"আজ রাতে কি না গেলেই নয়?",একদিন আর চুপ থাকতে পারলাম না। বলেই ফেললাম, সুনয়না, নতুন করে আবার সংসার করো না কেন?" 
২৮ বছরের অবিবাহিত জীবনে এমন একাকিত্ব আর এমন উষ্ণতার স্বাদ আমি আগে কখনো পাইনি...
বদলির চিঠি ভেবেছিলাম অভিশাপ...
অথচ এই গ্রামই বুঝিয়ে দিলো, নিঃসঙ্গতা আসলে কী, আর এক চিলতে উষ্ণতা কতটা দামী! 
সুনয়না বৌদির চোখ ছলছল করে উঠলো, আঁচলটা শক্ত করে কোমরে গুঁজতে গুঁজতে।
"তাহলে আমার এই খাঁ খাঁ বাংলোতে কে সঙ্গ দেবে বলুন? রাতের অন্ধকারে কথা বলারও তো কেউ নেই।" 
সে রাতে বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি, আর ভেতরে দুটো নিঃশ্বাস... সুনয়না আস্তে মাথা নেড়ে বলল, "পাশের ঘরটা খুলে দেবেন?" 
পোস্টমাস্টারের চাকরি। নাম শুনলেই সবাই ভাবে দারুণ কিছু। অথচ বদলির কাগজ হাতে পেয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো।
একেবারে ম্যাপের বাইরে একটা গ্রাম।
চারপাশে শুধু সবুজের সমুদ্র, দিঘির জলে আকাশের কাজল, সন্ধ্যা নামলেই ঝিঁঝির কনসার্ট।
জায়গাটা স্বর্গ, তবুও হাটবাজার দুই ক্রোশ দূরে।
শহরের ছেলে আমি, চা বানাতে গেলে চিনি নেই, ভাত বসালে দেখি নুন শেষ। 
অফিসের হরিপদ কাকাকে ডেকে বললাম, "কাকা, পেটে কিছু না পড়লে তো এখানেই কবরে যাবো।"
কাকা মুচকি হেসে বলল, "স্যার ভয় নেই। সুনয়না বৌদি আছে। অল্প বয়সে বিধবা, ৩০ ছুঁই ছুঁই। দুটো ছোট মেয়ে। হাতের কাজ লক্ষ্মী। আপনার ঘর-রান্না সেই সামলাবে।" 
প্রথম দিন সুনয়না এলো। ধবধবে সাদা তাঁতের শাড়ি, কপালে নেই সিঁদুরের দাগ, তবুও চোখে অদ্ভুত মায়া।
কথা কম, কাজে বেশি। এসেই উঠোন নিকিয়ে, ঘর মুছে, রান্না চাপালো।
আমি লেজার খাতায় মুখ গুঁজে আছি, আর চোরা চোখে দেখছি। সে যখন কাজের তাড়নায় আঁচল কোমরে বাঁধে, ঠোঁটের কোণে এক ফালি লাজুক হাসি খেলে যায়। সেই হাসিতে যেন ভোরের প্রথম আলো।
আমার ২৭ বছরের রক্তে তখন বসন্তের হাওয়া। এই নির্জন গাঁয়ে এসে নতুন করে যৌবন টের পেলাম। 
দিন কাটে। সুনয়না আসে, চুপচাপ সব গুছিয়ে চলে যায়। তার হাতের রান্না যেন অমৃত। কই মাছের ঝোল, পুঁইশাক, মুসুর ডাল। 
আমি তৃপ্তি করে খাই, আর সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তালপাতার পাখায় হাওয়া করে।
একদিন আর চুপ থাকতে পারলাম না। বলেই ফেললাম, "বৌদি, আপনার এই টলটলে যৌবন। নতুন করে ঘর বাঁধেন না কেন?" 
