পরিস্থিতি

পরিস্থিতি

 "আমারে একটা এমন জুতা কিনে দিবে মামা।"

​আমার সাত বছরের এতি'ম মেয়েটা তার মামাতো বোনের ফুল দিয়ে সাজানো জুতার দিকে তাকিয়ে কথাটি বললো তার আপন মামাকে—আমার আপন বড় ভাইকে। আমার ভাই কিছু বলার আগেই ভাবি আমার মেয়ে রিমার দিকে চো''খ গর ম করে বললো, "এই, তোর জুতা তো আছেই, আবার জুতা চাচ্ছিস কেন? তোর আম্মা শিখিয়ে দিয়েছি, তাই না রে?"
​ভাবির এমন তীক্ষ্ণ আর বি*ষাক্ত কথার সামনে সাত বছরের রিমা এক মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন সংকুচিত হয়ে গেল। ওর ছোট ছোট চোখ দুটোতে এক আকাশ একাকীত্ব আর ভ*য় নেমে এলো। পায়ের পুরনো, তলা-ক্ষয়ে-যাওয়া প্লাস্টিকের চটি জুতোটার দিকে তাকিয়ে ও আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। শুধু ওর মামার হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিয়ে হেটে আমার আঁচলের পেছনে এসে লুকালো।
​আমার কলিজাটা যেন কেউ এক হাত দিয়ে মু*চড়ে ধরলো। কিন্তু আমি মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতে পারলাম না। বুক ফে*টে কা''ন্না আসছিল, অথচ চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা পানিও বের হতে দিলাম না। স্বামীর মৃ**ত্যুর পর যখন নিঃস্ব হয়ে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলয়ে বাবার বাড়ির ভাইয়ের সংসারে এসে আশ্রয় নিয়েছি, তখন থেকেই নিজের আত্মসম্মান জিনিসটাকে একটা বাক্সে বন্দি করে রেখেছি।
​বিকেলে বড় ভাই বাজার থেকে তার নিজের মেয়ের জন্য একটা চমৎকার জমকালো জুতো কিনে এনেছে। গোলাপি রঙের সেই জুতোর ওপর প্লাস্টিকের সুন্দর সুন্দর ফুল আর চুমকি বসানো। জুতোটা পায়ে দিয়ে ও যখন সারা উঠোনে খটখট শব্দ করে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই রিমা লোভাতুর চোখে সেদিকে তাকিয়ে ছিল। বাচ্চা মানুষ, লোভ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। ও তো বোঝে না যে ওর বাবা নেই, আর ওর মায়ের কাছে একটা কাগুজে নোটও অবশিষ্ট নেই। ও শুধু চিনেছে ওর আপন মামাকে। ভেবেছিল, মামা তো বাবার মতোই হয়! কিন্তু ভাবির একটা হুং কার ওকে বুঝিয়ে দিল, এ পৃথিবীতে অবহেলা ছাড়া ওর আর কোনো অধিকার নেই।
​সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আমি রান্নাঘরের এক কোণে বসে লাকড়ির চলায় ফুঁ দিচ্ছিলাম। ধোঁয়ায় চোখ দুটো জ্বলে যাচ্ছিল, নাকি মনের ভেতরের ধোঁয়ায়—তা আমি জানি না।
​রিমা রান্নাঘরের দরজার চৌকাঠে এসে চুপচাপ বসে আছে। ও সাধারণত খুব চঞ্চল থাকে, কিন্তু আজ বিকেল থেকে ও একদম চুপ। আমি ওর দিকে তাকিয়ে জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করলাম।
"কী রে মা, খিদে পেয়েছে? এই তো চালের রুটি আর ডাল রান্না করছি, একটু পরেই দেব।"
​রিমা আমার দিকে তাকালো। ওর বড় বড় চোখ দুটোতে এখনো সেই বিষাদের ছায়া। ও ফিসফিস করে বললো, "আম্মা, আমার জুতোটার নিচে দিয়ে না কাঁ''টা ঢোকে, তাই মামাকে বলেছিলাম। আমি আর কখনো জুতো চাবো না, আম্মা।"
​মেয়ের কথা শুনে আমার হাতের লাকড়িটা ছিটকে পড়ে গেল। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ওকে টেনে এনে বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম। ঘরের কোণের ঘুটঘুটে অন্ধকারে মা আর মেয়ে দুজনে মিলে নীরবে চোখের জল ফেললাম।
​রাতের খাবারের সময় বৈষম্যের রূপটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ভাই দোকান থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসলো। ভাবি পরম যত্নে তার স্বামী আর মেয়ের পাতে বড় মাছের টুকরো আর ডিম তুলে দিচ্ছিল। আর আমার আর রিমার পাতে জুটলো দুপুরের বেঁচে যাওয়া পাতলা ডাল আর সামান্য মাছের মধ্যে দেওয়া আলু আর মাছের লেনজার কাছের কাটাআলা এক টুকরো রিমির পাতে আর আমি ডাল দিয়ে খাচ্ছি।
​ভাই খাওয়ার মাঝখানেই হুট করে রিমার দিকে তাকিয়ে বললো, "রিমা মা, বিকেলে জুতো চাচ্ছিলে না? আচ্ছা, সামনের হাটের দিন তোমাকে একটা ভালো জুতো কিনে দেব, কেমন?"
​ভাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই ভাবি ভাতের থালাটা টেবিলের ওপর জোরে শব্দ করে নামিয়ে রাখলো। তার মুখের অবয়ব মুহূর্তের মধ্যে কঠোর হয়ে গেল।
