অপ্রেমের_গল্পটি_যেভাবে_শেষ_হয়েছিল

 

অপ্রেমের_গল্পটি_যেভাবে_শেষ_হয়েছিল

শিশিরের বিয়ের ঘটনাটা ভীষণ নাটুকে। বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেলে সেটাকে বলে এক্সিডেন্টাল বিয়ে। শিশিরের ক্ষেত্রে সেরকম কিছু ঘটলো না। ও'কে ডেকে নিয়ে বিয়ের মালা পরানো হয়েছে। তবুও বিয়েটা ওর কাছে ভয়ংকর এক দুর্ঘটনা। শিশির সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে জম্পেশ পার্টি করে বাড়ি ফিরেছিল। ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় বারোটা। ঘরে ফিরেই দেখলো তুষার সারা ঘরে পায়চারি করছে। তুষার ওর ছোট ভাই। শিশিরকে দেখে ব্যস্ত গলায় বলল,

"তোমার ফোনে কী হইছে? বাবা ফোন করেছিলেন। এক্ষুনি যেতে হবে।"
শিশির হাই তুলে সোফার উপর বসে পড়লো। বলল,
" সাবধানে যাস। "
"আমাকে না। আমাদের। মানে তুমি ও যাবে।"
"আমি গিয়ে কী করব?"
"সে আমি কী জানি! বাবা তোমাকে নিয়েই যেতে বলেছেন।"
শিশির অতটা পাত্তা দিলো না। বলল,
"বাবাকে বলে দে যে আমার পেট খারাপ। বাথরুমে যাচ্ছি আর আসছি।"
তুষার শিশির কে কিছু না বলে বাবাকে ফোন করে বলল,
"হ্যালো বাবা, শিশিরের নাকি খুব খারাপ ভাবে ডিসেন্ট্রি হয়েছে। "
শিশির লাফ দিয়ে উঠে বসলো। তুষার ফোন টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"নাও বাবার সঙ্গে কথা বলো। "
শিশির কটমট চোখে তুষারের দিকে তাকালো। ফোন কানে নিয়ে মিনমিনে গলায় বলল,
"হ্যালো বাবা?"
ফোনের ওপাশ থেকে বাবা গম্ভীর গলায় বললেন,
"তোমার কী হয়েছে?"
শিশির আমতা আমতা করে বলল,
"না মানে... ওই কিছু না।"
"যাই হয়ে যাক না কেন, কাল সকালের মধ্যে এখানে যেন তোমাকে পাওয়া যায়।"
"আর্জেন্ট কিছু? "
বাবা আগের মতোই গম্ভীর গলায় বলল,
"কেন তুমি কী খুব ব্যস্ত নাকি?"
"না আসলে... "
"তাহলে এরপর যা কথা বলব সেটা সাক্ষাতে বলব। আমাকে কী আরও ফোন করতে হবে?"
"না।"
শিশির ফোন টা কেটে তুষার কে জিজ্ঞেস করলো,
"ঘটনা কী?"
"আমি জানিনা। আমাকে যা বলা হয়েছে তাই করছি।"
"মা'কে একটা ফোন করে তো দেখতে পারিস?"
"করে লাভ নেই। মা'ও কিছু বলবে না।"
শিশির একরাশ বিরক্তি নিয়ে রেডি হতে গেল। রাত বারোটা যে ঘুমাতে যাবার সময় সেটা বোধহয় বাবা ভুলে গেছেন আজকাল। শিশিরের তৈরী হতে সময় লাগছে। একটার পর একটা টিশার্ট বের করছে কিন্তু কোনোটাই মন:পুত হচ্ছে না।
"আজও তোমার এতো সময় নিয়ে রেডি হতে হবে?"
