সরি স্যার!" 
— "ইচ্ছা করে করেছ?"
— "একদম!" 
আরহাম মাথা নেড়ে হেসে ফেলল।
হঠাৎ সে পাইপটা তুলে ধরল।
— "আচ্ছা... এবার আমার পালা।"
— "না... না...!" 
মেহরীন দৌড় দিল।
কিন্তু দু'পা যেতেই...
ঝপাৎ!
হালকা পানির ছিটা এসে পড়ল তার ওড়নায়। 
— "আরহাম!"
— "সমান সমান।" 
দূর থেকে রায়হান চিৎকার করে উঠল—
— "মেহু আপু হেরে গেছে!" 
পুরো বাড়ি হাসিতে ভরে উঠল।
নাশতার টেবিলে বসেও মেহরীন মুখ ফুলিয়ে আছে।
রোকেয়া বেগম অবাক হয়ে বললেন—
— "কী হয়েছে?"
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
— "আরহাম ভাইয়া মেহু আপুর ওপর পানি ছিটিয়েছে!" 
মেহরীন রাগী মুখে বলল—
— "আমি আগে করেছিলাম, সেটা বলছিস না কেন?"
টেবিলে আবার হাসির রোল পড়ে গেল।
আরহাম চা খেতে খেতে মৃদু হেসে বলল—
— "দুষ্টুমিরও একটা মূল্য দিতে হয়।"
মেহরীন জিভ বের করে দেখাল।
— "দেখা যাবে!" 
কলেজে পৌঁছানোর পর...
আজ ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। 

চারদিকে সাজসজ্জা।
ছাত্রছাত্রীরা দৌড়ঝাঁপ করছে।
মেহরীন আর আয়েশা মিলে স্টেজ সাজানোর দায়িত্ব পেয়েছে।
হঠাৎ...
একটি ভারী লাইট স্ট্যান্ড ঢিলে হয়ে উপরের দিক থেকে কাত হয়ে পড়তে শুরু করল।
কেউ খেয়াল করেনি।
কিন্তু দূর থেকে আরহামের চোখে পড়ল।
— "মেহরীন! সরে যাও!" 
মেহরীন কিছু বুঝে ওঠার আগেই...
আরহাম দৌড়ে এসে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
ধড়াম!
লাইট স্ট্যান্ডটা ঠিক যেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই পড়ে ভেঙে গেল। 
চারদিকে চিৎকার পড়ে গেল।
— "আল্লাহ!"
— "অল্পের জন্য বেঁচেছে!"
মেহরীন ভয়ে কেঁপে উঠেছে।
তার হাত এখনও আরহামের হাতে।
আরহাম উদ্বিগ্ন গলায় বলল—
— "লেগেছে কোথাও?"
মেহরীন ধীরে মাথা নাড়ল।
— "না..."
কিন্তু তার কণ্ঠ কাঁপছে।
আরহাম কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না।
শুধু নিশ্চিত হলো, সে নিরাপদ।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
— "পরেরবার চারপাশে খেয়াল রাখবে।"
মেহরীন মৃদু স্বরে বলল—
— "আপনি না থাকলে..."
কথাটা শেষ করতে পারল না।
দূরে দাঁড়িয়ে ইশরাত পুরো ঘটনাটা দেখছিল।
সে বুঝতে পারল...
এটা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনার মতো লাগছে না।
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
মনে মনে বলল—
"কেউ সত্যিই মেহরীনের ক্ষতি করতে চাইছে?"
প্রথমবারের মতো তার বুকেও ভয় কাজ করল।
এদিকে...
কলেজের সিসিটিভি রুমে একজন কর্মচারী আরহামের হাতে একটি পেনড্রাইভ দিল।
— "স্যার, আপনি যে ফুটেজ চেয়েছিলেন..."
আরহাম সেটা পকেটে রেখে বলল—
— "ধন্যবাদ।"
কিন্তু করিডোরের শেষ প্রান্তে...
এক জোড়া অচেনা চোখ সবকিছু লক্ষ্য করছিল।
লোকটি আস্তে করে ফোনে বলল—
— "সে ফুটেজ পেয়ে গেছে..."
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
— "তাহলে প্ল্যান বদলাও। এবার আর কোনো ভুল করা যাবে না।"
লোকটি ফোন কেটে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। 
দিনের শেষে...
কলেজের ছাদে একা দাঁড়িয়ে ছিল আরহাম।
তার হাতে সেই পেনড্রাইভ।
সে ল্যাপটপে ফুটেজ চালু করতেই...
স্ক্রিনে একটি কালো হুডি পরা মানুষকে দেখা গেল।
লোকটি ইচ্ছে করেই লাইট স্ট্যান্ডের নাট খুলে দিচ্ছে।
আর ফুটেজের একেবারে শেষ মুহূর্তে...
লোকটি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চলে গেল।
আরহামের চোখে কঠিন দৃঢ়তা নেমে এল।
সে ধীরে ধীরে বলল—
— "এবার তোমার পালা..."
চলবে... 
"ঝড়ের আগে নীরবতা..." 

