বিচ্ছেদের পাঁচ বছর পর প্রাক্তনের মেহেন্দি অনুষ্ঠানে নাচ করছে গুঞ্জন। তাও যে সে গানে না "বিলেত রাজা" গানে!
আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এরকমই এক সন্ধ্যায় গুঞ্জন ডিভোর্স পেপারে সই করে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলো।
আর আজ সেই বাড়িতেই নাচ করছে তাও কিনা নিজের প্রাক্তন স্বামীর মেহেন্দি অনুষ্ঠানে! চারদিকে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে।
সবাই যে গুঞ্জনকেই কথা শুনাচ্ছে ঢের জানে গুঞ্জন। কারণ তাদের সমাজটাই এমন। দোষ কার সেটা দেখে না। সর্বদা মেয়েদেরই দোষারোপ করা হয়।
আগে মানুষের এমন কটূক্তি শুনলে কান্না পেতো। কিন্তু এই পাঁচ বছরে এগুলো শুনতে শুনতে অভ্যাস হয়ে গেছে। এসব এখন আর তেমন একটা গায়ে মাখে না গুঞ্জন।
ভাবনার মধ্যেই ভেসে এলো গানের কয়েকটা লাইন,
এসে গেছি, মন বাগানে, খেলবো নতুন খেলা
রূপের আগুন ছড়াই আমি একটু দূরে দাড়া
এই আগুনে জলে পুড়ে তবু ছুতে যায়
আলতো করে ছোঁয়া দিলে
দুনিয়া ভুলে যায়
"ও আমার বিলেত রাজা
প্রেমেরই ডালা সাজা
কাছে আয় খেলবো আজ
তোর মনেরই মাঠে প্রেমের কুদ কুদ কুদরে
কী নে*শা ঢাইলা দিলি গেলাসে মাইনাসে না পেলাসে
কোমর ঘুরায় ঝুমকা দিলে পুড়াই দেশি ফিলাসে (২)
গোলাপি চোখে জাদু, আবাশে গাল আমার,
রেডি হয়ে বসে আছি
হব রানী তোমার
আরে আয়না হ্যান্ডসাম
প্রেমের অন্ধম
আরে আয়না হ্যান্ডসাম প্রেমের অন্ধ
দেখলে বাজে মনে
তোকে নিয়ে পালাতে চাই আধার
কোন মনে"
গানটা আজকের পরিবেশের সাথে একদম মানানসই। যেনো আজকের এই দিনের জন্যই গানটা রচনা করা হয়েছে!
--- দেখছো কি অবস্থা!নিজের প্রাক্তন স্বামীর বিয়েতে এমন ভাবে নাচতে পারে কেউ?
--- আরে সবই সম্ভব কলি যুগে সবই সম্ভব!
--- আমি তো আগেই কইছিলাম যত সমস্যা এই মাইয়ার মধ্যে নাইলে কেউ এমন ভাবে নাচ করে।
--- আরে দেখলেই তো বুঝায় কি খুশি এই মেয়ে। আমি হলে বাপু এতক্ষনে কেঁদে ভাসাতাম!
এরকম নানা আজে বাজে মন্তব্য কানে শুনেও না শুনার মতো করে আছে গুঞ্জন। কি দরকার ঝামেলায় জড়ানোর। এতে করে জল আরো ঘোলা হবে।
তার থেকে এসব পাত্তা না দেওয়াই ভালো। ধূসর রঙা লেহেঙ্গা পড়েছে গুঞ্জন। সাদা স্টোনের কাজ করা লেহেঙ্গাটায়। দেখতে একদম পুতুলের মতো লাগছে।
মুখে একটুকরো হাসি নিয়ে গানের সাথে সাথে কোমর দুলাচ্ছে। গুঞ্জনের মনে এখন কি চলছে কেউ জানে না।
তবে এসব কিছু সহ্য করতে পারছে না তরঙ্গ। স্টেজের উপর পাতা বরের চেয়ারে রাজপুত্রের মতো বসে আছে সে। কাকতালীয় ভাবে তরঙ্গের পাঞ্জাবী যেটি সুঠাম দেহের শরীরের সাথে আটসাট ভাবে পড়ে আছে সেটিও ধূসর রঙের।
তরঙ্গের দৃষ্টি স্টেজে পারফর্ম করা গুঞ্জনের উপর। একটু এদিক ওদিকও নয়। তরঙ্গ নিজেও গুঞ্জনের মতো নির্লিপ্ত। তাকে দেখেও বুঝার উপায় নেই কি চলছে তার মনে!