শিশির জবাব দিলো না। তুষারের বিরক্ত মাখা গলা গায়ে মাখলো না। দুই ভাই স্বভাবে ভীষণ আলাদা। তুষার বাবা,মায়ের সব কথা শোনা ভালো ছেলে, আর শিশির সব কথা এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়া অবাধ্য, দুষ্ট ছেলে।
শিশির ফ্রিজ থেকে কোল্ড ড্রিংকস এর বোতল বের করে বলল,
"এতো তাড়া দেবার তো কিছু নেই। বিয়ে করতে তো যাচ্ছি না যে ঠিক টাইমে পৌছুতে হবে। "
তুষার আর কথা বাড়ালো না। গাড়িতে উঠে বসলো। ওদের নিজেদের গাড়িটা বাবা, মা নিয়ে গেছেন। এই গাড়িটা ভাড়ার গাড়ি। বাবাই ম্যানেজ করে দিয়েছে। বাবা, মা গেছেন ওদের এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের বিয়েতে। আত্মীয় বললে ভুল হবে, ওদের চালের আড়তে কাজ করেন শফিকুল নামের এক ভদ্রলোক। শফিকুল চাচার বড় মেয়ের বিয়েতে গেছেন। ওদের দুজনের যাবার কথা থাকলেও শেষ মুহুর্তে দুজনের কেউই গেল না।
এখন এভাবে তাড়া দিয়ে নেবার ব্যাপার টা দুজনের কেউই অতোটা সিরিয়াসলি নিলো না। তাই আন্দাজও করতে পারলো না যে ওখানে ঠিক কী অঘটন ঘটতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ ছয়ঘন্টা জার্নির পর ওরা গন্তব্যে পৌঁছল। গ্রামের নাম দূর্গাপুর। দূর্গাপুর বাজারে শিশির দের গাড়িটা থামলো। বাবা এখানে এসে গাড়ি থামাতে বলেছেন। তুষার ফোন করে জানালো যে ওরা পৌঁছে গেছে। মিনিট তিনেক পর অল্প বয়সী এক ছেলে এসে বলল,
"আপনারা কী শিশির আর তুষার ভাইয়া?"
শিশির গাড়ির ভেতর বসা ছিলো। নিজের নাম শুনে ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটা বেশী বড় না। কলেজে পড়ে বোধহয়। তুষার গাড়ির বাইরেই ছিলো। ও বলল,
"হ্যাঁ। বাবা পাঠিয়েছেন?"
"জি। আসলে আমাদের বাড়িটা একটু ভেতরে তো তাই চিনতে আপনাদের অসুবিধা হবে বলে পাঠিয়েছেন।"
"আচ্ছা। "
ছেলেটা ড্রাইভারের পাশে বসলো। তুষার বলল,
"তোমার নাম টা কী? "
"আমার নাম ইমন। আমি বিন্তী আপুর ছোট ভাই। "
বিন্তী কে তুষার বা শিশির কেউই চিনেনা। শিশির যদিও ছেলেটার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে না। ওর সকল মনোযোগ এখন মোবাইলের স্ক্রিনে। গতকাল ঝুম্পা একটা রিলস আপলোড করেছে ইনস্টাগ্রামে। সেটায় রিয়েক্ট কমেন্টের বন্যা বয়ে গেছে। সেটা দেখতেই ব্যস্ত। ঝুম্পার সঙ্গে ওর তেত্রিশ নম্বর ব্রেকাপ হয়েছে পরশু দিন। এখনো ও ঝুম্পার ব্লকলিস্টে আছে। ইনস্টাতে ব্লক করতে ভুলে গেছে বেচারি।
মিনিট দশেকের মধ্যে বাড়িতে পৌছে গেল। এই বাড়ির বড় মেয়ের আজ বিয়ে। বাড়িটাকে ভালো করে সাজানো হলেও মনে হলো বাড়িটা কেমন মরা মরা। যেন খুব খারাপ কিছু ঘটে গেছে। বিয়েবাড়িতে গান, বাজনা কিছু নেই। উঠোনের এক পাশে বাবুর্চিরা রান্নার ঝামেলা সামলাচ্ছে কিন্তু তাদের মধ্যেও কোনো তাড়া নেই।
ওরা বাড়ির সামনে এসেই দেখতে পেল বাবা, মা দুজনে দাঁড়িয়ে আছেন। মায়ের মুখটা কালো হয়ে আছে। বাবার উপর যখন রেগে যান তখন এই অবস্থা হয়। তুষার এসে মা'কে জিজ্ঞেস করলো,
"কী হয়েছে মা?"