কলেজের ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আরহাম।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে বারবার একই ফুটেজ চলছে।
কালো হুডি পরা লোকটি লাইট স্ট্যান্ডের নাট আলগা করছে...
তারপর ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে চলে যাচ্ছে।
আরহাম ভিডিওটা থামিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
— "এটা দুর্ঘটনা ছিল না..." 
সে পেনড্রাইভটা পকেটে রেখে দ্রুত নিচে নেমে এল।
এদিকে...
মেহরীন কলেজের বাগানে বেঞ্চে বসে আছে।
আজকের ঘটনার ধাক্কা এখনও কাটেনি।
আয়েশা তার পাশে বসে বলল,
— "তুই ঠিক আছিস তো?"
মেহরীন হালকা হাসল।
— "হুম... কিন্তু আজ যদি স্যার সময়মতো না আসতেন..."
কথাটা শেষ করতে পারল না।
তার চোখে অজান্তেই ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই আরহাম সামনে এসে দাঁড়াল।
— "চলো, বাড়ি যাই।"
মেহরীন মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।
গাড়িতে ফেরার পথে দু'জনই চুপচাপ।
বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। 
হঠাৎ মেহরীন নীরবতা ভেঙে বলল,
— "আপনি কি মনে করেন... আজকের ঘটনাটা সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল?"
আরহাম কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে উত্তর দিল,
— "সব প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া যায় না।"
— "তাহলে আপনি কিছু জানেন?"
আরহাম মৃদু হাসল।
— "আমি শুধু চাই, তুমি সাবধানে থাকো।"
মেহরীন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল...
আরহাম এমন কিছু জানে, যা সে কাউকে বলছে না।
বাড়িতে ফিরতেই ছোটরা দৌড়ে এল।
রায়হান চিৎকার করে বলল—
— "মেহু আপু! আজকে কিন্তু ক্যারাম খেলতে হবে!" 
মেহরীন জোর করে হাসল।
— "ঠিক আছে, তবে হারলে কিন্তু কাঁদবি না!"
কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রইংরুম আবার হাসিতে ভরে গেল।
দূরে দাঁড়িয়ে আরহাম সেই দৃশ্য দেখছিল।
মেহরীন নিজের ভয় লুকিয়ে সবাইকে হাসানোর চেষ্টা করছে...
এই দৃশ্য দেখে তার চোখে একরাশ মমতা ফুটে উঠল।
রাতে...
ইশরাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
আজ সারাদিনের ঘটনা তার মনকেও অস্থির করে তুলেছে।
হঠাৎ অচেনা নম্বর থেকে আবার ফোন এল।
— "হ্যালো?"
ওপাশ থেকে শান্ত গলা—
— "তোমার সাহায্য দরকার।"
ইশরাত কড়া গলায় বলল—
— "আমি কাউকে আঘাত করতে চাই না।"
— "আমরা শুধু কিছু তথ্য চাই।"
— "না।"
সে কোনো কথা না শুনেই কল কেটে দিল।
ফোনটা শক্ত করে ধরে নিজের মনে বলল—
— "রাগ থাকতে পারে... কিন্তু কারও ক্ষতি আমি হতে দেব না।" 
রাত বারোটা।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আরহাম নিজের স্টাডি রুমে ল্যাপটপ খুলে ফুটেজের প্রতিটি ফ্রেম বড় করে দেখতে লাগল।
হঠাৎ...
একটি প্রতিফলনে কিছু চোখে পড়ল।
লোকটির কব্জিতে একটি বিরল নকশার ব্রেসলেট।
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবিটি আলাদা করে সংরক্ষণ করল।
ঠিক তখনই এনক্রিপ্টেড ফোনে নতুন বার্তা এলো—
"Good. You've found the first clue."
তারপর আরেকটি—
"Can you find the second?"
আরহামের চোখ স্থির হয়ে গেল।
সে বুঝল...
কেউ তাকে ইচ্ছা করেই রহস্যের ভেতরে টেনে নিচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল।
দূরে চৌধুরী বাড়ির বাগানে বাতাসে দুলছে জুঁই ফুল। 
খুব আস্তে সে বলল—
— "আমি সত্যিটা খুঁজে বের করব... যাই হোক না কেন।"
ঠিক সেই মুহূর্তে...
বাড়ির মূল গেটের বাইরে একটি কালো গাড়ি কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। 
গাড়ির ভেতরে বসা অচেনা লোকটি শুধু একটি কথাই বলল—
— "খেলা এখন সত্যিই শুরু হলো..." 
সমাপ্ত।

0 Comments