"আপু ফুপ্পিরা এসেছে দেখে যাও। আদ্র ভাই, আরু ওরাও এসেছে"
নিজের রুমে বসে সাজছিলাম। একটু পড়েই অভ্র ভাইয়ের গাঁয়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হবে। সবাই ব্যাস্ত সাজগোজে। নিজেকে সুন্দর করে সাজাতে, পরিপাটি রূপে সবার সামনে উপস্থান করতে সবার আপ্রাণ চেষ্টা। কে কাকে সাজে হারাতে পারে সেই প্রতিযোগিতা হচ্ছে যেন। একেক জন ইচ্ছে মতো মেকআপ দিয়ে মেকআপ সুন্দরী হয়ে গেছে। কাউকে চেনার উপায় নেই। কে যে বোন, আর কে যে আন্টি বোঝার উপায় নেই। সবাই সমান তালে সেজেছে। আমার রুমে আমি, ইভা, রোশনি আর ঈশিতা আপু সাজগোজ করছিলাম। রোশনির সাজ আগে শেষ হয়ে যাওয়ায় ও বাহিরে চলে গেছে। ছোট মানুষ তার আবার সাজ কি? আমার সাজ প্রায় শেষের দিকে। গাঁয়ে লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি, দুই হাত ভর্তি ম্যাচিং চুড়ি, সাথে তাজা ফুলের গহনা, মুখে অল্প বিস্তর প্রসাধনীর ছোঁয়া ব্যাস আমি তৈরী। সাজা শেষে আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখছিলাম। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সাজ কমপ্লিট, তবুও কোথাও যেন খটকা লাগছে। পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে না। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম আরে আমি তো কাজলই পড়িনি। আমার এতো সাধের কাজল! চোখে কাজল পড়ে নিলাম ব্যাস আমার সাজ শেষ। কাজল কালো চোখে মেয়েদের সৌন্দর্য যেন কয়েক গুন বেড়ে যায়।ইভা আর ঈশিতা আপু সাজের কম্পিটিশনে নেমেছে। কে কতো বেশি সাজতে পারে? দুজন আয়নার সামনে ধাক্কা ধাক্কি করছে রীতিমতো। আমি ভাই ওদের ঝামেলায় নেই। তাই আগেই ভাগেই সেজে নিয়েছি। ঈশিতা আপুর সাজ দেখে মনে হচ্ছে আজকে বোধ হয় ওরই গাঁয়ে হলুদ। ইভা ঈশিতা আপুকে ঠেলা দিয়ে বলল,
"ঈশিতা আপু একটু সরো না, এমন ভাবে সাজছো যেন আজ ভাইয়ার না তোমার গাঁয়ে হলুদ"
"তোর ও তো না, তাহলে তু্ই এতো সাজছিস কেন?"
"কারণ আমার ভাইয়ের বিয়ে"
"ভাই কি তোর একার নাকি? আমার ও ভাই"
বলেই ভেংচি কাটলো। ঈশিতা আপুর দেখা দেখি ইভা ও ভেংচি কাটলো। দুজনের বাচ্চামো দেখে খিল খিল করে হাসছি আমি। হাসতে হাসতে দুগাল ব্যথা হয়ে এসেছে। এর মাঝে রোশনির কথা শুনে ঘুরে তাকালাম। উচ্ছাসিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
"কি বললি? সত্যিই ফুপ্পিরা এসেছে?"
"হ্যাঁ, সত্যিই বলছি। দেখে যাও"
আশেপাশে কোনো দিকে না তাকিয়ে দুহাতে শাড়ি খানিকটা উঁচু করে তুলে ছুটলাম। কতো গুলো বছর পর ফুপ্পিকে দেখবো। প্রায় আট বছরের কাছাকাছি হয়ে গেছে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ নেই। ফুফার বিজনেস সিলেটে শিফট হওয়ায় তারা পুরো পরিবার সেখানেই শিফট হয়ে যায়। তার ওপর পারিবারিক ব্যাস্ততায় ফুপ্পিরা এরপর আর আসেনি। বাড়ির সবাই ভিডিও কলে তাঁদের সাথে কথা বললেও আমার তেমন ভাবে কথা হয়নি। আমার কেন যেন ভিডিও কলে কথা বলতে লজ্জা লাগে। হাতে গোনা ২-৩ বার কথা হলেও সেটা অডিও কলে কথা হয়েছে। এই আট বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। পুরো আট বছর পর তাঁদের সাথে সামনাসামনি দেখা। এক্সাইটেড ফিল হচ্ছে। এক্সাইটমেন্ট এ হাত পা কাঁপছে। এতদিন পর তাঁদের দেখবো বলে কথা! পিচ্চি আরু নিশ্চই এতদিনে বড় হয়ে গেছে। আরু আর রোশনি ১ বছরের ছোট বড়। আরু বড়, রোশনি ছোটো। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে লাগলাম। নিচে নামতেই চোখে পড়লো সোফায় বসে আম্মুর সাথে কথা বলতে থাকা ফুপ্পির ওপর। কণ্ঠ শুনে বুঝতে একটুও দেরি হলো না যে এটা আমার ফুপ্পি ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। আমি দৌড়ে যেয়ে ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরলাম। আদুরে গলায় বললাম,
"কেমন আছো ফুপ্পি?"
