নিষিদ্ধ ভালোবাসা শহর

নিষিদ্ধ ভালোবাসা শহর

 আয়না গালে হাত দিয়ে বসে আছে। ঠোঁট কেটে রক্ত বের হচ্ছে—তার থেকেও বেশি রক্তক্ষরণ হচ্ছে তার বুকে।

সায়ন গাড়ির স্টেরিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে, জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ করেই সায়ন আয়নার দিকে এগিয়ে এলো।
মাথার পিছনে হাত দিয়ে কিছুটা চুল আঁকড়ে ধরে একদম কাছে নিয়ে এলো।
একজন আরেকজনের নিশ্বাস অনুভব করতে পারছে।
আয়না চোখ বন্ধ করে আছে।
কনিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
সায়ন ফিসফিস করে বললো—
— “চোখ খুলো, আয়না…”
আয়না শুনলো না।
সায়ন আরও কাছে ঝুঁকল।
এবার জোরে চিৎকার করে বললো—
— “চোখ খোল, আয়না!”
আয়না তাড়াতাড়ি চোখ খুললো।
আর সাথে সাথে সামনে আবিষ্কার করলো—
এক জোড়া লাল চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আয়না মাথা নিচু করে নিলো।
সায়ন তার থুতনিতে হাত দিয়ে মাথা উপরে তুললো।
তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললো—
— “মিসেস রেজওয়ান, একটা কথা মাথায় রাখবেন।
আমার কথা, আমার উপর রেগে, আমার উপর অভিমান করে, আমার সাথে ঝগড়া করে—এই চোখ দিয়ে হাজার বার কান্না করুন। আমি সেই কান্না দেখবো।
কিন্তু অন্য কারো কথা মনে করে…
তার কথা ভেবে…
এই চোখ দিয়ে পানি বের হলে—
চোখগুলোই উপড়ে নিবো আমি।”
আয়নার বুক কেঁপে উঠলো।
সায়ন নিচু গলায় আবার বললো—
— “আমাতেই যেন আপনার সবকিছু সীমাবদ্ধ থাকে।
আজকে থাপ্পড়টা—
অন্য পুরুষের কথা মনে এনে চোখ থেকে পানি পড়ার জন্য।”
বলেই আয়নার ঠোঁটে হালকা করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
তারপর সাথে সাথে নিজের জায়গায় ফিরে এলো।
আয়না যেন এখনো ঘোরের মধ্যে আছে।
সায়ন হঠাৎ তার মাথায় টোকা দিয়ে বললো—
— “শ্বাস নিন, মিসেস রেজওয়ান।
এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই।”
আয়না জড়সড় হয়ে বসে রইলো।
তার গাল দুটো লাল হয়ে গেছে।
বিরবির করে বললো—
— “আমি কি স্বপ্ন দেখছি…”
সায়ন পরিষ্কার শুনলো।
সে হালকা হেসে জোরে বললো—
— “না, মিসেস রেজওয়ান।
সত্যি।”
আয়না আরও লজ্জায় কুঁকড়ে গেল।
সায়ন গাড়ি স্টার্ট দিলো।
আয়না গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে।
আর কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলো ভাবতে লাগলো…
কয়েক ঘণ্টা আগে…
আয়না আর ইনসিকা বিকালের দিকে ঘুরতে বের হয়েছিল।
তারা এসেছে চা বাগানে।
বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই।
ইনসিকা আয়নাকে আশেপাশে ঘুরে দেখালো।
দুজন মিলে বিভিন্নভাবে ছবি তুললো।
আয়না ছবি তুলতে ভালোবাসে বলে—
ইনসিকা তার অনেকগুলো ক্যান্ডিড ছবি তুললো।
তারপর স্থানীয়দের সাথে কিছুক্ষণ চা পাতা ঝুড়ি কাঁধে নিয়ে তাদের সাথে তাল মিলালো
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এলো।
আয়না বললো—
— “চলো, বাড়ি ফিরি।”
ইনসিকা বললো—
— “না! আগে সাতরঙা চা খেয়ে যাই!”
আয়না প্রথমে না করলো।
কারণ দেরি হবে।
কিন্তু ইনসিকার জোরাজুড়িতে রাজি হয়ে গেল।
তার নিজেরও ইচ্ছে ছিল।
তাই আর কিছু বললো না।
গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললো—
— “সাতরঙা চায়ের টংয়ের সামনে নিন।”
গাড়িতে বসে ইনসিকা তার আর আয়নার কয়েকটা ছবি ফেসবুকে আপলোড করলো।
তারপর গল্পে মেতে উঠলো।
গাড়ি এসে থামলো টংয়ের সামনে।
