আমার স্বামী ইমরানের মৃত্যুর আগ থেকেই আমি একটা বিষয় খেয়াল করতাম, আমার ছোটো দেবর ইরহাম আমার দিকে কীভাবে যেন তাকায়! মানে যখন থেকে ছেলেটা শৈশব থেকে কৈশোরে পা দিয়েছে তখন থেকে ওর চাল চলন বদলে গেল৷ আগে কখনো সরাসরি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতো না। এখন সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে।
এত বছরে ভুলেও কোনোদিন আমাকে স্পর্শ করা সাহস পায়নি। ছোটো ভাই হিসাবে আমি অবশ্য মাথায় হাত দিয়েছি কয়েকবার। তবে সেটা আমার বিয়ের পর পর যখন ও খুবই ছোটো ছিল। দশ বছর পার হওয়ার পর আমি নিজেই ওর থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছি। সেই ছেলে এখন হুটহাট আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করত। এমন না যে আমি ওকে সুযোগ দিতাম বা ওর সামনে তেমন ভাবে চলতাম। তবুও ও কেমন যেন ব্যবহার করত। যা আমার কাছে দৃষ্টিকটু লাগত৷ আমি ইমরানকেও এ বিষয়ে বলেছিলাম।
ইমরান আমাকে বলেছিল, ও ইরহামের সাথে কথা বলবে। আমাকে আরও সাবধানে থাকতে বলেছিল। তারপর ও ইরহামের সাথে কথাও বলেছিল। কী কথা বলেছিল তা আমি জানি না। আসলে ভাইয়েদের মাঝে কী কথা হয় তা আমি কখনোই জানতে চেয়ে ইমরানকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলিনি।
তবে তারপর অবশ্য ইরহাম শুধরে গিয়েছিল। তবে ওর চাল চলন পাল্টালো ইমরানের মৃত্যুর পর। তাও ভয়ংকর রকম পাল্টানো। ইমরানের মৃত্যুর পর ওর আচরণে মনে হতো আমি ওর বউ। মানে ভয়ংকর সব আচরণ করত। কিছু উদাহরণ দি তাহলে বুঝবেন।
ইমরান বেঁচে থাকাকালীন ও সবসময় আমাকে ভাবি আপনি বলে সম্বোধন করত। কিন্তু ইমরানের মৃত্যুর তিন মাস যেতে না যেতেই, ও আমাকে প্রায় কথায় তুমি বলতো। ভাবি বললেও তুমি বলতো। কারণে অকারণে আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করত। হুটহাট আমার রুমে ঢুকত। অনুমতি নিত না৷ দরজায় টোকা দিত না। ওর উপস্থিতি জানান না দিয়েই রুমে এসে পড়ত। রুমের দরজা লক থাকলে রাগ দেখাত।
আমার ছোটো বাবু। সে ব্রেস্ট ফিড করত। তো আমি সবসময় তেমন সাবধানে থাকতাম। কিন্তু ওর আচরণে আমি বিরক্ত এবং খুব ভীত ছিলাম।
একদিন রাত দুটোর সময় দরজায় টোকা দিল। আমি ভাবলাম শাশুড়ি। দরজা খুলে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ইরহাম দাঁড়িয়ে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
'কী চাই? এত রাতে এখানে কেন?'
ও শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল,
'ঘুম আসছে না। তুমিও তো রাতে জেগে থাকো। আসো গল্প করি।'
'এত রাতে তোমার সাথে গল্প করব কেন?'
'ভাই তো নেই। তুমি নিশ্চয়ই একাকি ফিল করছো৷ আমার সাথে সময় কাটালে তোমার একাকিত্ব দূর হবে।'
ওর কথায় আমার এত রাগ উঠল যে ওকে ঠাঁটিয়ে একটা থাপ্পড় মেরে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেই। আমি বুঝতে পারছিলাম ওর মতলব। দরজা বন্ধ করে ভয়ে আমি কাঁপছিলাম। নামাজে বসে অনেক কান্না করি সে রাতে।
এভাবেই ভয়ে ভয়ে আমার সময়গুলো কাটছিল। বাবার বাড়ি গিয়ে থাকার মতো অবস্থা ছিল না। বাবা-মা গত হয়েছেন। ভাইরা আমার আর কন্যার বোঝা যে বহন করবে না তা জানি। আসলে বাবা-মা না থাকলে বাবার বাড়ি বলতে কিছু থাকে না। ভাইয়ের বাড়ি সেটা ভাইয়েরই বাড়ি। আমি জবের চেষ্টা করতে লাগলাম। শ্বশুর শাশুড়ি অনেক ভালো, কিন্তু তারা যতদিন বেঁচে আছে ততদিন হয়তো আমাদের দেখবে। তারপর আমার আর আমার মেয়ে মরিয়মের কী হবে?
৫!!
গতকাল আমার মেঝ দেবর এমদাদের সদ্য জন্ম নেওয়া ছেলের আকিকা উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে অনেক আত্মীয় স্বজন আসল। বেশিরভাগ আত্মীয় দুপুরে খেয়ে চলে গেলেও কিছু আত্মীয় থেকে গেলেন।
রাত দুটোয় ইরহাম আমার দরজায় টোকা দিল। আমি আজ দরজা না খুলে ভিতর থেকেই জিজ্ঞেস করলাম,
'কে?'
ভারি কণ্ঠে ইরহাম বলে উঠল,
'আমি। দরজা খোলো।'
আমি ভয়ার্ত কণ্ঠে বললাম,
'কী চাই?'
'দরজা খোলো কথা আছে।'
'যা কথা বলার সকালে এসে বলো৷ এখন যাও।'
ইরহামের কী হয়েছিল জানি না। রাগে দরজায় লাথি মারা শুরু করল। আর চেঁচিয়ে বলতে লাগল,
'আলো দরজা খোলো৷ আমার মাথা গরম করবে না। দরজা খোলো।'
লোহার দরজায় আঘাত করার ফলে প্রচণ্ড শব্দে পুরো বাড়ি জেগে উঠল। মা আমার দরজার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
'ইরহাম কী হয়েছে তোর? আলোর রুমের দরজা এমন ধাক্কাচ্ছিস কেন?'
ও একঘর লোকের সামনে চেঁচিয়ে বলল,
'আমি আলো ভাবিকে বিয়ে করব। তাকে বলতেছি আমার সাথে কথা বলতে সময় কাটাতে, কিন্তু সে দরজাই খুলছে না।'

0 Comments