আইদান রুমে এসে দেখে নূর ফোন মুখের সামনে নিয়েই ঘুমিয়ে গেছে। আইদান হাসে ফোন তুলতে গিয়ে তার বুকটা ধ্বক করে উঠে। ফোনের ওইপাশে দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে আছে রুপকথা। বাতাসের তালে এলোমেলো ভাবে উড়ে চলেছে রুপকথার ছোট চুল গুলো৷ আইদানের চোখের সামনে ভেসে উঠলো স্কুল ড্রেস পরিহিত ঘুমন্ত ষড়োশীর মায়াবী মুখ৷ নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কিছু অযাচিত বাক্য যা আইদান কোনদিন ও কাউকে জানায়নি এমনকি নিজের মনকেও মানতে দেয়নি,
"তুমি ষড়োশী তুমি সর্বনাশী,তুমি পাথর বুকেও ফুল ফুটিয়ে লিখেছিলে সর্বনাশ। তোমার বাচ্চামো তোমার পাগলামো যা থেকে বাচতে পারেনি এক অসহায় পাথর যুবক। সে তুমি আজ সুদর্শনা,মায়াবী কিন্তু তবুও সে ষড়োশী কণ্যাটিকেই আমি,,,,"
বাকিটা বলার আগেই টনক নড়ে আইদানের, কি বলতে গিয়ে নিজের অজান্তেই পুরাতন ভুলটা করতে যাচ্ছিল ভেবেই রাগ উঠে গেল তার৷ নিজের উপর রাগ করে ফোনটা ছুড়ে মারতে গিয়েও ফোনের অপরপাশে আর বিছানায় শোয়া দুই কণ্যার জন্যে আর নিজের রাগকে পাত্তা দিলো না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷ নিজের জীবনের ফেলে আসা কিছু অতীত যেন দিন দিন মাথা চাড়া দিচ্ছে। আইদান না পেরে রেয়ানকে কল দেয়,
"আরে বাল ঘুমাতেও দিবি না শালা গার্লফ্রেন্ড ও এতটা কল দেয় না মনে হয় যতটা তুই চিপকে থাকিস।"
"এক থাপ্পড় তোর ঘুম আর গার্লফ্রেন্ড দুইটার বের করে দিবো ইডিয়েট"!
আইদানের ঝাড়ি খেয়ে লাফিয়ে উঠে বসে রেয়ান। হাসার চেষ্টা করে বলে উঠে,
" আরে জানু রাগ করো কেনো পাপ্পি লাগবে আসো জানু দেয়?"
"রেয়ান তোকে কিন্তু আমি খুন করবো?"
"উফফ বেবি তোমার ভালোবাসায় তো আমি অনেক আগেই খুন হয়ে গেছি।"
আইদান বুঝে এইভাবে হবে না। তাই সোজা কথাতে আসে,
"রুপকথার টার্মিনেশান লেটার রেডি করতে বল। এজ সুন এস পসিবেল তাকে টার্মিনেট করে দে। আর বিদেশে আমাদের যে ব্রাঞ্চ আছে সেখানে গিয়ে সব ব্যবস্থা করবি তুই পরশুদিনের মাঝে। আমি বিদেশে সিফট হবো। এই কোম্পানি সম্পূর্ণ তোর দ্বায়িত্বে থাকবে।"
রেয়ান হতভম্ব হয়ে যায়।
"আর এইসব কিছু শুধু মাত্র রুপকথার থেকে দূরে থাকার জন্যে? সত্যি করে বল তো আইদান কি এমন যা আমাদের চোখের সামনে থেকেও তুই লুকিয়ে গিয়েছিস কারন অতীতের অনেক জট এখনো খুলেনি। যে ছেলে এরিকার সামান্য ছোয়াও সহ্য করতে পারতো না জাস্ট ফ্রেন্ড বাদে কোনদিন অন্যে নজরে তাকয়ে অবধি দেখেনি সে ছেলে হুট করে তাকে প্রপোজ করে দিলো কিন্তু কেনো এই একটা প্রশ্নের উত্তর কবে দিবি আইদান।"
আইদান বিরক্ত নিয়ে বলে উঠে,
"যে প্রশ্নের কোন উত্তর নেই সে প্রশ্নের উত্তর দিবো কিভাবে আমি?"
"প্রশ্নের উত্তর থাকে আইদান, উত্তর থেকেই প্রশ্ন তৈরি হয়। কথাটা কিন্তু তুই বলেছিলি। "
"আমি বললেই তা সত্যি আর অনিবার্য হবে তা কোথায় লিখা আছে?"
"তুই টপিক চেঞ্জ করছিস।"
"বুঝতেই যখন পারছিস তখন ঘুমা। এই এক টপিকে মাথা খাস না। যে কাজ দিলাম দ্রুত করে ফেল। আমি তিনদিনের মাথায় সব আপডেট চাই। গট ইট!"
রেয়ান গাল ফুলিয়ে বলে উঠে,
"পারব না।"
আইদান বাকা হেসে বলে উঠে,
"আন্টিকে তাহলে বলছি তুই রাজি মেয়ের পরিবার নিয়ে যেন হাজির হয় তোর বাড়িতে।"
"আই উইল কিল ইউ!"
