অভিমান

অভিমান

"আমার না আজ ফিরতে বেশ রাত হবে পায়েল। ওই যে সুদীপদা, আমাদের অফিসের সিনিয়র, ওনার মেয়ের আজ এক বছরের জন্মদিন। ওখানেই যাবো, সব বন্ধুরা একসাথে থাকবো,, তাই ফিরতে ক 'টা বাজবে ঠিক নেই।"

অফিস যাওয়ার আগে সুমিত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে কথাটা বলল। পায়েল তখন খাটের ওপর সুমিতের অফিসের ব্যাগটা গুছিয়ে রাখছিল। সুমিতের কথা শুনে ও হাতটা থামাল। একটু ইতস্তত করে বলল, "সুদীপদা তো সেদিন বাড়ি এসে আমাদের দুজনকেই যেতে বলেছিলেন। আমি তাহলে তৈরি হয়ে থাকব?"
সুমিত চিরুনিটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে পায়েলের দিকে ঘুরল। ওর চোখেমুখে একটা অস্বস্তি। পায়েলকে ওপর-নিচ এক ঝলক দেখে নিয়ে একটু নিচু গলায় বলল, "আরে, তুমি ওখানে গিয়ে কী করবে বলো তো? অফিসের সব বড় বড় সাহেবরা আসবে। ওনাদের ঘরের মেয়েরা সব কীরকম মডার্ন, সারাক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলে। তুমি তো ওসব বোঝো না, গিয়ে এককোণে চুপচাপ বসে থাকবে। তার চেয়ে বরং তুমি বাড়িতেই থাকো। মা-বাবারও শরীরটা ইদানীং ভালো যাচ্ছে না, কখন কি হবে বলা যায়না, তার চেয়ে তুমি বাড়িতেই থাকো।"
পায়েলের হাত থেকে সুমিতের ওয়াটার বোতলটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ও কোনোমতে সেটাকে ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে দিল।
এই প্রথম নয়, গত তিন বছরে এরকম বহুবার হয়েছে। সুমিতের বন্ধুদের আড্ডা হোক বা অফিসের কোনো অনুষ্ঠান—সব জায়গাতেই সুমিত ওকে এভাবে বাড়িতে রেখে যায়। প্রথম প্রথম পায়েল ভাবত, সত্যিই হয়তো সুমিত ওর সুবিধার কথাই ভাবছে। কিন্তু আস্তে আস্তে ও আসল সত্যিটা বুঝে গেছে। ও ইংরেজি বলতে পারে না, নামী দামি ব্র্যান্ডের পোশাক পরে কায়দা করতে পারে না, তাই সুমিত ওকে সবার সামনে নিয়ে যেতে লজ্জা পায়। সুমিতের চোখে ও বড্ড 'ব্যাকডেটেড' আর 'আনস্মার্ট'।
পায়েল আর কোনো তর্ক করল না। শুধু খাটের ওপর থেকে ব্যাগটা তুলে সুমিতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "তোমার ব্যাগ।"
সুমিত ব্যাগটা নিয়ে একবার পায়েলের মুখের দিকে তাকাল। পায়েলের মুখটা একদম শান্ত, সেখানে কোনো রাগ বা অভিমানের চিহ্ন নেই। সুমিত একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, "তাহলে আমি বেরোচ্ছি। সাবধানে থেকো।"
রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ সুমিত যখন বাড়ি ফিরল, সারা বাড়ি নিঝুম। কলিং বেলের আওয়াজে পায়েল এসে দরজা খুলে দিল। সুমিত ঘরে ঢুকে জুতোটা খুলতে খুলতে বেশ চনমনে গলায় বলল, "উফ, পার্টিটা যা দারুণ হলো না! সুদীপদার ওয়াইফ কী সুন্দর করে সবার সাথে কথা বলছিল জানো? কী স্মার্ট! তোমাকে যে নিয়ে যাইনি, ভালোই করেছি। তুমি থাকলে এই রাত অবধি ওখানকার হইচই সহ্য করতে পারতে না, বোর হতে।"
পায়েল দরজাটা লক করে সুমিতের পেছনে পেছনে ঘরে এলো।তারপর ধীর গলায় বলল, "দরজা টা বন্ধ করে, লাইট টা নিভিয়ে দিও।" আমি শুলাম।"
সুমিত একটু অবাক হলো। অন্য সময় ও কোনো পার্টি থেকে বাড়ি ফিরলে পায়েল হাজারটা প্রশ্ন করে—কী খেলে, কেমন মজা হলো, কে কী পরল। আজ ও একদম চুপচাপ বিছানায় গিয়ে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল। সুমিত ভাবল, হয়তো পায়েলের ঘুম পাচ্ছে, তাই আর মাথা ঘামাল না।
কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই সুমিত একটা অদ্ভুত তফাত খেয়াল করল।
রোজ সুমিত ঘুম থেকে ওঠার আগেই পায়েল ওর চা, খবরের কাগজ আর ধোয়া জামাকাপড় রেডি করে রাখে। আজ সুমিত ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখল টেবিলের ওপর চা ঢাকা দেওয়া আছে ঠিকই, কিন্তু খবরের কাগজটা এখনো বাইরেই পড়ে। আর পায়েল রান্নাঘরে মায়ের জন্য ওটসের খিচুড়ি বানাচ্ছে।
সুমিত রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। "পায়েল, আমার কটনের প্যান্টটা কোথায় রেখেছ? পাচ্ছি না তো।"
পায়েল কড়াই থেকে চোখ না তুলেই বলল, "আলমারির উপরের তাকেই গোছানো আছে। ভালো করে দেখো, পেয়ে যাবে।"
সুমিত একটু দমে গেল। অন্যদিন পায়েল নিজেই রান্না ফেলে ছুটে গিয়ে জামাকাপড় বের করে দিত। আজ ও নিজের জায়গা থেকে নড়লই না। সুমিত নিজেই গিয়ে প্যান্টটা খুঁজে নিল।
অফিস যাওয়ার সময় সুমিত দেখল ওর রুমাল আর মানিব্যাগটা খাটের ওপর পড়ে আছে। রোজ পায়েল এগুলো ওর হাতে তুলে দেয়। সুমিত ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বলল, "পায়েল, আসছি। রুমালটা টেবিলে রাখলেই পারতে, খাটের ওপর পড়ে আছে।"
পায়েল তখন ঘর মুছছিল। ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত মুখে বলল, "তোমার জিনিস তুমি পকেটে পুরে নিলেই পারো সুমিত। আমি তো আর অফিসে যাচ্ছি না।"
সুমিত হাঁ করে পায়েলের দিকে তাকিয়ে রইল। পায়েলের গলার আওয়াজে কোনো রাগ ছিল না, ঝগড়া করার কোনো মানসিকতাও ছিল না। একদম সাধারণ একটা কথা, কিন্তু সুমিতের মনে হলো পায়েলের এই শান্ত রূপটা যেন চেনা পায়েলের চেয়ে অনেক বেশি অচেনা। ও আর কিছু না বলে তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

Post a Comment

0 Comments