"গানের তালে তালে নেচে যাচ্ছে সবাই। যাঁরা চিকন, তাদের বেশ সুবিধা হচ্ছে, কারণ অল্প জায়গাতেই তাদের হয়ে যাচ্ছে। অন্তু তার মাঝে একজন। সে দিব্যি তাল মিলিয়ে ঋষির সঙ্গে ড্যান্স করছে। তার মাঝে আরও দুইটা কাপল বাদ পড়ে যায় গান শেষ হতে হতে।
" বাদ পড়তে দেখে কেউ হেসে উঠছে, কেউ আবার নিজেদের ব্যালান্স ঠিক রাখতে ব্যস্ত।
__ এভরিওয়ান, মন খারাপ করার কিছু নেই। হার থেকে এক সময় জয় হয়।
" মাইকে চিৎকার করে হোস্ট কথাটা বলে। পর মুহূর্তেই দেখা যায় কাগজটা ভাঁজ করে আরও ছোট করা হয়েছে। অন্তু অবাক হয়ে তাকায়। এত ছোট! তার ওপর আরও তিন রাউন্ড! ভাবতেই ঢো*ক গিলে। মনে মনে ভেবে নেয়, সে হেরে গেছে।
__ অল্পতেই নিজেকে পরাজিত ঘোষণা করে দিও না। চেষ্টা করলে সব সম্ভব। জাস্ট তাল মিলাও আমার সঙ্গে, বাকিটা আমি দেখছি।
" ঋষির কথায় হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ে অন্তু। আবারও গেমে মনোযোগ দেয়। গানের তালে তালে সেই ছোট্ট কাগজের ওপর নাচতে থাকে তারা।
****
" এমন করতে করতে শেষবার এসে দেখা যায়, মাত্র একজন দাঁড়ানোর মতো জায়গা আছে। দুইজন দাঁড়ালেই কাগজের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সব কাপল বাদ পড়েছে। আছে মাত্র আরবিদ-মিরোভ আর ঋষি-অন্তু।
"আরবিদ বাঁকা হেসে ঋষিকে চো"খ টিপে মিরোভকে কো"লে তুলে নেয়। কোলে তোলার পর বুঝতে পারে, বেশ ভারী মিরোভ। তবে সেটা কাউকে বুঝতে দেয় না। ঋষি এক পলক সবাইকে দেখে নেয়। সবাই এখন তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।চোখ সরিয়ে অন্তুর দিকে ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে।
__ আমার পায়ের ওপর পা রাখো।
__ কী?
" বিস্ময় নিয়ে তাকায় অন্তু। ঋষি হঠাৎ কিছু একটা ভেবে বলে।
__ হেরে যেতে চাও ওদের কাছে? যারা জেতার যোগ্য না?
" অন্তু তী*ক্ষ্ণ চোখে তাকায় ঋষির দিকে। তার তো বিজনেস পার্টনার, এমন কথা বলছে কেন? ঘাড় ঘুরিয়ে আরবিদের দিকে তাকায়,তারপর কুটিল হেসে কিছু না বলে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঋষির পায়ের ওপর নিজের পা জো*ড়া তুলে মিশে যায় ঋষির সঙ্গে।
মনে মনে বলে—
" যে জেতার যোগ্য, তাকে সেটাই দিতে নেই।"
__ গলায় হাত দাও।
" অন্তু তাই করে। ঋষি ধীরে, একদম হালকা করে ওর পিঠে হাত রাখে। সঙ্গে সঙ্গে গান বেজে ওঠে।
দুজন দুজনের ওপর বিশ্বাস রেখে, একে অপরের ছন্দে নিজেদের মিশিয়ে নাচতে থাকে। মুহূর্তটা কেমন যেন আলাদা হয়ে ওঠে সব কিছু থেকে।
" অনেকক্ষণ নাচার পর বিপত্তি বাধে আরবিদের। সে কিছুতেই আর পারছে না। শ*রীর বেয়ে ঘাম ছুটছে। কিন্তু মিরোভ বেশ জে*দি, তার গলা ছাড়ছে না।
এক সময় আর না পেরে ধ*পাস করে দুজন একসঙ্গে ফ্লোরে পড়ে কাগজের বাইরে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে থাকা সবাই উচ্চস্বরে হেসে দেয়। অন্তু নিজেও হাসি আটকাতে পারে না। খিলখিল করে হেসে ওঠে।অন্তু বুঝতেও পারে না, দুটো মানুষ তার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। হাসতে হাসতে নিজের অজান্তেই মুখ ভেংচি দেয় মিরোভকে।
"যা দেখে পাশে থাকা ঋষি শব্দ করে হেসে ফেলে।
হাসির শব্দে অন্তু তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে ঋষি চোখ ফিরিয়ে আরবিদের দিকে তাকায়।অন্তু খুশি মনে বা*চ্চাদের মতো বলে।
