"আমার আর ভালো লাগছে না চৈতী। দম বন্ধ লাগছে এই সম্পর্কটাতে। এখন মনে হচ্ছে বিয়ে করেই ভুল করেছি।" হতাশ কন্ঠে বলল রিতা
" কি বলিস? নিজেই তো ওই বুইড়াটাকে নাচতে নাচতে বিয়ে করলি। ও নাকি তোর ট্রু লাভ। " হাসতে হাসতে বলল চৈতী
"সত্যি বলতে বিয়ের আগে তাই ই মনে হতো। জহির সব সময় আমাকে সব বিপদ থেকে প্রোটেক্ট করতো। আমাকে আগলে রাখতো। আমার ছোট খাটো বিষয় খেয়াল রাখতো। ধর কখনো কাজের মাঝে যদি আমার বিরক্তি লাগলো, সাথে সাথে সে আমার মন ভালো করতে আমার পছন্দের বার্গার অর্ডার দিত। সব সময় আমাকে স্পেশাল ফিল করাতো। ও যখন আমার পাশে থাকতো আমার নিজেকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হতো। ও আমার পছন্দ অপছন্দ সব কিছুর প্রতি দৃষ্টি রাখতো। আমি বলেছিলাম আমার সমুদ্র পছন্দ। সে আমার জন্মদিনে আমাকে সেন্ট মার্টিন নিয়ে যায়। সৈকতে স্পেশাল ডেটের আয়োজন করে। চারপাশে কি সুন্দর লাইটিং করা ছিল। এরকম হাজার হাজার বার সে আমাকে স্পেশাল ফিল করিয়েছে। একদম বাচ্চাদের মতো কেয়ার করতো। তার চলাচল, তার গোছানো কথাবার্তা সব কিছুই আমাকে মুগ্ধ করতো। আমি তার প্রতি ভয়ংকর ভাবে আসক্ত হয়ে পরেছিলাম।
বিয়ের পর কয়েকমাস সব ঠিক থাকলেও ধীরে ধীরে সব এলোমেলো হতে লাগলো। আমি আবিষ্কার করলাম যেই গোছানো মানুষকে আমি ভালোবেসেছিলাম ওটা মোটেও জহিরের আসল রূপ ছিল না।
তুই জানিস চৈতী, টয়লেট করে ও ফ্লাশ করতে ভুলে যায়। পরে আমি গেলে দেখি পুরা কোমডে ময়লা। আর গন্ধ তো আছেই। মাঝে মাঝে সে মনের ভুলে আমার ব্রাশ দিয়ে ব্রাশ করে। তাই এখন আমি নিজের ব্রাশ লুকিয়ে রাখি। গোসল করে ভেজা গামছা বিছানায় ফেলে রাখে। ঘর অগোছালো করে রাখে। বিছানায় বসে টিভি দেখতে দেখতে খায়, আর পুরো ঘর নোংরা করে রাখে। দিনে নাহয় বুয়া এসে কাজ করে দেয়। রাতে আমাকেই করতে হয়। তার উপর আবার দুই দিন পর পর তার শরীর খারাপ হচ্ছে। সারাদিন নাক দিয়ে ফ্যাস ফ্যাস করে সর্দি পরে আর জ্বরে কোকায়। ঘেন্নায় আমার গা গুলায়। কয়েকমাস আগে তো আবার ডায়রিয়া হলো। ভাইরে ভাই সেই কি গন্ধ ঘরে। ওর দেখতে এখন সত্তর বছরের বুড়া মনে হয়। আমি শারীরিক ভাবেও স্যাটিসফাইড না। আর ঘোরাঘুরি? সেটা আমার জন্য স্বপ্ন। অফিসেও ওর ডিমোশন হয়েছে। মে বি চাকরিটাও থাকবে না। পরের মাস থেকে একটি বুয়াও আসবে না। কারণ টাকার সংকট।
বিয়ের পর আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম জহির তো আছেই। কিন্তু এখন দেখি আমি নিজের মেকাপের জিনিসপত্রও ঠিকভাবে কিনতে পারছি না। বিয়ের আগে জহির আমাকে কেয়ার করতো, আর এখন আশা করে যে আমি ওর দাসী হয়ে থাকব, ওর সেবা যত্ন করব, ওর জন্য তিন বেলা খাবার বানাবো।
পারবো না এসব করতে চৈতী। আমার দ্বারা এসব সম্ভব না।" মন খারাপ করে বলল রিতা
