কালরাত্রির_স্পর্শ

কালরাত্রির_স্পর্শ

 "আমি একজন এমপি হলে এই ১৭ বছরের বাচ্চাকে বিয়ে করতে পারব না, হোক সে আমার চাচাতো বোন। আমি যদি আইন ভাঙি তাহলে আইন বাঁচাবে কে?"

আদ্রর মেঘগম্ভীর কণ্ঠস্বরে পুরো ড্রয়িংরুম যেন থমকে গেল।
সোফায় বসে থাকা নিহা চিপস চিবানো থামিয়ে আদ্রর দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন সামনে কোনো মানুষ নয়, আস্ত একটা ভিনগ্রহের প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে। তার ডাগর ডাগর চোখ দুটোয় তখন বিষাক্ত অবজ্ঞার ছোঁয়া। ১৭ বছর বয়স হতে পারে, কিন্তু তেজ তার আদ্রর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

নিহা চিপসের প্যাকেটটা সজোরে টেবিলে আছাড় দিয়ে বলল, "আইন বাঁচানোর জন্য উনার কত দরদ! শুনুন মিস্টার, আপনার এই খটখটে শুকনো কাঠের মতো চেহারা আর সারাক্ষণ করলার মতো মুখের দিকে তাকিয়ে জীবন পার করার চেয়ে আমার বুড়িগঙ্গার পানিতে ঝাঁপ দেওয়া অনেক ভালো। আপনাকে বিয়ে করার চেয়ে আমি যেকোনো একটা চোর-পকেটমারকে বিয়ে করব, অন্তত তার মধ্যে আপনার মতো অহংকার থাকবে না!"