ফুপ্পি আমায় ছাড়িয়ে নিলো। কপালে চুমু একে দিলো। অতঃপর বলল,
"এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তু্ই কেমন আছিস? খাবার খাস না নাকি? দিন দিন কেমন শুকিয়ে কংঙ্কাল হয়ে যাচ্ছিস"
পাশ থেকে আম্মু বলে উঠলো,
"আর বলবেন না আপা এতো বড় ধিঙি মেয়ে হয়েও খেতেই চায় না। ওর মতো মেয়েরা প্লেট ভরে খায়। আর এদিকে এতো বড় মেয়েকে এখনো গালে তুলে খাইয়ে দিতে হয় আমার"
"এই কথা? সমস্যা নেই। যতদিন আমি থাকবো ততদিন আমার মা'টাকে আমিই খাইয়ে দিবো"
ফুপ্পির কথা শুনে দাঁত কেলিয়ে হাসছি আমি। আম্মু বলল,
"আপা আদর দিয়েন না। এমনি সবার আদরে আদরে বাঁদর হয়ে বসে আছে। আপনিও আদর দিলে গাছের মগ ডালে উঠে বসবে পরে টেনেও নামাতে পারবেন না"
"আম্মু!"
পিছন থেকে কেউ বলে উঠলো,
"মেজ আম্মু তাহলে এই বাঁদর কে চিড়িয়াখানায় না দিয়ে এখনো ঘরে রেখেছো কেন? জলদি এটাকে চিড়িয়াখানায় দিয়ে এসো"
পুরুষালি কণ্ঠ শুনে চট করে পিছন ফিরে তাকালাম। কালো শার্ট, কালো প্যান্ট পিরিহিত সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। এক দেখায় তাকে চিনে উঠতে পারলাম না। এটা কে? আমার আম্মুকে মেজ আম্মু বলছে? আমি বরাবরই হিংসুটে মানুষ। আমার কাছের মানুষদের আমি ব্যাতিত কেউ আল্হাদ করে ডাকলে আমার গাঁ, পিত্তি জ্বলে ওঠে। এই যেমন আমার ভাই বোন গুলো যখন আম্মুকে আম্মু বলে ডাকে আমার হিংসে হয়। মনে হয় ওরা আমার ভালোবাসায় ভাগ বসেচ্ছে। কিন্তু এখানে আমার কিছুই করার নেই কারণ ওরা আমার বড় আগে আম্মু ওদের তারপর আমার। তাই নীরবে সহ্য করে নিতে হয়। আমার কপাল কুচকে এলো। আম্মু হতাশ কণ্ঠে বলল,
"তাই করতে হবে দেখছি"
"ফুপ্পি তুমি থাকো আমি আসছি"
আসার সময় ছেলেটাকে মুখ ভেংচি কেটে চলে এলাম। কতো বড় সাহস তার সে আমার লেগপুল করতে আসে! ইচ্ছে করছিলো চোখের চাহনিতে ভস্ম করে দেই। যুবকটা আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। যেন কখনো মেয়ে দেখেনি। চোখ ছোট ছোট করে চাইলাম তার দিকে। চোখের চাহনিতে বুঝিয়ে দিলাম,
"মিস্টার আপনাকে তো আমি পরে দেখে নিবো"
ছেলেটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আসতে নিলে আম্মু আর ফুপ্পির কিছু কথা কানে ভেসে এলো,
"রোদ দেখতে অনেকটাই মায়ের মতো হয়েছে তাই না ভাবি?"