দুজন নেমে গিয়ে চা অর্ডার করলো।
বসে আছে।
হঠাৎ ইনসিকার ফোন এলো।
সে বললো—
— “তুমি একটু বসো ভাবি আমি আসছি।”
আয়না একা বসে চারপাশ দেখছে।
হঠাৎ—
তার পাশে কেউ বসলো।
আয়না চমকে তাকালো।
আর তাকিয়ে জমে গেল।
নিজাম মির্জা।তার প্রথম স্বামী।
যে অন্য মেয়ের জন্য এক মাসের মাথায় তাকে ফেলে চলে গিয়েছিল।
আয়নার ভেতর ঘৃণা জমে উঠলো।
নিজাম বললো—
— “কেমন আছো?”
আয়না চুপ।
নিজাম আবার বললো—
— “শুনলাম বিয়ে করেছো?”
আয়না উঠে যেতে চাইলো।
নিজাম তার হাত ধরে ফেললো।
আয়না সাথে সাথে হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো।
চোখ লাল হয়ে গেছে।
— “এই নোংরা হাত দিয়ে আমাকে ছুঁবেন না!”
নিজাম ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো—
— “নোংরা হাত?
আগে তো এই নোংরা মানুষটার পিছনে ঘুরতে।”
— “তাজুল…”
এই ডাক শুনে আয়নার বুক কেঁপে উঠলো।
চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো।
আয়না চলে যেতে চাইলো।
আবার হাত ধরলো নিজাম।
আয়না ঘুরে দাঁড়ালো—
আর ঠিক তখনই—
ঠাস!
একটা থাপ্পড়।আয়না ছিটকে পড়তে নিলে কারো হাতের টানে কারো বুকে গিয়ে পড়লো
চারপাশ নিস্তব্ধ।
আয়না মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো—
সায়ন।
রক্তচক্ষু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সায়ন আয়নার হাত নিজের হাতে নিলো।
নিজামের দিকে তাকিয়ে বললো—
— “অন্যের বউয়ের হাত ধরার আগে—
দশবার ভাববেন, মিস্টার মির্জা।
নাহলে দেখা যাবে—
হাতটা আর হাতের জায়গায় নেই।”
বলেই আয়নাকে টেনে নিয়ে গেল।
নিজাম হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
সায়ন গাড়ির কাছে এনে—
আয়নাকে ভিতরে ধাক্কা দিয়ে বসিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।তারপর ফিরে গিয়ে—
আদনান আর ফাহিমের সামনে দাঁড়ালো…
মূলত ফাহিম একটা বিজনেসের কাজে সামনের কাছে এসে ছিল। তখন এসে দেখে আদনানও ওখানেই ছিল।
ফাহিম আদনানকে বলে,
— তুই এখানে?
আদনান বলে,
— দরকারে এসে ছিলাম।
তারপর তিনজনে মিলে দরকারি কিছু কথা বলে। হঠাৎ সায়নের ফোনে কিছু নোটিফিকেশন আসে। ইনসিকা একটা ছবি পাঠিয়েছে। ওপেন করে দেখে—চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, কাঁধে ঝুঁকে আছে, ঠোঁটে হাসি, শাড়ি কোমরে গুজা।
সায়ন ছবিটা দেখে যেন কোন এক ঘোরে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ আদনান বলে,
— কিরে, কি হলো?
সায়ন আদনানের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিল।
ফাহিম আর আদনান যেন আহাম্মক বনে গেল।
ফাহিম :কিরে, কই যাচ্ছিস হঠাৎ করে?
সায়ন উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় চিল্লিয়ে বললো,
— যাওয়া হলে চল!
সায়নের বলার দেরি, দুজনেই দৌড় দিল।
তাদের গাড়ি এসে থামে সোজা টংয়ের সামনে।
বাকিটা তো জানেনই।
আদনান আর ফাহিম এতক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। তাদের মাথার উপর দিয়ে গেল—এতক্ষণ হলোটা কি!
সায়ন এসে আড়চোখে একবার ইনসিকার দিকে তাকালো।
সে একপাশে ভয়ে গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সায়ন চোখ ফিরিয়ে বললো,
— ইনসিকে বাড়ি পৌঁছে দিস।
তারপর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ির স্টার্ট দিল।
হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষা আয়না ভাবনার জগৎ থেকে বের হলো।
সে সায়নের দিকে তাকালো।

Post a Comment

0 Comments