সীমানার_এপার_ওপার

সীমানার_এপার_ওপার

 “স্যার, আমি আপনাকে ভালোবাসি।

আপনার বাচ্চার মা হতে চাই।
আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?”
ফাইয়ান বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল কুয়াশায় দিকে পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ।ফ্যান ঘোরার শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কেউ নড়ছে না, কেউ কথা বলছে না। প্রায় ষাট জন স্টুডেন্টের চোখ এখন এক জায়গায় আটকে আছে।
শেষ বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার উপর।কুয়াশা ইসলাম।কলেজের সবচেয়ে চঞ্চল, দুষ্টু আর বেয়াড়া মেয়ে হিসেবে যার আলাদা পরিচিতি আছে। টিচারদের চোখে সে একটা ঝামেলা। বন্ধুদের চোখে এন্টারটেইনমেন্ট। আর ছেলেদের চোখে— ভয়ংকর সুন্দর সমস্যা।
কিন্তু এই মুহূর্তে কুয়াশার চোখে কোনো দুষ্টুমি নেই।সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মানুষটার দিকে।ফাইয়ান রহমান।
নতুন জয়েন করা ইংরেজি বিভাগের লেকচারার।এই কলেজে মাত্র তিন মাস হয়েছে তার। অথচ এর মধ্যেই পুরো কলেজে তার নাম ছড়িয়ে গেছে। কেউ তাকে সামনে পড়ে জোরে কথা বলে না। তার ক্লাসে কেউ ফোন চালায় না। এমনকি ছেলেগুলো পর্যন্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বলতে ভয় পায়।
কারণ মানুষটা ভয়ংকর রকম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন।লম্বা গড়ন। চাপা ফর্সা রঙ। সবসময় গম্ভীর মুখ। আর সেই চোখ দুটো— যেন কারও ভেতরটা পড়ে ফেলতে পারে।ফাইয়ান রহমান কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বললো না।সে শুধু তাকিয়ে রইলো কুয়াশার দিকে।এমন নীরবতা তৈরি হলো যে মেহরিন নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছে।
ফাইয়ান রহমান হাতের মার্কারটা ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের ভয়ংকর ঠান্ডা কাঠিন্য। পুরো ক্লাসরুমের বাতাস যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেছে। সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে—এখন কী হতে চলেছে!
কুয়াশা তখনও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। চারপাশের থমথমে পরিস্থিতি তাকে গ্রাস করতে চাইলেও সে নিজের মাথাটা একটুও নিচু হতে দিল না।
ফাইয়ান ধীর পায়ে তার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে এলেন।
একেবারে সামনে এসে থামলেন ফাইয়ান। খুব নিচু অথচ ধারালো গলায় বললেন,
“আপনার সাহস দেখে আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি, মিস কুয়াশা।
কুয়াশা শুকনো ঠোঁটজোড়া জিভ দিয়ে সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
“স্যার, আমি—”
“শাট আপ!”
এক শব্দের সেই তীব্র ধমকে পুরো ক্লাসরুম যেন কেঁপে উঠল। প্রথম বেঞ্চে বসা মেহরিন ভয়ে সোজা হয়ে বসল।
ফাইয়ানের কণ্ঠ এবার স্পষ্ট ক্ষোভে ফেটে পড়ল, “এটা ক্লাসরুম। কোনো সস্তা নাটক করার জায়গা না।”
কুয়াশার ফর্সা মুখটা এবার ফ্যাকাশে দেখাল। কিন্তু ফাইয়ান থামলেন না।“আপনার কী মনে হয়? একজন শিক্ষককে নিয়ে এসব ফাজলামি করা খুব মজার কিছু?”
“স্যার, আমি ফাজলামি করিনি…”
“তাহলে কী করেছ?” আপনার টিসির ব্যাবস্থা আজকে করছি,,
কুয়াশার চোখের কোণে এবার সত্যি সত্যি জল চিকচিক করে উঠল। এক ডেয়ারের চক্করে পড়ে এখন তার ক্যারিয়ারটাই না ঝুঁকিতে পড়ে যায়! সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আমি মিথ্যে বলিনি, স্যার।” (মনে মনে ভাবল, ডেয়ারের কথাটা সত্যি না বললে তো এখন আরও বড় বিপদ হবে!)
ফাইয়ান তীক্ষ্ণ ও শীতল দৃষ্টিতে চাইলেন।
“আপনার এই সত্যি কথা শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নেই।”
নিষ্ঠুর বাক্যটি শুনে পুরো ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা যেন জমে বরফ হয়ে গেল। ফাইয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। সোজা হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে পুরো ক্লাসের উদ্দেশ্যে বললেন, “সবাই বই বের করো।”
কারও মুখে কোনো রা শব্দ নেই। ক্লাসের গুমোট পরিবেশটা মুহূর্তেই যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
কুয়াশা ধীরে ধীরে নিজের জায়গায় বসে পড়ল। মেহরিন আলতো করে তার হাতটা চেপে ধরতেই শিউরে উঠল—মেয়েটার হাত বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে।
ফাইয়ান বোর্ডে লিখতে শুরু করলেন। কিন্তু প্রতি কয়েক সেকেন্ড পরপরই তার অবাধ্য চোখ দুটো চলে যাচ্ছিল শেষ বেঞ্চের দিকে।
আর কুয়াশা?
সে নিচু মাথায় শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। জীবনে প্রথমবার তার মনে হচ্ছে—বন্ধুদের সাথে ওই খেলাটা খেলে হয়তো সত্যিই বড্ড বেশি বড় ভুল করে ফেলেছে সে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে আবার ফাইয়ানের গম্ভীর গলা ভেসে এলো,
“মিস কুয়াশা, ক্লাস শেষে আমার কেবিনে এসে দেখা করবে।”
কুয়াশার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল। কেবিনে গেলে কীভাবে এই 'ট্রুথ অর ডেয়ার'-এর সত্যিটা স্যারকে বোঝাবে, সেটাই এখন তার সবচেয়ে বড় চিন্তা।
ফাইয়ান বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থেকেই যোগ করলেন, “এবং আজকের পর যেন আর কখনও এমন চাইল্ডিশ বিহেভিয়ার না দেখি।”
কুয়াশা কোনোমতে নিচু গলায় বলল, “জি স্যার…”

Post a Comment

0 Comments