"আর বলবেন না শুধু চেহারা না স্বভাব ও আম্মার মতো হয়েছে"
ফুপ্পির কথা শুনে মুচকি হাসলাম। কথা সত্য যে আমি দেখতে অনেকটাই আমার দাদুমনির মতো হয়েছি।
—————
আপনাদের তো এখনো আমার পরিচয়ই বলা হয়নি। আমার নাম রোদ। পুরো নাম রুদ্রিতা খানম রোদ। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। আমার বাবারা চার ভাই, এক বোন। বড় আব্বুর তিন ছেলে এক মেয়ে (অভ্র, শুভ, ইভান আর ইভা)। মেজ আব্বুর দুই ছেলে, এক মেয়ে (ইয়াদ, ইফাজ, ঈশিতা)। ফুপ্পির এক ছেলে এক মেয়ে (আদ্র, আরু)। আমার আব্বু মেজ। তার দুই ছেলে এক মেয়ে (রুদ্র, রিসাব, রুদ্রিতা)। ছোটো আব্বুর এক ছেলে এক মেয়ে (রোশন, রোশনিতা)। আমাদের যৌথ পরিবার। আমাদের ফ্যামিলি বিজনেস আছে। বড় আব্বু আর আমার আব্বু মিলে বিজনেস দেখা শোন করে। সাথে যোগ দিয়েছে অভ্র ভাই। সেজ আব্বু ডিআইজি। আর ছোটো আব্বু কর্নেল। চাকরির সূত্রে দুজনই বাড়ি বাহিরে থাকেন। সেজ আব্বুর সাথে সেজ আম্মু, ইয়াদ ভাইয়া ইফাজ ভাইয়া থাকে। ছুটিতে বাড়িতে আসে সবাই। ছোট আম্মু আর রোশনি, রোশন আমাদের সাথেই থাকে।
—————
একটু পড়েই শুরু হবে গাঁয়ে হলুদের অনুষ্ঠান। অভ্র ভাইকে এনে স্টেজে বসানো হয়েছে। প্রথমে আম্মুরা হলুদ ছুঁয়ে দিলো। অতঃপর এবার আমাদের পালা। একে একে সবাই অভ্র ভাইকে হলুদ ছুঁইয়ে দিচ্ছে। ভাইয়া নাক সিটকে বসে আছে। হলুদের গন্ধ তার সহ্য হয়না। তার ওপর কাঁচা হলুদের গন্ধ তো আরো আগে না। ভাইয়ার অবস্থা,
"ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি টাইপ"
অভ্র ভাই তো প্রথমে না'ই করে দিয়েছিলেন গাঁয়ে হলুদের অনুষ্ঠানের জন্য। কিন্তু আমাদের তো গাঁয়ে হলুদের আনন্দ করতে হবে। আমরা সবাই হলুদের জন্য শাড়িও কিনে বসে আছি। অতঃপর আর কি! ফোন লাগলাম হবু ভাবির নাম্বারে। অভ্র ভাইয়ের হবু বউয়ের নাম প্রিয়ম। ভাবিদের বাড়ি আমাদের পাশের এলাকায়। ভাইয়া আর ভাবির প্রেমের বিয়ে। দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসে। তাই অনেক আগে থেকেই প্রিয়ম আপুকে ভাবি ডেকে অভ্যস্ত আমরা। প্লাস তার সাথে আমাদের বন্ডিং ও অনেক ভালো। ভাবিকে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললাম,
"ভাবি দেখো ভাইয়া নাকি হলুদের অনুষ্ঠান করবে না। আমরা কতো প্ল্যান করেছিলাম হলুদের জন্য। কতো কিছু করবো, সুন্দর সুন্দর পিকচার তুলবো। কিন্তু ভাইয়া সেটা হতে দিচ্ছে না। এখন তুমি ভাইয়া কে একটু বোঝাও না, প্লিজ"
আমাদের কথা শুনে ভাবি গলে গেল। ভাইয়াকে কল করে শক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"তুমি নাকি গাঁয়ে হলুদের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করেছো?"
অভ্র ভাই ভয়ে ভয়ে বলল,
"হ্যাঁ"
ভাবি রণ মূর্তি রূপে সুধালো,
"কিন্তু কেন?"
