আর সত্য কখনো নরমভাবে আসে না।
এই বাক্যটা মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল, যখন আমি সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে উঠছিলাম। বাড়িটা আজকে আর আগের মতো মনে হচ্ছিল না। প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি শব্দ যেন অন্যরকম ভারী হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল এই বাড়ির ভেতরে কোনো অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে, আর আমি এতদিন শুধু বাইরের মানুষ ছিলাম।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই চারপাশের নীরবতা আরও গভীর হয়ে গেল।
আমি জানালার পাশে দাঁড়ালাম।
বাইরে রাত নেমে এসেছে।
রাস্তায় গাড়ির আলো দূর থেকে এসে পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু আমার ভেতরে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, সেটা থামার কোনো নামই নিচ্ছে না।
টেবিলে রাখা কাগজগুলো আমি আবার বের করলাম।
সাদিয়া আপার দেওয়া নথি।
অপরিচিত লোকটির আনা ফাইল।
আর নাসিমা বেগমের আচরণ।
সবকিছু একসাথে মিলিয়ে আমার মাথায় একটা জট তৈরি হচ্ছিল।
যদি সত্যিই এই বাড়ি নিয়ে এত কিছু লুকানো থাকে, তাহলে আমি এই সংসারে আছি কোথায়?
আমি ফোন হাতে নিলাম।
মিস্টার ইয়াসিনের নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
একবার কল করতে গিয়েও থেমে গেলাম।
কারণ আজ দুপুরে তার চোখে যে নীরবতা দেখেছি, সেটা সাধারণ ছিল না।
কোনো মানুষ যখন সত্য লুকায়, তখন সে শব্দে নয়, নীরবতায় ধরা পড়ে।
আমি ফোনটা পাশে রেখে দিলাম।
ঠিক তখনই দরজায় ধীর কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
আমি থমকে গেলাম।
এই সময়ে কে আসবে?
আমি ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলাম।
খুলতেই দেখি মিস্টার ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছেন।
তার মুখে ক্লান্তি, চোখে অনিদ্রার ছাপ।
আমি কিছু না বলে সরে দাঁড়ালাম।
তিনি ভেতরে ঢুকলেন।
দরজা বন্ধ করলেন।
কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না।
তারপর তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন,
“আমরা কি বসতে পারি?”
আমি মাথা নাড়লাম।
আমরা দুজনেই বসলাম।
মাঝখানে টেবিল।
টেবিলে ছড়ানো কাগজ।
তার চোখ সরাসরি সেগুলোর দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকালেন।
“তুমি কতটা জেনে গেছো?”
আমি শান্তভাবে বললাম,
“যতটা না জানলেই ভালো ছিল।”
তিনি চোখ নামিয়ে নিলেন।
এই এক মুহূর্তের নীরবতাই অনেক কিছু বলে দিল।
আমি আবার বললাম,
“তুমি আমাকে বিয়ে করেছো, কিন্তু তুমি আমাকে কিছুই বলোনি।”
তিনি দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।
“সবকিছু একদিন বলার কথা ছিল।”
আমি হেসে ফেললাম, কিন্তু সেই হাসি ছিল না আনন্দের।
“একদিন কখন?”
তিনি উত্তর দিলেন না।
আমি টেবিলের কাগজের দিকে ইশারা করলাম।
“এই বাড়ির মালিকানা নিয়ে মামলা, ব্যাংকের লেনদেন, আর বাইরের লোকের হুমকি—এগুলো কি সেই ‘একদিনের’ অংশ ছিল?”
তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
“সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমি এখানে আছি কোথায়?”
তিনি বললেন,
“তুমি এখানে আছো কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“ভালোবাসা যদি সত্য লুকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালোবাসা থাকে না।”
এই কথার পর ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
ঠিক তখনই দরজা খুলে গেল।
নাসিমা বেগম ঢুকলেন।
তার মুখে সেই পুরোনো নিয়ন্ত্রণের ছাপ।
তিনি সরাসরি বললেন,
“তোমরা এখানে কী নিয়ে আলোচনা করছো?”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“সত্য নিয়ে।”
তিনি একটু থমকালেন।
তারপর বললেন,
“তোমার সত্য জানার দরকার নেই।”
আমি শান্ত গলায় বললাম,
“কেন?”
তিনি এবার কঠিন স্বরে বললেন,
“কারণ তুমি এই পরিবারের বাইরে থেকে এসেছো।”
এই বাক্যটা আমার বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি করল।
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে এগোলাম।
“আমি যদি বাইরে থেকে এসে থাকি, তাহলে আমি এখানে থাকি কীভাবে?”
তিনি উত্তর দিলেন না।
আমি আবার বললাম,
“এই বাড়ির দলিল আমার নামে আছে। এটা কি বাইরের মানুষদের অধিকার?”
এই কথায় ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল।
নাসিমা বেগমের চোখ ছোট হয়ে গেল।
মিস্টার ইয়াসিন মাথা নিচু করলেন।
আমি বুঝে গেলাম, এই তথ্যটা তিনি জানতেন, কিন্তু নাসিমা বেগম জানতেন না যে আমি জানি।
এটাই ছিল তাদের দুর্বলতা।
নাসিমা বেগম ধীরে ধীরে বললেন,
“কে তোমাকে এটা বলেছে?”
আমি শান্তভাবে বললাম,
“এটা গুরুত্বপূর্ণ না।”
তার কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল।
“তুমি জানো না তুমি কী নিয়ে খেলছো।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“আমি খেলছি না। আমি সত্য খুঁজছি।”
এই কথার পর তিনি কিছু বলতে পারলেন না।
ঠিক তখনই মিস্টার ইয়াসিন উঠে দাঁড়ালেন।
তার কণ্ঠ এবার কঠিন।
“এখন থামো তোমরা দুজন।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“আমি থামবো না।”
তিনি বললেন,
“তুমি বুঝতে পারছো না, এই বিষয়টা শুধু আমাদের না।”
আমি বললাম,
“তাহলে কার?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“বাইরের কিছু মানুষেরও।”
এই বাক্যের সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝলাম, বিষয়টা এখন আর শুধু পারিবারিক নয়।
এটা বড় কিছু।
আর সেই বড় কিছুতেই আমি এখন জড়িয়ে গেছি।
আমি টেবিলের দিকে তাকালাম।
সব কাগজ একসাথে।
সব সত্য একসাথে।
আমি খুব শান্ত গলায় বললাম,
“তাহলে এবার পুরো সত্যটা সামনে আনো।”
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
কিন্তু এবার সেই নীরবতা শান্ত ছিল না।
এটা ছিল ঝড়ের আগে শেষ মুহূর্তের নিস্তব্ধতা।
আর আমি জানতাম, পরের পর্বেই সেই ঝড় শুরু হবে।

0 Comments