ধীরে ধীরে তিনি তালায় চাবি ঢুকালেন।
চাবি ঘুরল।
দরজা খুলতে শুরু করল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি এমন কিছু দেখতে পেলেন, যা দেখে তার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল।
ঘরটির মাঝখানে একটি বড় টেবিল।
টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো ল্যাপটপ।
পাশে কয়েকটি মোটা ডায়েরি।
আর দেয়ালের পুরো অংশজুড়ে টাঙানো অসংখ্য ছবি।
শারমিন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল।
তানহাও পেছন পেছন ঘরে প্রবেশ করল।
ঘরটিতে কোনো বিলাসিতা ছিল না।
কিন্তু প্রতিটি জিনিস এমনভাবে সাজানো ছিল, যেন এগুলো কারও জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
দেয়ালের প্রথম সারিতে ছিল শারমিনের ছবি।
বিভিন্ন বয়সের।
কখনো তরুণী।
কখনো সন্তানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে।
কখনো রান্নাঘরে ব্যস্ত।
কখনো পরিবারের সঙ্গে হাসছেন।
ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে শারমিনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
অনেক ছবি তিনি নিজেও আগে দেখেননি।
মনে হচ্ছিল ইয়াসিন বহু বছর ধরে গোপনে স্মৃতি জমিয়ে রেখেছেন।
এরপর ছিল সন্তানদের ছবি।
মাহিনের স্কুল জীবনের ছবি।
নাদিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন।
ছোট ছেলে আরমানের বিয়ের ছবি।
এমনকি সাত নাতি-নাতনিরও আলাদা আলাদা ছবি।
শারমিনের গলা শুকিয়ে গেল।
যে মানুষটিকে সবাই স্বার্থপর ভেবেছিল, সে কি সত্যিই এই পাঁচ বছর একা বসে তাদের ছবিগুলো দেখেই কাটিয়েছে?
তার চোখের কোণে জল জমল।
টেবিলের ওপর একটি খাম রাখা ছিল।
উপরে লেখা—
"প্রথমে ভিডিওটি দেখো। তারপর ডায়েরি পড়বে।"
শারমিন ধীরে ধীরে ল্যাপটপটি খুললেন।
চার্জ দেওয়া ছিল।
স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
ডেস্কটপে একটি মাত্র ভিডিও ফাইল।
নাম—
"শারমিনের জন্য।"
তার হাত কাঁপছিল।
তবুও তিনি ভিডিওটি চালু করলেন।
কয়েক সেকেন্ড অন্ধকার থাকার পর স্ক্রিনে ইয়াসিনের মুখ ভেসে উঠল।
তাকে অনেক দুর্বল লাগছিল।
চেহারা শুকিয়ে গেছে।
চোখের নিচে কালি।
কিন্তু মুখে সেই পরিচিত হাসি।
ভিডিও শুরু হতেই ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মনে হচ্ছিল তিনি শব্দ খুঁজছেন।
অবশেষে ধীরে বললেন,
"যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে বুঝব আমি আর পৃথিবীতে নেই।"
শারমিনের বুক কেঁপে উঠল।
ভিডিওর মানুষটি যেন বহু বছরের দূরত্ব পেরিয়ে তার সামনে ফিরে এসেছে।
"আমি জানি তুমি আমার ওপর রাগ করে আছো। হয়তো এই ভিডিও বন্ধ করে দিতেও ইচ্ছে করছে। কিন্তু যদি পারো, শেষ পর্যন্ত শোনো।"
ইয়াসিন কিছুক্ষণ থামলেন।
তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি। কিছু ভুল আমি জেনেশুনে করেছি। কিছু ভুল করেছি ভয়ে। আর কিছু ভুল করেছি ভালোবাসার কারণে।"
শারমিনের চোখ বেয়ে জল নামতে শুরু করল।
ভিডিওতে ইয়াসিন আবার বললেন,
"সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তোমাকে সত্য না বলা।"
"আমি ভাবতাম আমি সব সামলে নিতে পারব। সব সমস্যা একা একা সমাধান করতে পারব।"
"কিন্তু মানুষ যতই শক্ত হোক, একা সবকিছু বহন করা যায় না।"
ভিডিওতে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
"ডাক্তার যখন বললেন আমার ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ছে, তখন আমি প্রথমবার মৃত্যুকে সামনে থেকে দেখেছিলাম।"
"আমি ভয় পেয়েছিলাম।"
"ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম।"
শারমিন ফুঁপিয়ে উঠলেন।
পঞ্চাশ বছরের সংসারে এই প্রথম তিনি স্বীকারোক্তির মতো করে ইয়াসিনের দুর্বলতা শুনছেন।
"আমি জানতাম তুমি আমার পাশে থাকবে। সন্তানরাও থাকবে। কিন্তু আমি চাইনি তোমাদের শেষ স্মৃতি হোক হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকা একজন অসহায় মানুষ।"
"আমি চেয়েছিলাম তোমরা আমাকে শক্ত মানুষ হিসেবেই মনে রাখো।"
শারমিন মাথা নাড়লেন।
"বোকা মানুষ..."