অভ্র ভাই মিন মিনে স্বরে বলল,
"তুমি তো জানো আমার হলুদের গন্ধ সহ্য হয়না, তাই"
"আমি এতো কিছু জানি না হলুদের অনুষ্ঠান হবে, মানে হবে। আমি তোমার হলুদের পিকচার দেখতে চাই। আর যদি তুমি হলুদের অনুষ্ঠান না করো তাহলে বিয়ে ক্যানসেল"
অভ্র ভাই বেচারা ফেঁসে গেছে। আমরা দাঁত কেলিয়ে হাসছি। অভ্র ভাই মুখ লটকিয়ে বলল,
"ঠিক আছে তাহলে হলুদের অনুষ্ঠান হবে"
আমাদের হই হুল্লোড় দেখে কে! বিগত ১ মাস ধরে আমাদের সকল প্লানিং চলছিলো। কি কি করবো, কি ড্রেস পড়বো, কিভাবে সাজবো সব। ফাইনালি তা বাস্তবায়ন হতে চলেছে। আমাদের কাজিন মহলে এই প্রথম কারো বিয়ে। সেটা নিয়ে কতো কতো প্ল্যান আমাদের। অভ্র ভাই দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে বলে উঠলো,
"শা*লার জীবনে আর যাই করো প্রেম করে বিয়ে করো না। তাহলে সারাজীবন বউকে ভয় পেতে হবে। আর বউয়ের কথায় উঠবস করতে হবে"
সবাই একে একে অভ্র ভাইকে হলুদ দিচ্ছে। মাঝ থেকে কেউ একজন বলে উঠলো,
"বিয়ের হলুদ কারো গাঁয়ে লাগলে তার নাকি তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়"
এটা শুনে ঈশিতা আপু ফিসফিস করে আমাকে আর ইভাকে বলল,
"তোরা আমাকে হলুদ মাখা তাহলে আমার আর তিহানের বিয়েটাও তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে"
আমি আর ইভা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছি। আমাদের বুঝতে দেরি হলো না বোন আমাদের বিয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছে। শুধু পাগল না পুরোপুরি পাগল যাকে বলে। ঈশিতা আপুকে হলুদ মাখাতে মাখাতে বললাম,
"দাড়াও বড় আব্বুকে বলে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করছি। ওয়েট"
ঈশিতা আপু লজ্জায় মুড়িয়ে গেল। আমি চট করে এক দলা হলুদ নিয়ে ইভার গালে মাখিয়ে দিলাম।
"ইয়াহু তোকে হলুদ মাখিয়ে দিয়েছি এখন দেখবি তোর বিয়েও তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে"
কথাটা বলে ছুট লাগলাম। ইভা পিছু পিছু আসতে আসতে বলল,
"দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা"
ইভা ছুটলো আমার পিছু পিছু। পুরো বাগান জুড়ে ছুটোছুটি করছি আমরা। ইভা আমার পিছনে আসছে। পিছনে ঘুরে ইভাকে দেখতে নিলে খেলাম এক মস্তবড় ধাক্কা। মাথাটা বোধ হয় ফেটেই গেল। কিন্তু এখানে এতো শক্ত পোক্ত খাম্বা এলো কোথা থেকে? ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে নিলাম। মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়া শুরু করলাম। পড়লে কোমর বাবাজি নিশ্চই অক্কা পাবেন। আমার আর বিয়ে এনজয় করা লাগবে না। বিছানায় বসে ওদের ছবি দেখা ছাড়া। আশেপাশে আঁকড়ে ধরার মতো কিছু খুজলাম। আমি আঁকড়ে ধরার আগে সামনের মানুষটা আমায় নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন।
ভয়ে হটকারিতায় সামনের মানুষটার বুকের বাম কাছটায় শার্ট আঁকড়ে ধরলাম। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আশেপাশের সকল কোলাহল বন্ধ হয়ে গেছে। কানে শুধুই সামনের মানুষটার হৃদস্পন্দন এর শব্দ বাজছে। ভয়ে চোখ বুঝে আছি। ঝুঁকে কেউ কানে কানে বলল,
"না খেয়ে ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের নায়িকাদের মতো ফিগার বানালে এমনই হবে। কিন্তু নায়ক হিসেবে সব সময় আমি থাকবো না মিস, তাই সামলে চলা শিখো"
এক ঝটকায় চোখ খুলে তাকালাম। সেই সময়ের সেই ছেলেটা। ছেলেটার কথা শুনে মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল। রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকালাম তার দিকে। কিন্তু সে আমায় একটুও পাত্তা দিলো না। ছেলেটা আমায় সোজা করে দাড় করিয়ে দিয়ে ইভার উদ্দেশ্যে বলল,
"দৌড়া দৌড়ি করিস না,পড়ে হাতে পায়ে লাগবে"
ইভা হেসে বলল,
"ঠিক আছে ভাইয়া"
ছেলেটা মুচকি হেসে প্রস্থান করলো। আমি ইভার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলাম,
"ছেলেটা কে রে? নাম কি? তু্ই চিনিস? ভাইয়া বললি যে? তোর কোন জনমের ভাইয়া লাগে শুনি?"
আমার কথা শুনে ইভা এমন ভাব করলো যেন সবে আকাশ থেকে মাটিতে অবতরণ করেছে।
"তু্ই ভাইয়াকে চিনতে পারিস নি?"
