নিচে নামার সময় আমার পা কাঁপছিল। লিফট ছেড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ধাপ যেন আমাকে আমার আট বছরের জমানো পাপের আদালতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গেট দিয়ে বাইরে বেরোতেই ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তাকে দেখলাম। তিনি আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন।
আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পকেটে থাকা মোটা টাকার বান্ডিলটা বের করতে গিয়েও হাত থমকে গেল। আজ আর টাকা দিয়ে এই মায়াকে কেনা যাবে না, সেটা আমি বুঝে গেছি। আমি খুব নিচু গলায় বললাম, “আপনি কী চান? কেন আমাদের পিছু ছাড়ছেন না? আমাদের শান্তিতে থাকতে দিন।”
মহিলাটি এবার আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে কোনো পাগলামি নেই, বরং এক আশ্চর্য ধীরতা। তিনি ধীর স্বরে বললেন, “শান্তি কি আর চাইলেই পাওয়া যায় বাবা? আমি কিচ্ছু চাই না। শুধু দেখতে চাইছিলাম আমার বাজান মানুষ হইতাছে কি না। আপনারা তারে রাজপুত্রের মতো রাখছেন, এইটা দেইখাই আমার কলিজা জুড়ায়া যায়। তবে মনে রাইখেন, র*ক্ত কোনোদিন বেইমানি করে না।”
কথাটা বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তার হাতের সেই পুরনো ছেঁড়া কাঁথাটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে রেখে দিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে অন্ধকার গলিটার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। আমি ডাকতে চেয়েও পারলাম না। সেই রাতে তিনি শহর ছেড়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেলেন।
আমরা অনেক খুঁজেছি, কিন্তু আর তার দেখা মেলেনি।
এরপর কেটে গেল আরও সাতটি বছর। আরিশ এখন পনেরো বছরের কিশোর। গলার স্বর বদলেছে, কাঁধ চওড়া হয়েছে। আমরা এখন অনেক বেশি নিশ্চিন্ত। সেই পাগ*লি মহিলার ছায়া এখন আর আমাদের তাড়া করে না। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো অন্য জায়গায়।
আরিশের স্বভাবের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে শুরু করলো। সে খুব একা থাকতে পছন্দ করে। আমাদের সাথে আগের মতো হাসিখুশি গল্প করে না। মাঝে মাঝে মধ্যরাতে তার ঘরের দরজার ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ শুনি। একদিন আমি আর নীলা তার ঘরে ঢুকে দেখি, আরিশ আলমারির একদম নিচে লুকিয়ে রাখা সেই আট বছর আগের মাটির ঘোড়া আর ছেঁড়া কাঁথাটা বের করে মেঝেতে বসে আছে।
নীলা চিৎকার করে উঠলো, “আরিশ! তুমি আবার এই নোংরা জিনিসগুলো বের করেছো? আমি এগুলো ফেলে দেবো!”
আরিশ মাথা তুললো। তার চোখে যে আগুন আমি দেখলাম, তা আমি গত পনেরো বছরে দেখিনি। সে খুব শান্ত গলায় বললো, “ফেলে দিয়ে দেখো মা। তাহলে তোমরাও আমাকে আর খুঁজে পাবে না।”
আমাদের বুকটা কেঁপে উঠলো। আরিশ কি তবে কিছু জানতে পেরেছে? আমরা কি কোথাও ভুল করছি?
ঠিক তার কয়েকদিন পরেই আমাদের বাসার ল্যান্ডফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধ মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল, “বাবা, আপনি কি আরিশের বাবা বলছেন? আমার সেচ্ছাসেবী বলছি ঢাকার সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় এক বুড়ি মহিলা মরণাপন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। সে সারাদিন শুধু আপনার নাম আপনার ছেলের নাম জপছে আর বলছে—বাজানরে একবার দেখাইয়া দাও।” আমরা খুব কষ্ট করে আপনার নাম্বার জোগাড় করেছি।
আমার হাতের ফোনটা মেঝেতে পড়ে গেল। নীলা ফ্যাকাশে মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আট বছর আগে যে মহিলা নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছিল, সে আজ মৃ*ত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তার শেষ অধিকারটুকু দাবি করছে।
আমি কি আরিশকে সেখানে নিয়ে যাবো? নাকি আমাদের এই তিলে তিলে গড়া মিথ্যে সংসারটাকে বাঁচাতে আবারও পালিয়ে যাবো?

0 Comments