তার ঠোঁট কাঁপছিল।
"কী ভীষণ বোকা মানুষ ছিলে তুমি..."
ভিডিওতে ইয়াসিন মৃদু হেসে বললেন,
"আমি জানি তুমি এখন আমাকে বকছো।"
শারমিন বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেলেন।
যেন মানুষটা এখনো তাকে চেনে।
এখনো বুঝতে পারে।
ভিডিও চলতে থাকল।
"তুমি জানো, এই বাড়িটা কেন কিনেছিলাম?"
"কারণ এখানে বসে আমি তোমাদের মিস করতে পারতাম।"
"অদ্ভুত শোনাচ্ছে, তাই না?"
"কিন্তু সত্যি।"
"আমি প্রতিদিন তোমাদের ছবি দেখতাম।"
"প্রতিদিন নাতি-নাতনিদের নতুন ছবি সংগ্রহ করতাম।"
"প্রতিদিন তোমাদের খবর রাখতাম।"
"আর প্রতিদিন নিজের সিদ্ধান্তকে অভিশাপ দিতাম।"
শারমিন চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
তার বুকের ভেতরে জমে থাকা বরফ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে।
কিন্তু ক্ষত এখনো রয়ে গেছে।
ভিডিওর শেষ দিকে ইয়াসিন বললেন,
"আজ আমি তোমাকে এমন কিছু জানাব, যা আর কেউ জানে না।"
শারমিন ও তানহা একসঙ্গে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
"আমার ক্যানসার ধরা পড়ার ছয় মাস পর ডাক্তাররা নতুন পরীক্ষা করেন।"
"তখন তারা জানতে পারেন, আমার রোগটি ধীরে ছড়াচ্ছে।"
"আমার হাতে প্রথমে যতটা সময় ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ছিল।"
শারমিন অবাক হয়ে গেলেন।
ভিডিওতে ইয়াসিন তিক্তভাবে হাসলেন।
"কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।"
"আমি ইতিমধ্যে তোমাদের জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলেছি।"
"আমি ভেবেছিলাম ফিরে আসব।"
"অনেকবার ভেবেছি।"
"অসংখ্যবার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।"
"কিন্তু প্রতিবারই ভয় পেয়েছি।"
"তোমাদের চোখে ঘৃণা দেখার ভয়।"
"সন্তানদের প্রত্যাখ্যানের ভয়।"
"তোমার কান্নার ভয়।"
ভিডিওর মানুষটি তখন আর আগের মতো দৃঢ় ছিল না।
সে ছিল একজন অনুতপ্ত বৃদ্ধ।
যে নিজের সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
ভিডিও শেষ হওয়ার আগে ইয়াসিন বললেন,
"ডায়েরিগুলো পড়ো।"
"সেখানে পাঁচ বছরের প্রতিটি দিনের কথা লেখা আছে।"
"আর শেষ ডায়েরির ভেতরে রয়েছে আমার প্রকৃত শেষ উপহার।"
স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।
ঘর নিস্তব্ধ।
শুধু শারমিনের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
তানহা চুপচাপ পাশে বসে ছিল।
কিছুক্ষণ পর শারমিন প্রথম ডায়েরিটি খুললেন।
প্রথম পাতায় তারিখ।
পাঁচ বছর আগের।
যেদিন ইয়াসিন বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
প্রথম লাইন পড়তেই তার চোখ আবার ভিজে উঠল।
"আজ আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করলাম।"
শারমিন কাঁপা হাতে পাতা উল্টাতে লাগলেন।
প্রতিটি পাতায় তাদের কথা।
সন্তানদের কথা।
নাতি-নাতনিদের কথা।
প্রতিটি উৎসবের কথা।
প্রতিটি জন্মদিনের কথা।
যেদিন শারমিন অসুস্থ হয়েছিলেন, সেটাও লেখা।
যেদিন মাহিন চাকরি বদলেছিল, সেটাও লেখা।
যেদিন নাদিয়ার মেয়ে প্রথম স্কুলে গিয়েছিল, সেটাও লেখা।
মনে হচ্ছিল মানুষটা দূরে থেকেও তাদের জীবন থেকে একদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন ছিল না।
ডায়েরি পড়তে পড়তে হঠাৎ একটি পাতায় এসে শারমিন থেমে গেলেন।
সেখানে বড় অক্ষরে লেখা—
"আজ ডাক্তার আমাকে একটি নতুন খবর দিয়েছে।"
তার নিচে কয়েকটি লাইন।
সেই লাইনগুলো পড়ে শারমিনের শরীর কেঁপে উঠল।
কারণ সেখানে এমন একটি সত্য লেখা ছিল, যা পুরো ঘটনাকে নতুন অর্থ দিতে পারে।
আর সেই সত্য জানার পর তিনি বুঝতে পারলেন, ইয়াসিনের রেখে যাওয়া শেষ উপহার শুধু টাকা নয়।
এর চেয়েও অনেক বড় কিছু।

0 Comments