"বিয়ের এই কয়েক মাসেই এই অবস্থা, তাহলে ভাব জহিরের প্রথম স্ত্রী বারো বছর কিভাবে সংসার করলো। কত সেক্রিফাইস করেছিল সে নিজের সংসারের জন্য। আর তুই তার হাতে গড়া সেই সংসারটাই কেড়ে নিল। এমনকি তার হাতে সাজানো বাসাটাও নিয়ে নিলি। আর এখন বলছিস জহিরকে ভালো লাগে না?" তাচ্ছিল্য স্বরে বলল চৈতী।
সুমনার কথা উঠতেই তেতে উঠলো রিতা। হিসহিসিয়ে বলল," খবরদার ওই মহিলার সাথে আমার তুলনা করতে আসবি না। ওর নিজের স্বামী আটকানোর মূরদ ছিল না বলেই ওর স্বামী আমার পেছনে আসছে। এমন কি আমি যদি জহিরকে লাথিও মারি, তবু ও এসে আমার পা চাটবে। কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাবে না। এটা আমার যোগ্যতা। আর ওই সুমনার ব্যর্থতা। এখানে আমার কোনো দোষ নেই।" বলেই উঠে চলে গেল রিতা
রিতার চলে যাওয়া দেখলো চৈতী। বিরবিরিয়ে বলল," আমি দোয়া করি রিতা তোর এই অহংকার ভাঙ্গুক। একটা মেয়ের সাজানো সংসার ভাঙার শাস্তি তুই যেন পাস, দুটো বাচ্চা থেকে তাদের বাবা কেড়ে নেয়ার শাস্তি যেন তুই পাস। মন থেকে দোয়া করি আমি।"
____________
"আমার স্ত্রী রুপন্তির সাথে আমার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। ওর বয়স কম ছিল। সবে ১৭... কিন্তু পড়াশুনার প্রতি ছিল তার প্রবল আকর্ষণ। আমিও ওকে সেই সুযোগ দিলাম। এরই মধ্যে আমাদের মেয়ে প্রিয়া পৃথিবীতে আসলো। প্রিয়ার ভালো ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি অস্ট্রেলিয়া চলে আসলাম। সময় যেতে লাগলো।
একদিন হুট করেই বাংলাদেশ থেকে খবর এল আমার মেয়ে নিখোঁজ। আমি আর দেরি না করে দেশে ফিরে গেলাম। সাত দিন পর আমার মেয়ের খন্ডিত দেহ পাওয়া গেল। সেদিন আমি পাগলের মতো কেদেছিলাম। তারপর নিজেকে ঘিরবন্দি করে ফেললাম। এভাবে পুরো একটা মাস কেটে গেল। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার স্ত্রী একদম স্বাভাবিক। তার মাঝে কোনো কষ্ট নেই। উলটো সে আমাকে বোঝাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাওয়ার জন্য। আমার সন্দেহ লাগলো। আমি গোপনে পুলিশকে এ বিষয়ে জানালাম। তারপর তদন্ত করে পাওয়া গেল আমার স্ত্রীর পরকীয়া বিষয়ে আমার মেয়ে জেনে গিয়েছিল। মেয়ে আমাকে সব জানাতে চেয়েছিল বলে আমার স্ত্রী আর তার প্রেমিক নির্মম ভাবে আমার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলে। পেপারেও উঠেছিল এই ঘটনা। রুপন্তিকে জেলে নেওয়ার পরেও আমার রাগ কমে নি। তাই আমার ওই পুলিশ বন্ধুর সহায়তায় জেলে ঢুকি। এরপর নিজের হাতে ওর মুখে বি*ষ ঢেলে দিই। পরবর্তীতে টাকা দিয়ে মিথ্যে রিপোর্ট বানানো হয় যে রুপন্তি হার্ট অ্যাটাক করেছে।
এখন আপনিই বলুন সুমনা, আমি কি ভুল করেছি?" সুমনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো মিনহাজ
সুমনা মিনহাজের দিকে তাকিয়ে, হালকা হেসে উত্তর দিল," মোটেও না। এর চেয়েও করুন মৃ*ত্যু হলে আমার আত্মাটা শান্তি পেত। যেই মা নিজের স্বার্থে, নিজের গর্ভজাত সন্তানকে এতো হিংস্রভাবে মে*রে ফেলতে পারে, সেই মা কোনো ক্ষমা ডিজার্ভ করে না মিনহাজ।"

0 Comments