"না, কে এই ছেলেটা?"
ইভা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধাক্কা দিয়ে বললাম,
"কি হলো বল?"
"যার কথা তাকেই জিজ্ঞেস করে নিস। আমি বলতে পারবো না"
ইভা ভেংচি কেটে চলে গেল। আমি ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। সবাই আজকে আমার সাথে এমন করছে কেন? একে তো উড়ে এসে জুড়ে বসা ছেলেটার আচরণ তার ওপর ইভার মস্করা কিছুই বুঝতে পারছি না!
সন্ধ্যায় শুরু হলো মেহেন্দির অনুষ্ঠান। ছেলের বাড়ি হলেও আমাদের এখানে মেহেন্দিতে জমজমাট আয়োজন করা হয়েছে। বাগানে আড্ডা দেওয়ার জন্য বিছানার মতো করা হয়েছে। আর বাগানের ঠিক মাঝ খানটায় স্টেজ। স্টেজে পারফরমেন্স হবে। গ্রূপ পারফরমেন্স, কাপল ডান্স, সিঙ্গেল ডান্স সব। সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছি। আমি, ঈশিতা, আপু, ইভা, রোশনি। আজকে আমাদের দলে আরুও এড হয়েছে। শেষ যে বার অরুকে দেখেছিলাম তখন পাঁচ কি ছয় বছর বয়সী বাচ্চা মেয়ে ছিলো। এখন কতো বড় হয়ে গেছে। আমি তো প্রথমে ওকে দেখে চিনতেই পারিনি। আমাদের আড্ডার মাঝে রুদ্র ভাই মাইক নিয়ে স্টেজে উঠলো। একটু পড়েই শুরু হবে আমাদের গ্রূপ পারফরমেন্স। স্টেজে উঠে সবাই একে একে নিজেরদের পার্টনারের বরাবর দাঁড়িয়েছে। আমি আর রুদ্র ভাইয়া, রোশনি আর ইভান ভাই, শুভ ভাই আর ঈশিতা আপু, ইয়াদ ভাইয়া আর ইভা। রিসাব ভাইয়া আর ইফাজ ভাই কিছু কাজে বাহিরে গেছে। আর এমনিও এগুলো কোনো কাজের না! ওরা এক কোণে বসে থাকার মানুষ। আমার সাথে রুদ্র ভাইয়ার জুটি হওয়ার কথা ছিলো। সামনে সকালের সেই ছেলেটাকে দেখে কপাল কুঁচকে এলো। এ এখানে কেন? আমার হাড়ে বজ্জাত ভাইটাই বা কোথায়? নজর ঘুরিয়ে দেখলাম রুদ্র ভাইয়া আর আরু জুটি বেঁধেছে। এখন এই মিস্টার বজ্জাতের সাথে আমায় জুটি বাঁধতে হবে? শা*লার পোড়া কপাল আমার!
মিউজিক শুরু হলে মিউজিকের তালে তালে আমরাও স্টেপ করতে শুরু করলাম। অবাক করা কাণ্ড মিস্টার বজ্জাত ও সব গুলো স্টেপ আমাদের মতো করেই করছে। উনি কিভাবে আমদের স্টেপস জানলো? বক্সে গান চলছে "ইয়েহ লাড়কা হায় আল্লাহ"। নাচ শেষ হলে আমি তীক্ষ্ণ চোখে মিস্টার বজ্জাতের দিকে তাকিয়ে স্টেজ থেকে নেমে এলাম।
আমি বসে বসে মেহেদী পড়ছি। স্টেজে ইভা আর ঈশিতা আপু দুজন পারফর্ম করছে। দুটোই একদম নাচুনি বুড়ি। শুধু একটু ঢোলের বাড়ি দেওয়ার অপেক্ষা এই আরকি! আমার মেহেদী পড়া প্রায় শেষের দিকে। অনেক ক্ষণ বসে থাকায় কোমর ধরে এসেছে। একটু হাটাহাটি করলে ঠিক হবে। উঠে হাটাহাটি করছি। সামনের ছোট চুল গুলো বেরিয়ে এসেছে। ফুঁ দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছি কিন্তু হারামি গুলো সরলে তো! উল্টো মনে হচ্ছে আমার চুল আমার সাথেই বেইমানি করছে। হাতে মেহেদী থাকায় চুল গুলো সরাতেও পারছি না। ফুঁ দিয়ে যাচ্ছি অনবরত। এমন সময় কানে অস্পষ্ট স্বরে ভেসে এলো,
"স্নিগ্ধফুল"

0 Comments