ইফতার

ইফতার

 রমজানের চতুর্থ রাত। গত তিন দিন প্রিয়তা শুধু দেখেছে শ্বশুর বাড়ির রুটিন। বিয়ে হয়ে এসেছে নয় মাস। এটাই প্রথম রমজান। সেহরির সময় থেকে পরদিন ইফতারের আয়োজন শুরু হয়। ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় সারাদিনের রান্নার কাজ। আর সেটা বহাল তবিয়তে চলে ইফতারের একমিনিট আগ পর্যন্ত। তারাবির নামাজের পরে রাতের খাবারের মধ্যেই মাসুমা বেগম বুঝিয়ে দিচ্ছিল আগামী কালকের খাদ্য তালিকা।

– 'ছোলার ডালের হালুয়ার জন্য ডাল ভিজিয়ে রাখবে ভোররাতেই, দুধ তো পাঁচলিটারের বোতলে। ডিপ থেকে বের করে রেখো। সকাল সকাল পায়েস করে ফ্রিজে রাখবে। ছোলাও ভিজিয়ে রাখবে। বেশি সময় না ভিজলে খেতে ভালো লাগে না রান্নাও সুস্বাদু হয় না। আর কাঁচা চানাও কিন্তু ভিজিয়ে রাখবে। আজ সকালে ভিজিয়েছো খেতে কেমন লেগেছে? শক্ত দেখে খাওয়া হলো না পুরোটা। কিছু গেলো ফেলানো।
আর হ্যা হালিমের কথা ভুলে যেওনা। কালকে মুরগী দিয়ে করবে। ডালটা ভালো করে সেদ্ধ করবে। গ্যাসতো কিনতে হয় না। জ্বাল করবে বেশি সময়। আর হ্যা ভিজিয়ে রাখবে কিন্তু ফজরের নামাজের পরেই। তানভীর হালিম ছাড়া ইফতারে তুষ্ট হতে চায় না। সারাদিন রোজা রেখে যদি পছন্দের খানাই না পায় মেজাজ ঠিক থাকে তখন?
পেয়াজুর জন্য বাটা ডালতো আরও তিন চার দিন হয়ে যাবে। বুন্দিয়াগুলো বারোটা একটার দিকে ভেজে নিও। পেয়াজু, বেগুনি, সবজি পকোড়া আর আলুর চপ পাঁচটার দিকে ভেজো। না হয় ঠান্ডা হয়ে যায়। কালকে লতি দিয়ে চিংড়ি করবো। সাথে দুই রকম ভর্তা। কালোজিরা আর বাদাম। ভোররাতের জন্য বোয়াল মাছ ভুনা, লালশাক, শুটকি ভর্তা আর দুধ। এসবের জন্য তুমি তোমার সুবিধা মতন করে জোগাড় করবে।'
– 'এর সাথে কালকে একটু জালী কাবাব করো। ফালুদা ভাবির হাতের টা ভালোই হয়। ফালুদা করে ফ্রিজে রেখো। সৌরভ আর খায়রুল কালকে বাসায় ইফতার করবে। আমি অফিস থেকে আসার সময় ইলিশ নিয়ে আসবো। সরষে ইলিশের সবকিছু রেডি করে রেখো। মাছ এলে কে'টে শুধু বসিয়ে দিবে।' (তানভীর)
– 'ছোটো ভাইয়ার বন্ধুদের জন্য জালী কাবাব করলে আমার বান্ধবীদের ইফতার পার্টিতে কিন্তু জালী কাবাবের সাথে পুডিং বানিয়ে দিতে হবে!' (তামান্না)
তানভীর প্রিয়তা'র দেবর। একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করে। তার গম্ভীর গাঢ় গলার কথার শেষ শব্দের সাথে সাথে আদুরে আবদার করলো তামান্না। প্রিয়তা ওদের কাথার উত্তর দিলো না। ওদের দিক থেকে শীতল চাউনি সরিয়ে শান্ত স্বরে শাশুড়ীকে বললো,
– 'মাসটা তো ইবাদতের মা! এভাবে যদি প্রতিদিন ইফতার আর বিভিন্ন রকম তরকারি রান্না করে সময় চলে যায় আমরা ইবাদত করবো কখন?'
স্পষ্টবাদি প্রিয়তা খাবার টেবিলেই সকলের সামনে কথা তুলে ফেললো। এতোদিনে একপারা মাত্র কোরআন পড়েছে। আর তারাবির নামাজ ও সব পড়া হয়নি দুই দিন। এভাবে চললে পুরো মাসই কিচেন আর ডাইনিং টেবিলে চলে যাবে।
প্রিয়তা'র কথা শুনে গরম তেলে পানির ছিটার মতন ছ্যাত করে উঠলেন প্রিয়তা'র শাশুড়ি মাসুমা বেগম। উচ্চ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলেন,
– 'ঘরের কাজ-ও তো নারীদের জন্য ইবাদত। এতো কথা বলতে শিখেছেন এটা শেখায়নি তোমার মা?'