পারফর্ম করার এক পর্যায়ে মেল ডান্সার আসে। গুঞ্জন আর মেল ডান্সারটি বিটের তালে তালে নিখুঁত অঙ্গভঙ্গি করছে।
উপস্থিত জনতা উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে। তাদের এতো সুন্দর নাচের জন্য চারদিক থেকে ভেসে আসছে করতালি।
উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে ডান্স করা যুগলকে। নাচের মাঝেও গুঞ্জন এটা নিশ্চিত রাখছে তার শরীরে মেল ডান্সারের কোনোরুপ অপ্রীতিকর স্পর্শ না লাগে।
যদিও পূর্ব থেকেই মেল ডান্সারের সাথে গুঞ্জনের কথা হয়েছিলো। সে তাকে আস্বস্তও করে। আজকের এখানে পারফর্ম করার কোনো প্রয়োজনই ছিলো না।
কিন্তু গুঞ্জন করছে। কিছু কিছু মানুষের মুখের এই যে কালো মেঘ হওয়া প্রতিক্রিয়াটি দেখার জন্যই যখন তাকে নাচের জন্য জোর করা হলো সে রাজি হয়ে গেছে।
***********************
আজকের অনুষ্ঠানে গুঞ্জন এসেছে তার ভাবির পরিচয়ে। কুঞ্জ হচ্ছে গুঞ্জনের ভাই। আর কুঞ্জের স্ত্রী তটিনী তরঙ্গের বোন।
গুঞ্জনের বিয়ের আগেই তটিনীর সাথে কুঞ্জের বিয়ে হয়। সে হিসেবে তরঙ্গ এবং গুঞ্জন বেয়াই বেয়াইন সম্পর্কে।
যা পরবর্তীতে তটিনীর জোর জবরদস্তিতে বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্কের পরিচয় ঘটে। তরঙ্গ-গুঞ্জনের ডিভোর্স এর জন্য কোথাও না কোথাও গিয়ে তটিনী নিজেকে দায়ী করে।
তবে এতো কিছুর মধ্যেও গুঞ্জন ভাবেলশহীন। সে মনে করে ভাগ্যে যা হওয়ার ছিলো তাইই হয়েছে। এটাতে আমাদের হাত নেই।
আজ দীর্ঘ পাঁচ বছর পর তরঙ্গের বিয়ে উপলক্ষে তটিনী যখন গুঞ্জনকে ইনভাইট করে তখন গুঞ্জন ইনভিটেশনটি সাদরে গ্রহণ করে।
তটিনী ভাবেনি যে গুঞ্জন রাজি হয়ে যাবে। ডিভোর্স এর পরে গুঞ্জন ওদের বাড়িতে আর থাকে না। যতই হোক সে একজন ডিভোর্সি। আর এই "ডিভোর্সি" তকমার ভার অনেক।
আলাদা বাসায় ভাড়া থাকে। বর্তমানে গুঞ্জন স্বাধীন। নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী সে সব করে। যাকে বলা হয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট উইমেন। কিসের লোভে কে জানে গুঞ্জন আজকের অনুষ্ঠানে আসার প্রস্তাব গ্রহণ করে।
************************
নাচের একটা সময় গুঞ্জন মেল ডান্সারটির খুব নিকটে চলে আসে। ঠিক তখনই ভেসে আসে একটা রাশভারি পুরুষালি আওয়াজ,
--- স্টপ দ্যা মিউজিক!
ডান্স স্টেজ থেকে সকলের দৃষ্টি গিয়ে এখন পরে তরঙ্গের উপর। যে নির্ভিক চিত্তে দাড়িয়ে আছে। সকলের উদ্দেশ্য করে আবারো বলে উঠে,
--- আমি টায়ার্ড ফিল করছি। অনুষ্ঠান এখানেই ক্লোজ করা হোক।
তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো গুঞ্জন। সেদিকে একবার তাকিয়েই গটগট পায়ে স্টেজ থেকে প্রস্থান করে তরঙ্গ।

0 Comments