আমার হাতের মাইক্রোফোনটা দেখে সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে আছে।
কাব্য নিচু স্বরে বলল,
— “মায়া, কী করছ তুমি?”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম,
— “সত্যি বলব।”
মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাসরিন চৌধুরীর মুখ শক্ত হয়ে গেল।
তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললেন,
— “মাইক্রোফোনটা দাও মা, আগে অনুষ্ঠানটা শেষ হোক।”
আমি মুচকি হাসলাম।
— “অবশ্যই শেষ হবে। তবে তার আগে একটা ছোট্ট গল্প শোনাব।”
অতিথিদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
আমি মাইক্রোফোনে বললাম,
— “আজ আমার বিয়ের দিন। আর বিয়ের তিন ঘণ্টা আগে কেউ আমার শাড়ির উপর নোংরা ময়লার পানি ঢেলে একটা চিরকুট রেখে গেছে।”
পুরো হলরুম গুঞ্জন করে উঠল।
আমি চিরকুটটা সবার সামনে তুলে ধরলাম।
— “এখানে লেখা আছে— ‘নিজের অবস্থানটা মনে রেখো।’ ”
নাসরিন চৌধুরীর ঠোঁট কেঁপে উঠল।
কাব্য আমার দিকে অসহায় চোখে তাকাল।
আমি বললাম,
— “আমি কারও নাম বলছি না। কারণ নাম বলার দরকার নেই। যারা করেছে, তারা নিজেরাই জানে।”
কিছু অতিথি ইতিমধ্যে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসছে।
ঠিক তখনই বিশাল স্ক্রিনের সামনে দাঁড়ানো তৃষা আমাকে ইশারা করল।
আমি মাথা নাড়লাম।
স্ক্রিনে হঠাৎ একটি ছবি ভেসে উঠল।
প্রথমে কেউ কিছু বুঝতে পারল না।
তারপর দ্বিতীয় ছবি।
তৃতীয় ছবি।
চতুর্থ ছবি।
মুহূর্তের মধ্যে হলরুমে বিস্ময়ের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
কাব্যের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল।
নাসরিন চৌধুরী এক পা পিছিয়ে গেলেন।
কারণ ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে—
চৌধুরী গ্রুপের বহু কোটি টাকার সম্পত্তি অন্য নামে গোপনে সরিয়ে ফেলার নথি।
একটি ছবিতে কাব্যের স্বাক্ষর।
আরেকটিতে নাসরিন চৌধুরীর।
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
— “ছয় মাস আগে কাব্যের ল্যাপটপে ভুল করে একটা ফাইল খুলে গিয়েছিল। তখনই প্রথম সন্দেহ হয়।”
হলরুমে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
— “তারপর আমি খোঁজ নিতে শুরু করি।”
নাসরিন হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,
— “মিথ্যে! সব মিথ্যে!”
আমি শান্তভাবে উত্তর দিলাম,
— “তাহলে এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”
সামনের সারি থেকে একজন বয়স্ক ব্যবসায়ী উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি কাব্যের বাবার দীর্ঘদিনের অংশীদার।
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
— “কাব্য... এটা কি সত্যি?”
কাব্য কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তার কপালে ঘাম জমেছে।
আমি এবার ব্যাগ থেকে আরেকটি খাম বের করলাম।
— “এগুলো শুধু সম্পত্তির কাগজ নয়। আরও কিছু আছে।”
কাব্য ফিসফিস করে বলল,
— “মায়া, প্লিজ...”
আমি তার দিকে তাকালাম।
— “আজ আমার সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলে। এখন সত্যিটা সবাই জানুক।”
খামের ভেতর থেকে একটি ডিএনএ রিপোর্ট বের করলাম।
সবার নিঃশ্বাস যেন থেমে গেল।
নাসরিন চৌধুরীর চোখ ভয়ে বড় হয়ে উঠল।
আমি মাইক্রোফোনের কাছে ঝুঁকে বললাম—
— “এই রিপোর্ট প্রমাণ করে, চৌধুরী পরিবারের সবচেয়ে বড় গোপন রহস্য আসলে সম্পত্তি নয়...”
— “কাব্য সেই মানুষটির ছেলে নয়, যাকে সবাই তার বাবা বলে জানে।”
পুরো হলরুম বিস্ফোরণের মতো প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়ল।
কেউ চিৎকার করল।
কেউ অবিশ্বাসে দাঁড়িয়ে গেল।
আর মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কাব্য যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল।
কিন্তু ঠিক তখনই হলরুমের প্রধান দরজা জোরে খুলে গেল।
সবাই ঘুরে তাকাল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন অচেনা বৃদ্ধ।
তার হাতে পুরোনো একটি ফাইল।
আর চোখ দুটো সরাসরি নাসরিন চৌধুরীর দিকে স্থির।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন—
— “আজ এত বছর পর অবশেষে তোমাকে খুঁজে পেলাম, নাসরিন...”
— “এবার আমার মেয়ের মৃত্যুর হিসাব দাও।”

0 Comments