"নিহা! মুখ সামলে কথা বলো!" আদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখের চশমাটার আড়ালে তার দৃষ্টি যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়াল। সে গম্ভীর, রাগী এবং চরম ধৈর্যশীল একজন রাজনীতিবিদ হতে পারে, কিন্তু নিহার এই চঞ্চল আর ত্যাঁদড় মার্কা কথাবার্তা তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
"কেন মুখ সামলাব? ভুল কী বলেছি?" নিহা সোফা থেকে উঠে আদ্রর ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। আদ্রর দীর্ঘ শরীরের সামনে তাকে বেশ ছোট দেখাচ্ছে, কিন্তু তার চোখ-মুখের জেদ আকাশছোঁয়া। "বাবা-চাচা জোর করছে বলে ভাববেন না আমি আপনার গলায় ঝুলে পড়ার জন্য পা বাড়িয়ে আছি। আপনার মতো গম্ভীর, রাশভারী আর খিটখিটে বুড়োকে আমি এক ফোঁটাও সহ্য করতে পারি না!"
পাশে দাঁড়িয়ে আদ্রর পিএ রাশেদ কপালে হাত দিয়ে মনে মনে বলল, 'হায়রে ম্যাডাম, কার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি সিংহের লেজ নিয়ে খেলছ যদি জানতে!' আদ্রর ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর রূপটা কেবল রাশেদই জানে, তবে এই মুহূর্তে নিহার প্রতি আদ্রর রাগটা নিখাদ ব্যক্তিগত।
আদ্র এক কদম এগিয়ে এল। তার শরীরের চাদর থেকে আসা দামী পারফিউমের কড়া সুবাস নিহার নাকে ধাক্কা দিল। আদ্র নিচু কিন্তু তীব্র ক্ষুব্ধ গলায় বলল, "বাচ্চা মেয়ে, পড়াশোনায় মন দাও। রাজনীতি আর কূটনীতি সামলানো আশিফ আহমেদ আদ্র তোমার মতো চঞ্চল, অপরিপক্ব মেয়ের পেছনে নষ্ট করার মতো সময় রাখে না। এই বাড়িতে আমার চোখের সামনে কম আসবে।"
"আমি আসব না, আপনিই এই বাড়ি থেকে চলে যান! এটা আমারও চাচার বাড়ি!" নিহা মুখ ভেংচে আদ্রর পায়ের ওপর দিয়ে প্রায় মারিয়ে হনহন করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। যাওয়ার আগে ইচ্ছাকৃতভাবেই আদ্রর সাদা ধবধবে পাঞ্জাবিতে নিজের চিপস খাওয়া হাতটা মুছে দিয়ে গেল।
আদ্র নিজের পাঞ্জাবির দাগটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাগটা ভেতরে চেপে রেখে সে চশমাটা ঠিক করল। চাচা আলী দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আদ্র, মেয়েটা চঞ্চল ঠিকই, কিন্তু মনটা খুব ভালো। তোরা দুজনে কি একটুও মানিয়ে নিতে পারিস না?"
"অসম্ভব, চাচা।" আদ্রর গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা। "যার সাথে কথা বললে প্রতি সেকেন্ডে র-ক্তচাপ বাড়ে, তার সাথে সংসার করা আর নিজের পায়ে কুড়াল মারা একই কথা।"
আদ্র দ্রুত পায়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল। গাড়ির পেছনের সিটে বসে সে যখন জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল, তখনো তার মাথায় নিহার সেই জেদি, চঞ্চল চোখের চাউনিটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। সাপে-নেউলে সম্পর্ক হলেও, মেয়েটা যে তার শান্ত জীবনে একটা তীব্র ঝড় তুলে দিয়ে গেছে, সেটা আদ্র নিজের অহংকারের কারণে স্বীকার করতে পারছে না।
পরদিন সকাল। আদ্র নিজের স্টাডি রুমে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা খবরের কাগজ পড়ছিল। পরনে বরাবরের মতোই গম্ভীর সাদা পাঞ্জাবি। বাইরে অলরেডি একঝাঁক নেতাকর্মী ভিড় করে আছে তাদের প্রিয় এমপির সাথে দেখা করার জন্য। ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকল নিহা। হাতে একটা বড় কাঁচের গ্লাস, তাতে ঘন সবুজ রঙের কী যেন একটা তরল।
নিহা ধপাস করে আদ্রর টেবিলের সামনে বসল। তার মুখে একটা কৃত্রিম, অতি-ভদ্র মিষ্টি হাসি।
"কী চাই?" আদ্র কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বরফশীতল গলায় জিজ্ঞেস করল।
"চাচাজান পাঠালেন। বললেন আমাদের মাননীয় এমপি সাহেব দেশের মানুষের কথা চিন্তা করতে করতে নিজের লিভারটাই পচিয়ে ফেলছেন। তাই একদম টাটকা, তিতকুটে নিম আর করলার জুস!" নিহা গ্লাসটা আদ্রর টেবিলের ফাইলের ওপর ঠকাস করে রাখল।
