চাপা সত্য

চাপা সত্য

আমার স্ত্রী গোপনে যমজ সন্তানের জন্ম দিয়ে আমাকে বলেছিল তারা মা**রা গেছে
​সেদিন আমার জীবনটা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল, সেদিনটা আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
আমি অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরছিলাম।
ক্লান্ত- প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটে নিয়ে।
মাথায় কেবল নতুন অনাগত মেহমানের চিন্তা।
আমার স্ত্রী আমাদের প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে চলেছিল, সে তখন পুরো নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
আমাদের বিয়ের চার বছর হয়ে গিয়েছিল।
আল্লাহর কাছে কত দোয়া-কান্নাকাটি করেছি একটা সন্তানের জন্য। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপর আমরা বাবা-মা হব—এই আনন্দে আমাদের যেন তর সইছিল না।
​তারপর এক রাতে হঠাৎ তার প্রসববেদনা উঠল।
আমি হন্যে হয়ে একটা সিএনজি ডেকে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম।
বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপছিল, আবার একই সাথে প্রথম বাবা হওয়ার এক অদ্ভুত আনন্দও কাজ করছিল।
কয়েক ঘণ্টা ওটিতে (OT) থাকার পর একজন ডাক্তার বাইরে এলেন।
তার মুখটা ভীষণ গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
তিনি এসে এমন একটা কথা বললেন যা আমার পুরো দুনিয়াটাকে এক নিমেষে ছারখার করে দিল।
ডাক্তার বললেন, "আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, কিন্তু আফসোস! আপনার যমজ বাচ্চাদের কাউকেই বাঁচানো গেল না।"
​মুহূর্তের মধ্যে আমার চারপাশের আকাশটা যেন ভে*ঙে পড়ল।
আমি হাসপাতালের মেঝেতে বসে বাচ্চাদের মতো ডিল হুকরে কেঁদে উঠলাম।
আমার স্ত্রীও বিছানায় শুয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল।
খবরটা শুনে আমাদের পুরো পরিবারে যেন কিয়া*মত নেমে এলো, সবাই শোকে পাথর হয়ে গেল।
বছরের পর বছর ধরে আমি সেই বুকফাটা কষ্টটা মনের গভীরে বয়ে বেড়িয়েছি।
রাস্তায় বা আত্মীয়দের বাসায় যখনই কোনো ছোট বাচ্চাকে হাসতে-খেলতে দেখতাম, কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠত। মনে হতো, আমারও তো এমন দুটো সন্তান হওয়ার কথা ছিল, যাদের মুখটা দেখার ভাগ্য আমার হলো না।
দিন কাটতে লাগল।
ধীরে ধীরে।
বুকের ভেতর এক মহাসমুদ্র কষ্ট চেপে।
​পাঁচ বছর কেটে গেল।
একবার অফিসের একটা জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে অন্য একটা জেলায় যেতে হয়েছিল। ঠিক তখনই আমার জীবনের সবচেয়ে অলৌকিক ঘটনাটা ঘটল।
দুপুরের দিকে হাইওয়ের পাশের একটা ছোট রেস্তোরাঁয় (হোটেল) দুপুরের খাবার খেতে থামলাম।
আমি যখন টেবিল বসে খাবারের অপেক্ষা করছি, ঠিক তখনই দুটি ছোট ছেলে হুড়মুড় করে রেস্তোরাঁয় ঢুকল।
একদম পিঠাপিঠি যমজ ভাই।
যে মুহূর্তে আমার নজর তাদের ওপর পড়ল, তখন আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ছেলে দুটো দেখতে অবিকল আমার ছোটবেলার মতো!
একই রকম টানা টানা চোখ।
একই রকম নিষ্পাপ হাসি।
এমনকি আমার মতো তাদের বাঁ গালেও ঠিক একই জায়গায় একটা করে টোল পড়ে।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম, চোখ ফেরাতে পারছিলাম না।
ছেলেদের মধ্যে একজন আমার দিকে তাকানো খেয়াল করল।
তারপর সে মিষ্টি করে হেসে আমার দিকে হাত নাড়ল।
​বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছিল।
মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঠিক নেই, অথবা হয়তো অলৌকিক কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
আমি কিছুই মেলাতে পারছিলাম না।
এমন সময় বোরকা পরিহিত একজন বয়স্কা নারী রেস্তোরাঁয় ঢুকলেন এবং ছেলেদের নাম ধরে ডাকলেন।
ছেলেরা "দাদু" "দাদু" বলে সাথে সাথে দৌড়ে তার আঁচল চেপে ধরল।
রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময়, তাদের মধ্যে একজন অসাবধানতাবশত তার স্কুলের আইডি কার্ডটা মেঝেতে ফেলে গেল।
আমি দ্রুত সেটা কুড়িয়ে নিলাম এবং পেছন থেকে ডাক দিলাম, "খালাম্মা! একটু শুনবেন?"
বৃদ্ধা মহিলাটি থামলেন এবং আইডি কার্ডটা নেওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন।
কিন্তু ঠিক তখনই তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন।
এবং সাথে সাথে তিনি যেন পাথরের মতো জমে গেলেন।
তিনি আমার দিকে এমনভাবে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন, যেন কোনো জ্যান্ত ভূ*ত দেখছেন।
তার মুখটা শুকিয়ে গেল এবং তিনি ফিসফিস করে কাঁপানো গলায় বললেন—
"ইয়া আল্লাহ! এটা কীভাবে সম্ভব? এ তো হতেই পারে না!"
​আমার হৃদস্পন্দন তখন যেন একশো স্পিডে ছুটছে।
আমি নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "খালাম্মা, কোনো সমস্যা? আপনি এভাবে তাকাচ্ছেন কেন?"
মহিলাটি একবার যমজ বাচ্চাদের দিকে তাকালেন, তারপর আবার আমার মুখের দিকে তাকালেন।
হঠাৎ করেই তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।
তারপর তিনি এমন একটা কথা বললেন যা আমার পুরো জীবনটাকে চিরতরে ওলটপালট করে দিল।
তিনি বললেন, "বাবা, এই ছেলে দুটো অন্য কারও নয়... এরা তোমার নিজের র** ক্ত, তোমার নিজের সন্তান!"
​কথাটা শুনে আমার পায়ের তলার মাটি যেন এক ঝটকায় সরে গেল।
মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল।
কারণ আমার জানা মতে, এবং সমাজের সবার কথা অনুযায়ী—
আমার যমজ সন্তানেরা তো আজ থেকে পাঁচ বছর আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে!
আর এরপর সেই বৃদ্ধা মহিলা চোখের পানি মুছতে মুছতে যে সত্যটা ফাঁস করলেন, তা আমার নিজের স্ত্রীর এতগুলো বছর ধরে লুকিয়ে রাখা এক ভয়ঙ্কর ও বিশ্বাসঘা*তকতার রহস্যকে আমার সামনে এনে দাঁড় করালো

Post a Comment

0 Comments