সুনয়না চমকে তাকালো। চোখ ভিজে এলো। ফিসফিস করে বলল, "দাদাবাবু, গ্রামের মানুষের নিয়ম বড় শক্ত। একবার শাঁখা ভাঙলে আর জোড়া লাগে না।"
আমি হাসলাম, "তবে এই একা বাংলোতে আমার মন কে বুঝবে? দেয়ালগুলোও তো কথা বলে না।"
সে মাথা নিচু করে পাখা চালায়। বুঝি, বুকের ভেতর তার কষ্টের নদী বয়ে যায়। 
এমনি এক তেতে পোড়া দুপুর। খেতে বসেছি। সুনয়না যথারীতি দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ বললাম, "বৌদি, রোজ রোজ দাঁড়িয়ে থাকেন কেন? আজ আমার সাথে বসে দুটো খান।"
সে আঁতকে উঠলো, "না না দাদাবাবু, আপনি মালিক, আমি..."
ধমকে বললাম, "আমি বলছি বসুন। এই গ্রামে আমি ছাড়া আপনার আর কে আছে?"
অনেক সংকোচে দূরে পিঁড়ি পাতলো। আমি নিজের পাত থেকে ভাত মেখে তার মুখে তুলে দিলাম। সে কেঁপে উঠলো। 
লজ্জায় গাল লাল। ফিসফিস করে বললাম, "খেয়ে নিন। এটা আদেশ।"
সে চোখ বুজে খেলো।
তারপর কাঁপা হাতে আমাকেও এক গ্রাস খাইয়ে দিলো। বিশ্বাস করুন, ওই এক গ্রাসে মায়ের স্নেহ, বোনের আদর, প্রিয়ার স্পর্শ— সব পেয়েছিলাম। 
খাওয়া শেষ হতেই বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ। 
বৌদি উঠে দাঁড়ালো, "দাদাবাবু, এবার যাই। মেয়ে দুটো ঘরে একা।"
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে বললাম, "এই ঝড়ে কোথায় যাবেন? আজ রাতটা এখানেই থেকে যান। পাশের ঘরটা তো খালিই পড়ে আছে।"
সুনয়না অনেকক্ষণ চুপ। বৃষ্টির শব্দের সাথে তার নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে। তারপর ধীরে মাথা নাড়লো। রয়ে গেলো।
সন্ধ্যা নামলো। হারিকেনের আলোয় ঘরটা স্বপ্নপুরী। সুনয়না এসে বললো, "দাদাবাবু, মশারিটা খাটিয়ে দিই?"
বললাম, "বসুন তো একটু। আচ্ছা বৌদি, একটা কথা বলুন। মেয়েদের মন কীসে গলে? আমার তো কোনো জানাশোনা নেই।"
সুনয়না এবার হেসে ফেললো। প্রাণ খোলা হাসি। সেই হাসিতে আমার সব শূন্যতা ভরে গেলো। 
সে বললো, "দাদাবাবু, মেয়েমানুষের মন খুব সহজ। যত্ন, সম্মান আর চোখের ভাষা বুঝলেই হয়। শরীরের আগে মন ছুঁতে জানতে হয়। এটাই আসল মন্ত্র।"
তার কথাগুলো বুকে এসে লাগলো। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে দুটো অসহায় মানুষ। নিয়ম, সমাজ সব তখন দরজার বাইরে। 
সে রাতে মাঝখানে ছিল শুধু একটা কাঠের দরজা। বন্ধ ছিল, কিন্তু মনের দরজাটা কখন যে খুলে গেছে, আমরা টেরই পাইনি। 
ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙলো। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা চা, মুড়ি। পাশে একটা ছোট চিরকুট, "দাদাবাবু, আপনার খেয়াল রাখাটা এখন আমার অভ্যেস। সাবধানে থাকবেন।" 
সেই ভোর থেকে বদলিটা আর শাস্তি লাগে না। এই গ্রাম, এই নির্জন বাংলো, সুনয়নার হাতের চা— সব মিলিয়ে মনে হয় ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। 
সমাজের চোখে আমরা হয়তো ভুল, কিন্তু নিঃসঙ্গ দুটো হৃদয় যখন একে অপরের উষ্ণতা খুঁজে পায়, তখন নিয়মের দেয়ালও ভেঙে পড়ে। 

ভালোবাসা তো ক্যালেন্ডার দেখে আসে না, সে আসে নীরব দুপুরে এক লোকমা ভাতের আদরে, ঝড়ের রাতে একটা খোলা দরজার ওপার থেকে

0 Comments