​পুরো ঘরটায় এক নিথর নীরবতা নেমে এলো। ভাই মাথা নিচু করে ভাত মাখতে লাগলো, আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না। আমি শুধু আমার থালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার মনে হচ্ছিল, এই ভাতগুলো আসলে অন্ন নয়, বি*ষ।
​রিমা আমার হাতটা চেপে ধরলো। সাত বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে এই বয়সেই কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে, কত দ্রুত মানিয়ে নিতে শিখছে! ও ভাত না খেয়েই টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো।
​আমি বুঝতে পারলাম, এই অপ**মান আর অব*হেলার ঘরে আমাদের আর বেশিদিন থাকা চলবে না। ভাইয়ের এই চেনা ছাদ ছেড়ে আমাকে নতুন কোনো পথ খুঁজতেই হবে, শুধু আমার এই ছোট্ট মেয়েটার আ*ত্মসম্মান বাঁচানোর জন্য। কিন্তু একজন একা নারী এই সমাজে কোথায় যাবে?
সকাল থেকেই মনের ভেতর একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল। কাল রাতের সেই অপ**মানের পর ঘুমটা আর ঠিকমতো হয়নি। ভোরের আলো ফুটতেই আমি আর রিমা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছিলাম। ভাবির মুখঝামটা এড়াতে সকাল সকাল ঘরের বাসী কাজকর্ম শেষ করে যখন বারান্দায় এসে বসেছি, ঠিক তখনই উঠোনে এসে দাঁড়ালেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। পরনে সাধারণ পাজামা-পাঞ্জাবি, আর হাতে বড় বড় কয়েকটা প্লাস্টিকের রঙিন ব্যাগ।
​উনাকে দেখেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। চেনা চেনা মুখাবয়ব! ভালো করে তাকাতেই চিনতে পারলাম—উনি তো রহমান ভাই। আমাদের শ্বশুরবাড়ির ঠিক পাশের বাড়ির লোক, আর আমার স্বামীর কাপড়ের ব্যবসার একমাত্র অংশীদার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। স্বামীর মৃ**ত্যুর পর শ্বশুরবাড়ির দেবরদের অন্যা*য়ের কারণে যখন আমাকে এক কাপড়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন এই রহমান ভাই-ই আমার স্বামীর পাওনা কিছুটা টাকা আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন।
​বারান্দা থেকে আমার বড় ভাই আনিস হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। রহমান ভাইকে দেখে ভাই কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, "রহমান সাহেব না? আপনি হঠাৎ এই সাতসকালে আমাদের বাড়ি?"
​রহমান ভাই উঠোনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকালেন। ওনার চোখে এক ধরণের স্বস্তি আর গভীর সমীহ। তিনি আমার ভাইকে সালাম দিয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন, আমি বড় মিয়ার (আমার শ্বশুর) পক্ষ থেকে এসেছি। উনি উনার নাতনি রিমা আর বৌমার খোঁজে আমাকে পাঠিয়েছেন।"
​ততক্ষণে ভাবিও ঘর থেকে ঘোমটা টেনে দরজার আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছেন।
​রহমান ভাই হাতের ভারী ব্যাগগুলো বারান্দার পিঁড়ির ওপর রাখলেন। তারপর ব্যাগ থেকে একে একে বের করতে লাগলেন ছোট বাচ্চাদের সুন্দর সুন্দর জামাকাপড়, হরেক রকমের ফলমূল, মিষ্টির প্যাকেট আর সবার শেষে বের করলেন একটা চমৎকার লাল রঙের জুতো—যার ওপর প্লাস্টিকের সুন্দর সুন্দর ফুল আর চুমকি বসানো! কাল বিকেলে রিমার মামাতো বোনের পায়ে ঠিক যেমন জুতো দেখে রিমা কেঁদেছিল, এটা তার চেয়েও সুন্দর।
​জুতোটা দেখেই রিমার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। ও আমার আঁচল ছেড়ে জুতোর দিকে দু-পা এগিয়ে গেল।
​রহমান ভাই রিমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমার আর আমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, বড় মিয়ার শরীরটা বেশ কিছুদিন ধরে খুব খারাপ। বিছানায় পড়ে থেকে উনি উনার ভুল বুঝতে পেরেছেন। নিজের অন্য ছেলেদের লো''ভ আর অন্যায় উনি আর সহ্য করতে পারছেন না। তাই উনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, —তার ছেলের মানে রিমার বাবার ভাগের পুরো অংশটুকুই উনি ওনার এই একমাত্র এতি'ম নাতনি রিমার নামে লিখে দেবেন। দলিলের সব খসড়া তৈরি। আমাকে পাঠিয়েছেন বৌমা আর রিমাকে সসম্মানে নিয়ে যাওয়ার জন্য।"
​রহমান ভাইয়ের মুখ থেকে "সমস্ত সম্পত্তি রিমার নামে" কথাটা শোনার সাথে সাথে যেন পুরো উঠোনের পরিবেশ টা বদলে গেল। আর হাতভর্তি উপহারের রাজকীয়তা দেখে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ভাবি এক ঝটকায় ঘোমটা সরিয়ে সামনে চলে এলেন

Post a Comment

0 Comments