আদ্র এবার চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে নিহার দিকে তাকাল। নিহার চোখে তখন এক চরম শয়তানি বুদ্ধি চকচক করছে। আদ্র ভালো করেই জানে, এই জুসে শুধু নিম আর করলা নেই, নিশ্চিত অন্য কোনো মেলবন্ধন ঘটিয়েছে এই মেয়ে। আদ্র শান্ত গলায় বলল, "রেখে যাও। পরে খাব।"
"উঁহু! পরে খেলে গুনাগুন নষ্ট হয়ে যাবে। এখনই খান, আমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখব," নিহা দুই গালে হাত দিয়ে টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসল। তার চঞ্চল চোখের পলক পড়ছে না।
আদ্র গম্ভীর মুখে গ্লাসটা হাতে নিল। এক চুমুক মুখে দিয়েই তার পুরো শরীর রি-অ্যাক্ট করে উঠল, কিন্তু সে চরম ধৈর্যশীল রাজনীতিবিদ! মুখের একটা পেশীও নড়তে দিল না। এই জুসে নিম-করলার সাথে কাঁচা মরিচ বাটা আর লবণ মেশানো হয়েছে! আদ্র গপগপ করে পুরো গ্লাসটা এক নিঃশ্বাসে গিলে ফেলল। নিহার হাঁ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বলল, "ধন্যবাদ। তোমার বুদ্ধির মতোই তেতো আর ঝাল। এবার আসতে পারো।"
নিহা মনে মনে চটে গেল, ‘মানুষ নাকি রোবট রে বাবা! একটুও উঃ আঃ করল না!’ সে টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "রোবট একটা! আপনার ফিলিংস বলতে কিচ্ছু নেই!"
কথাটা বলেই নিহা যেই না ঘুরতে যাবে, অমনি তার ওড়নাটা আদ্রর টেবিলের একটা ভারী ফাইল-হোল্ডারের কোণায় আটকে গেল। টান লাগতেই নিহার ব্যালেন্স বিগড়ে গেল। সে সোজা গিয়ে পড়ল আদ্রর কোলের ওপর!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। টানটান উত্তেজনা।
আদ্রর শক্ত, চওড়া বুকের সাথে নিহার নরম শরীরটা লেপ্টে গেছে। আদ্রর এক হাত নিহার কোমরে, যেন তাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাল। নিহার চঞ্চল চোখ দুটো এবার ভয়ে আর এক অদ্ভুত আবেশে বড় বড় হয়ে গেল। এত কাছ থেকে সে আদ্রকে কখনো দেখেনি। আদ্রর পুরুষালি গন্ধ আর তার গায়ের তপ্ত উত্তাপ নিহাকে যেন অবশ করে দিল। আদ্রর বুকের ধুকপুকানি সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
আদ্রর চোখ দুটো তখন একদম স্থির, নিহার ঠোঁটের দিকে। নিহার মনে হলো, আদ্রর চোখের এই শান্ত চাউনির আড়ালে এমন একটা কিছু আছে যা বড্ড ভয়ঙ্কর, বড্ড নেশা ধরানো।
ঠিক পাঁচ সেকেন্ড। আদ্র ঝটকা দিয়ে নিহাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল। তার মুখভঙ্গি আবার আগের মতো গম্ভীর আর রাগী হয়ে গেছে। সে টেবিলের ওপর থেকে ফাইলটা টেনে নিয়ে রুক্ষ গলায় বলল, "লজ্জাশরম বলতে কিছু নেই? ধেড়ে মেয়ে একটা, এখনো ঠিকঠাক হাঁটতে পারো না। যাও এখান থেকে!"
নিহার কান-ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। লজ্জায় এবং অপমানে তার ফর্সা মুখটা টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। সে চেঁচিয়ে বলল, "ইচ্ছাপূর্বক পড়িনি আমি! আপনার ওই অলক্ষুণে টেবিলের কারণে পড়েছি! খবিশ একটা!"
নিহা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, ওড়নাটা টেনে নিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
সে চলে যেতেই দরজার আড়াল থেকে রাশেদ রুমে ঢুকল। আদ্রর দিকে তাকিয়ে সে ভয়ে ঢোক গিলল। আদ্র তখন টেবিলের ওপর রাখা একটা কাঁচের পেপারওয়েট এত জোরে চেপে ধরেছে যে তার হাতের রগগুলো নীল হয়ে ফুলে উঠেছে।
"ভাই... নিহা ম্যাডাম তো বাচ্চা মানুষ..." রাশেদ কাঁপাকাঁপা গলায় বলল।
আদ্র পেপারওয়েটটা টেবিলে রাখল। তার চোখ দুটোতে তখন এক অদ্ভুত হিংস্র জেদ। সে ফিসফিস করে বলল, "বাচ্চা বলেই ছেড়ে দিলাম রাশেদ। ও আমার ধৈর্য পরীক্ষা করছে। কিন্তু ও জানে না, আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে আমি কি করতে পারি।"

Post a Comment

0 Comments