__ আমরা জিতে গেছি।
__ হুম, তুমি খুশি?
__ হ্যাঁ, অনেক।
" কথাগুলো বলার সময় হাসিটা যেন ঠোঁট থেকে সরছিলই না অন্তুর। এই প্রথমবার অন্তুকে এত প্রাণ খুলে হাসতে দেখল ঋষি। ভালো লাগে মেয়েটাকে হাসলে।তবে কেন যেন মেয়েটা হাসে না। কিন্তু কেন?
___ তবিজয়ী তো আপনারা দেখেই নিলেন। তাও আমি নিজেও আর একবার বলে দিচ্ছি, আমাদের বেস্ট কাপল হচ্ছে আমাদের ঋষি স্যার অ্যান্ড মিস অন্তু। বিজয়ীদের জন্য একটা পুরস্কার ছিল। প্লিজ, আপনারা পুরস্কারটি গ্রহণ করুন।
" হোস্টের কথায় ঋষি আর অন্তু দুজনে এগিয়ে যায় গিফট নেওয়ার জন্য। চারপাশে তখন করতালির শব্দ। কেউ শিস দিচ্ছে, কেউ আবার মজা করে তাদের নাম ধরে ডাকছে। গিয়ে দেখে একটা মাত্র গিফট। দুজনে একসঙ্গে সেটার দিকে হাত বাড়ায়। অন্তু ছেড়ে দিতে গেলে ঋষি গিফটটা ওর হাতেই গুঁজে দিয়ে বলে।
__ এটা তোমার প্রাপ্য। তুমি কষ্ট করে চেষ্টা করেছ বলে আমরা জিততে পেরেছি।
__ না না, আপনি তো অনেক কষ্ট করেছেন। এটা আপনার প্রাপ্য।
__ আমার আবার কিসের কষ্ট? এত এত জিম করে সামান্য আপনাকে যদি সামলাতে না পারি, লাভ কী আর! আমার গিফট লাগবে না। আমি জিতেই খুশি। আর বেশি কথা না বলে রাখুন এটা।
" বলে জোর করেই গিফটটা অন্তুর হাতে ধরিয়ে দেয় ঋষি।অন্তু কিছুক্ষণ গিফটটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আর কিছু না বলে সেটা গ্রহণ করে। অজানা এক ভালো লাগা মনের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। দূর থেকে এইসব দেখে আরবিদ আর মিরোভ রা*গে ফুঁসছে। আরবিদের চো*য়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখেমুখে স্পষ্ট রাগে"র ছাপ।রাগে কাউকে কিছু না বলে সে গমগম করে পার্টি থেকে বেরিয়ে যায়।
" ঋষি বাঁকা চোখে সবটাই লক্ষ্য করে। ঠোঁএটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে ওঠে।
__ কনগ্র্যাচুলেশন, অন্তু জান। আমি অনেক অনেক খুশি। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এটার খুশিতে আবারও নাচব।
__ থ্যাংক ইউ, আরজু বেবি। কিন্তু তিন নম্বর এসে কোথায় চলে গিয়েছিলি?
__ আর বলিস না, ওয়াশরুম পেয়েছিল। তবে আমি জানি, যাই হোক, আমি বাপের জন্মেও পারতাম না। তুই জিতলেই আমি খুশি।
" বলেই হাত মিলাই দুজনে। হাসি-ঠাট্টার মাঝেই মাইকে ঘোষণা ভেসে আসে যে পার্টি শেষ। সবাই ধীরে ধীরে বিদায় নিতে শুরু করে। পুরোনো সহকর্মীরা একে অপরকে চিনে বলে সবাই সবাইকে লিফট দিচ্ছে, কেউ আবার একসঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছে।
" অন্তু নতুন হওয়ায় কাউকেই তেমন চেনে না। তাই কোম্পানির পক্ষ থেকে গাড়ি করে তাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদায় নেওয়ার জন্য ঋষির দিকে এগোতে যাবে, তার আগেই ঋষি নিজে বলে ওঠে।
__ সরি, আমার ড্রাইভার একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে যেতে পারবে না।
" ঋষির কথায় অন্তু চমকে যায়। চোখের পলকে উদ্বেগের ছায়া নেমে আসে। রাত তো অনেক হয়েছে। একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। তাহলে এখন কী হবে?মনের ভেতর অজানা এক দুশ্চিন্তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সে তো আবার নিজেও বাড়িতে ও থাকেনা।

0 Comments