– 'কথাটা তো আমি বলেছি মা। আমার মা'কে কেন টানছেন? আমি তো ছোটো বাচ্চা নই। যে প্রতিটা কদম আমাকে হাতে ধরে শিখিয়ে দিতে হবে। তাছাড়া এটা আত্মশুদ্ধির মাস, সংযমের মাস। কোনোকিছুরই সংযম না করে মনে হয় জানি এই মাসটা খাওয়ার প্রতিযোগিতার মাস। দুনিয়ায় শুধু খেতেই এসেছি। আল্লাহ আমাদের জন্য রমজান মাসটা শুধু খেতেই দান করেন।'
– 'আহ! থামবে? সারাদিন পরে খেতে বসেছিতো! মাঝে মাঝে আমি বুঝতে পারিনা এটা পরিবার না-কি ময়দান? কোনো কিছু নিয়ে শান্তিপূর্ন আলোচনা করা যায় না? সব সময় সবাইকে আক্রমণ করতে হবে কেন? এটা কি কোনো রণক্ষেত্র?' (আলম সাহেব)
আলম সাহেব ব্যাংকার। আগামী বছর আসবেন অবসরে। বড়ো ছেলে তুষারকে বিয়ে করিয়ে থেকে বাসায় কেমন একটা উত্তপ্ত পরিস্থিতি টের পান তিনি। কিন্তু সামনাসামনি পরেনি কোনোকিছু। শাশুড়ী বউ সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছে বিষয় টি। আজকে আর আড়ালে রাখতে পারলো না।
– 'কোনটা রণক্ষেত্র? এই মেয়েটা বেয়াদ'বের মতো সবসময় মুখে মুখে কথা বলে। আর আমি কিছু বললেই রণক্ষেত্র হয়ে গেলো?' (শাশুড়ী)
– 'সংযমের মাস দেখে কি মানুষ খাবে না ভাবি? আর এতো বুজুর্গি দেখিও না। কয়টা সূরা পারো? সেদিনই না শাড়ী পরে পার্টি হিজাব পরে ভাইয়ার সাথে ঘুরতে গেলে? তখন তোমার এসব আল্লাহ ওয়ালা জ্ঞান কোথায় ছিলো?' (তামান্না)
– 'তামান্না..! শালীন ভাষায় কথা বলো। সে তোমার বয়োজ্যেষ্ঠ। সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারলে বলবে না হলে তোমার ওর সাথে কথা বলার দরকার নাই।' (আলম সাহেব)
আলম সাহেবের জোড়ালো ধমকে তামান্না খাবার প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়ালো। খাবেই না। যাওয়ার আগে উচ্চ গলায় বললো,
– 'আমাকে এভাবে বলে লাভ নাই আব্বা। ভাবির কথায় তো আমার যেটাই মনে হলো সেটাই বলেছি। আর হ্যা ভাবি তোমাকে বলছি, রোজার মাসে অন্তত ইবাদতের দোহাই দিও না। কাজ করতে সমস্যা এটা বলো। বলো রোজা রেখে কাজ করতে পারবে না। শুয়ে-বসে কাটিয়েছে ইফতার পর্যন্ত টিকে কোনোমতে রোজা রাখতে চাচ্ছো। তাতে তো সরবতগুলো আমিই বানাই। সেহরির থালাবাসন বুয়া এসে ধুয়ে দিয়ে যায়। রান্নাটা মা করে তোমার শুধু ভাজাপোড়া, ফল কা'টা আর শুধু একটু রান্নার জোগাড় করতেই এতো কষ্ট?'
.
প্রিয়তা'র একমাত্র ননদ তামান্না। অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ে। তুষার এখনো বাসায় আসেনি। তানভীর খাওয়া থামিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার ক্রোধের পরিপূর্ণ দৃষ্টির সীমানায় অদৃশ্য অগ্নি হলকা। মনে চাচ্ছে প্রিয়তা'কে ঝলসে দিতে। শুধু মাত্র বাবার উপস্থিতিতে দমিয়ে রেখেছে নিজেকে।
– 'তোমার যখন বিয়ে হবে তখন তুমি বুঝবে তামান্না রান্না করতে কষ্ট কতটা আর সবকিছু জোগাড় করতে কষ্ট কতটা।'
– 'দেখেছিস? এই জন্য বংশ দেখে বিয়ে করতে হয়। ছোটো জাত দেখেই তো এই অবস্থা। খালের মাছ বিলে এসে পরলে বিলকে সমুদ্র তো ভাববেই!'
তুষার মাত্র ঘরে ঢুকলো। আলম সাহেব স্তম্ভিত হয়ে আছেন। তানভীর শক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে। মায়ের লালিত বিমর্ষ চেহারা আর কয়েকটি বাক্যে বুঝলোনা কিছুই। অবুঝ গলায় প্রশ্ন করলো,
– 'বাড়িতে কি কিছু হয়েছে?'

Post a Comment

0 Comments