মা গম্ভীর গলায় বললেন,
"এসেছো যখন তখন শুনবে। "
শিশির বুঝতে পারলো না যে ঘটনা টা কী। বাবা এসে ও'কে বললেন,
"আগে আমার সঙ্গে চলো। "
শিশির বিনা বাক্য ব্যয়ে বাবাকে অনুসরণ করলো। বাবাকে এমনিতে ওরা দুই ভাই ভয় পায়।
নিক। "
শিশির কে যে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো সেই ঘরে তুষার আর ওর মা আছে। শিশির আর্তচিৎকার করে বলে উঠলো,
"মা এসব কী হচ্ছে?"
"যা শুনেছো তাই। আজ তোমার বিয়ে। "
"কেন মা? আমি ওই মেয়েটাকে চিনিই তো না।"
শিশিরের মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"মেয়েটার বিয়ে হবার কথা ছিলো আজ। কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটায় মেয়েটার বিয়ে ভেঙে যায়। তাই তোমার বাবা চাইছেন তুমি বিয়ে করো। "
শিশির হতভম্ব হয়ে গেল। এখানে এসে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হবে জানলে ও জীবনেও আসতো না। অবশ্য না এসেও উপায় থাকতো না। বাবা ঠিকই ধরে বেঁধে আনার ব্যবস্থা করতেন। শিশির মা'কে বোঝানোর চেষ্টা করে বলল,
"মা শোনো, এভাবে বিয়ে হয় না। যুগ পাল্টে গেছে। এখন আর সেই আগের যুগের মতো বিয়ে হয় না। বিয়ের আগে দুজন দুজন কে জানতে, চিনতে হয়। "
শিশিরের মা গম্ভীর গলায় বললেন,
"এই কথাগুলো তোমার বাবাকে বুঝিয়ে বলো। তবে একটা কথা হলো বিন্তী মেয়েটা সবদিক থেকে তোমার চেয়ে ভালো। ভালো ইউনিভার্সিটি, ভালো সাবজেক্টে পড়েছে। অন্যান্য গুন তো বাদ দিলাম। শুধু যা একটু কম সেটা হলো ওর বাবার অতো টাকা নেই, যেটা তোমার বাবার আছে বলে তুমি গোল্লায় গেছো। "
তুষার কোনো কথা বলছে না। সবকিছুতে দারুন মজা পাচ্ছে।
***
কিছুক্ষন পর শিশিরের বাবা এসে শিশির কে জিজ্ঞেস করলেন,
"তোমার কী কোনো কমিটমেন্ট আছে? কোনো প্রেমিকা আছে?"
শিশির না বলল। ঝুম্পার সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে লাভ নেই। ঝুম্পাকে বিয়ে করলে বাবা ও'কে গুলি করে মারবে প্রথমে। লাইসেন্স করা বন্দুক তার কাছে আছে। তাছাড়া , রান্নাঘরে মাছ কাটার বটিটাও কম ভয়ানক না। আগে ও'কে মেরে তারপর ঝুম্পাকে এবং সবশেষে ঝুম্পার মা, বাবাকে মারবে। তাছাড়া ঝুম্পাও বিয়েশাদির নাম শুনতে পারে না তাই ও এই ব্যপারে সিরিয়াস না।
বাবা বললেন,
"তাহলে বিন্তীকে বিয়ে করতে আপত্তি কেন?"
শিশির আমতা আমতা করে বলল,
"বাবা আসলে এভাবে বিয়ে হয় না...
"তোমার মায়ের সঙ্গেও আমার এভাবে বিয়ে হয়েছিলো। "
শিশির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মান্ধাতার আমলের সঙ্গে এখনকার যুগের তুলনা কী করে দিচ্ছেন বাবা!