"লেটস সি বেবি।"
কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল আইদান৷ আর রাগে গজরাতে গজরাতে আইদানের গুষ্টি উদ্ধার করতে লেগে গেল রেয়ান।
----
দিন গড়িয়ে গেল, চলে এলো কাঙ্ক্ষিত দিনটি এনগেজমেন্ট এর ভ্যানুওতে যাওয়ার। কিন্তু আইদান চিন্তিত প্রতিবার মেয়েকে সাথে নিয়েই যায় কিন্তু এইবার সাথে রেয়ান যাবে না। তাকে বিদেশে যেতে হবে। বাকি স্টাফদের ও কাজ আছে তাহলে মেয়েকে রেখে যাবে কার ভরসায় আর নিয়ে যাবেই বা কি করে। অনেকক্ষন ভেবে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই করলো সে। মেয়েটা তার এমনিতেও বাবা পাগল কোলে নিয়ে থাকাটা অসুবিধা হবে না। আর সেখানে আরও বাচ্চারা থাকবে নাহলে একদিনের জন্য কোন ডে কেয়ারে রেখে আসবে। বিকালের দিকে নিয়ে আসবে৷ সব চিন্তা ভাবনা করে মেয়েকে তৈরি করে নিজেও রেডি হয়ে নিল আইদান।
"পাপা আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
আইদান চুলে জেল লাগাতে লাগাতে বললো,
"আমরা সিলেটে যাচ্ছি মা।"
"চিলেট এ কি আছে পাপা?"
মেয়ের কথায় হাসলো আইদান, মেয়ের ভুল ধরিয়ে বলে উঠল,
"চিলেট না আম্মা ওইটা সিলেট।"
"আরে ওহি ওহি(ওইটাই ওইটাই) এবার তো বলো কি আছে ওইখানে?"
আইদান মেয়ের নাক টেনে বলে উঠল,
"টিভি আজকাল বেশি দেখছেন আম্মাজান? সিলেট হলো প্রাকৃতির দেশ খুব সুন্দর। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ পাহাড়, চা বাগান অনেক কিছু আছে আম্মা।"
"পাহাড় আছে আমি পাহাড়ে উঠবো?"
আইদানের মুখটা চুপসে গেল, সে ত কাজে যাচ্ছে ঘুরতে ত যেতে পারবে না। কিন্তু মেয়ের এই উদাস মুখটাও ত দেখতে পারছে না আইদান। তাই কিছু না বলে মিষ্টি হেসে মাথা নাড়ালো শুধু।
"চলেন সুগার পাফস আমরা এখন যায়।"
নূর তার পাপার গলা জড়িয়ে ধরলো, আইদান হেসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সুটকেস হাতে বেরিয়ে গেল।
-----
ছোট রিজভী মায়ের উপর রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। কোন ভাবেই মাকে ছাড়া একদিন সে থাকতে পারবে না। রুপকথা নিজেও ছেলেকে রেখে যেতে চাইছে না। কিন্তু সেখানে কিভাবে নিয়ে যাবে ছেলেকে। সে কাজে ব্যস্ত থাকলে ছেলেকে কে দেখবে। তার বাচার শেষ অবলম্বন তার এই সন্তান। কম ত কষ্ট করেনি।
"আমিও তোর সাথে যাবো বনু। তোদের এত বড় কোম্পানির নিশ্চয় একটা আউটসাইডারের জন্যে কোন ক্ষতি হবে না। রাতে না হলে আমরা কোন হোটেলে থাকবো সমস্যা ত নেই তাই না?"
নিজের ছোট ভাইয়ের কথায় রুপকথা ভাবলো পরক্ষনে রাজি হয়ে গেল। কারন ছেলেকে ছাড়া একটা সম্পূর্ণ দিন থাকা সম্ভব। ছেলে ছাড়া তার ত ঘুম ও আসবে না।
"আমি একটু রেয়ান স্যারকে কল দিয়ে নেয়, আগে থেকে বলে রাখা ভালো আর রেয়ান স্যার অনেক ভালো নিশ্চয় দ্বিমত করবে না।"
মারুফ রাজি হলো ভাগ্নেকে তৈরি করতে নিয়ে চলে গেল। রুপকথাও রেয়ানের সাথে কথা বলে পারমিশান নিয়ে নিল। রুপকথা ফোন রেখে কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইলো। তার কেমন যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে মনে হচ্ছে কিছু একটা হতে চলেছে। সেটা খারাপ না ভালো তা বুঝতে পারছে না কিন্তু তার মনটা কেমন যেন আনচান করছে এইজন্যেই আরও ছেলেকে সাথে নিয়ে যাওয়া। এলাকায় ইতিমধ্যে কানাঘুষা চলেছে মিরজাকে নাকি রাতের বেলা এই এলাকায় প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটাই চিন্তিত রুপকথা,কোনভাবেই সে ওই মানুষটার ছায়া তার ছেলের উপরে পড়তে দিতে চাই না।
রুপকথা আয়নাই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তাচ্ছিল্য হাসলো,
"তোর কি কপাল রে রুপ, প্রথম আবেগের বসে যাকে ভালোবাসলি সে তোর সামনেই অন্যকারো হাত ধরে নিল। আর যার সাথে বিয়ে হলো সে কি না রাতের পর রাত তোর পাশে শুয়েই অন্যকাউকে ভালোবেসে গেল। আচ্ছা এই সম্পূর্ণ পৃথিবীতে কি এমন কেউ নেয় যে আমাকে আমার মতোই ভালোবাসবে?"
রুপকথা চাপা নিশ্বাস ছেড়ে নিজেও তৈরি হয়ে নিল৷ ভাগ্য যা আছে তাই মেনে নিবে সে৷ সবাই বেরিয়ে গেল আলাদা আলাদা ভাবে উদ্দেশ্য আর গন্তব্যে একটাই। এই নতুন জায়গায় কি আলাদা কিছু ঘটতে চলেছে তাদের জীবনে কি ভিন্ন মোড় নিবে?

0 Comments