মেয়ের_জন্য_মায়ের_যুদ্ধ

 

মেয়ের_জন্য_মায়ের_যুদ্ধ

“মা, আমাকে নিয়ে যাও... আমার স্বামীর পরিবার আমাকে আঘাত করেছে।”

মেয়ের কাঁপা কণ্ঠে বলা এই কথাগুলো শোনার পর একজন সেনাবাহিনীর কর্নেল আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি।
তিনি দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান নিজের মেয়েকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু দেশের অন্যতম প্রভাবশালী একটি পরিবার যখন তাকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, তখন তারা বুঝতে পারেনি তারা এমন এক মায়ের সঙ্গে লড়াই শুরু করেছে, যিনি কখনও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি এখনও আমার সামরিক ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় ঘাঁটি থেকে বের হয়েছিলাম।
আমার কালো ড্রেস জ্যাকেটটি নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা ছিল।
বুকভর্তি পদক ও সম্মাননার ব্যাজগুলো অস্তগামী সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল। আমি দ্রুত গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলাম।
আমার ইউনিফর্মের ওপর সোনালি নামফলকে লেখা ছিল
কর্নেল নাসরিন আক্তার হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সময় আমার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছিল আমার মেয়েকে খুঁজে বের করতে হবে। একজন নার্স এসে আমার পথ আটকে দাঁড়ালেন।
“ম্যাডাম, আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না” আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম, “আমার মেয়ে কোথায়? পরীকে কোন কক্ষে রাখা হয়েছে?” তিনি আমার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর আর কিছু না বলে সরে দাঁড়ালেন।
করিডরের শেষ প্রান্তে একটি ছোট পর্যবেক্ষণ কক্ষে আমি পরীকে দেখতে পেলাম।
সে একটি পাতলা হাসপাতালের কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। তার মুখে যন্ত্রণার স্পষ্ট ছাপ।
দুই হাতে ছিল জোরপূর্বক ধরে রাখার দাগ।
তার সাদা পোশাকটি ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় ময়লা লেগে ছিল। আমার আদরের মেয়ে।
সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে আমি দায়িত্ব পালনের জন্য দূরে থাকলে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফোন করে সূর্যাস্তের রঙ কেমন ছিল তা বলত। সেই মেয়েটি, যে আমার জন্য রঙিন ছবি এঁকে ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখত।
আজ সে মাথা তুলতেও কষ্ট পাচ্ছে।
“মা...” সে দুর্বল কণ্ঠে ডাকল। আমি দ্রুত তার কাছে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। তার পুরো শরীর কাঁপছিল।
একটি আতঙ্কিত শিশুর মতো।
ঠিক তখনই আমার পেছন থেকে হাসির শব্দ ভেসে এল।
“ও সব সময়ই একটু বাড়াবাড়ি করে।”
আমি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালাম।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল পরীর স্বামী মিস্টার ইয়াসিন, তার মা রেহানা চৌধুরী, এবং ইয়াসিনের বড় ভাই মাহিন চৌধুরী। তাদের পরনে ছিল দামি পোশাক।
হাতে বিলাসবহুল ঘড়ি। মুখে আত্মতুষ্টির হাসি।
আর চোখে স্পষ্ট অহংকার।
রেহানা চৌধুরীর ঠোঁটে ছিল এক শীতল হাসি।
তিনি শান্ত গলায় বললেন, “কর্নেল নাসরিন, আপনার মেয়ের একটু মানসিক সমস্যা হয়েছে।
সে নিজেই পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। কেউ তাকে আঘাত করেনি।” পরী কষ্ট করে আমার হাত শক্ত করে ধরল।
“না, মা। তারা আমাকে বাড়ির আলাদা একটি ঘরে আটকে রেখেছিল। আমার ফোন নিয়ে নিয়েছিল।
আমি যদি ইয়াসিনকে ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে তারা আমার সম্মান নষ্ট করে দেবে বলে হুমকি দিয়েছিল।”
ইয়াসিন বিরক্ত মুখে চোখ ঘুরিয়ে বলল, “ও বাড়িয়ে বলছে। ও সব সময়ই অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ।”
মাহিন হালকা হেসে বলল, “কিছু মেয়ে বড় পরিবারের নিয়মকানুন মেনে চলার জন্য প্রস্তুত থাকে না।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
শুধু আমার মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। রেহানা চৌধুরী কয়েক কদম এগিয়ে এলেন।
“দেখুন, বিষয়টাকে অযথা বড় করার দরকার নেই,” তিনি বললেন। “আমাদের পরিবারের অনেক প্রভাবশালী পরিচিতি আছে। আদালত, সংবাদমাধ্যম সব জায়গায় আমাদের কথা শোনা হয়।” এরপর তিনি নিচু স্বরে বললেন,
“আপনার সামরিক পদমর্যাদা দিয়ে আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না।”
মাহিন ঠোঁট বাঁকিয়ে যোগ করল, “আপনার মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। বরং কৃতজ্ঞ থাকুন যে আমরা এই মিথ্যা অভিযোগের জন্য আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি না।”
আমি তাদের প্রত্যেকের দিকে একবার করে তাকালাম।
প্রথমে ইয়াসিনের দিকে। তারপর মাহিনের দিকে।
সবশেষে রেহানা চৌধুরীর দিকে। আমার মুখে কোনো রাগ ছিল না। কোনো চিৎকার ছিল না। শুধু এক অদ্ভুত শান্তভাব।নএতটাই শান্ত যে তারা ভুল বুঝে বসল।
তারা ভেবেছিল আমার নীরবতা মানে ভয়। কিন্তু তারা জানত না সেটাই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

Post a Comment

0 Comments