"বিন্তীর মতো মেয়ে তোমার বউ হবার কথা না। কিন্তু মেয়েটার কপাল খারাপ বলে হচ্ছে। যাইহোক তোমার আপত্তি থাকলে বলো। আমি মেনে নেব। সেক্ষেত্রে তোমার হাতে একটাই অপশন থাকবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করতে হবে। কারণ ইন্টারমিডিয়েট এর ওই সার্টিফিকেট দিয়ে তোমাকে কেউ চাকরি দিবে না। "
শিশির এক সেকেন্ডেও দেরী না করে বলল,
"না না আমি ওই বিন্তীকেই বিয়ে করব। "
"গুড। "
বাবা চলে যাবার পর মা এসে বললেন,
"বিন্তীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলবি?"
"না। একবারে বাসর রাতেই কথা বলব। ঘোমটা খুলে তখন বিনী না ফিনীর থোবরা খানা দেখব। "
শিশিরের মা চোখ পাকিয়ে বললেন,
"অসভ্য! আর মেয়েটার নাম বিন্তী। "
***
শিশির খেয়েদেয়ে বিছানায় একটু গড়িয়ে নিলো। ঝুম্পাকে একবার কল দেবার চেষ্টা করলো। না ব্লকলিস্টে আছে। অন্য আর কোনো চেষ্টা করলো না। সব শুনে ঝুম্পা যদি ও'কে বিয়ে করার জন্য লাফিয়ে ওঠে! তখন আরেক বিপদ। ঝুম্পার মতো মেয়েকে বিয়ে করার চেয়ে বুড়িগঙ্গায় ঝাপিয়ে পড়ে কালো পানি খেতে খেতে মরে যাওয়া ভালো। তারচেয়ে ওই বিনীই ভালো।
এখন বাড়িটাকে বিয়ে বাড়ি মনে হচ্ছে। সাউন্ড বক্সে উচ্চশব্দে হিন্দি গান বাজছে।
তুষার হঠাৎ ছুটতে ছুটতে এসে বলল,
"ভাবীকে দেখে এলাম। ভাবী খুবই সুন্দরী,কিন্তু মনে হয় ভীষণ রাগী। "
শিশির হাই তুলতে তুলতে বলল,
"বাহ! ভালো তো। বিয়েটা তুই করে নিলেই তো পারিস। "
"যাহ! আমার বড় হবে। "
শিশিরের আড়াই বছরের ছোট তুষার। ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক সাপে নেউলে।
শিশির বলল,
"এইজ ডাজেন্ট ম্যাটার ব্রো। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া কে দেখেও শিখলি না। "
"সিরিয়াসলি মেয়েটা সুন্দর। "
"মেকাপের যুগে সবাই ই সুন্দর। "
"তোকে বলে লাভ নেই। তবে মেয়েটার কপাল টা আসলেই খারাপ। "
"হু। "
"বিয়ে ভেঙে গেছে বলে বলছি না। তোর সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে বলে বলছি। "
***
শিশিরের মা জোর করে দুজনের দেখা করার ব্যবস্থা করলেন। শিশির বিন্তীর ঘরে ঢুকে দেখলো একটা হলুদ কাপড় পরে খাটের উপর বিন্তী বসে আছে। শিশিরের ঘরে ঢোকার আওয়াজ পেয়েও তাকালো না। মাথানিচু করে থাকায় শিশির মুখ টা দেখতে পেল না ভালো করে। শুকনো কাশি দিয়ে শিশির বলল,
"হাই বিনী। কেমন আছ?"
বিন্তী চোখ তুলে তাকালো। কী সুন্দর গভীর চোখ, ঘন আখি পল্লভ। চোখের দৃষ্টি কঠিন। শিশির বিশ সেকেন্ড তাকিয়ে দেখলো।
বিন্তী বলল,
"আমার নাম বিন্তী।"
শিশির হেসে ফেলল। বলল,
"কেমন আছ বিন্তী? "
*****

Post a Comment

0 Comments