কাজের_মেয়ের_গুজব

 কাজের_মেয়ের_গুজব

কাজের_মেয়ের_গুজব

চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তে।
বৃষ্টির ফোঁটা গাছের পাতায় পড়ছে, দূরে কোথাও কুকুরের ডাকে রাত আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে।
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মিস্টার ইয়াসিন।
এক পাশে অস্ত্রধারী জালাল ও তার লোকজন।
আর অন্য পাশে তানভীর—যার মুখে এখন আর কোনো মুখোশ নেই।
সুহাসিনী গাড়ির ভেতর বসে কাঁপছে।
তার চোখে শুধু ভয় না, অপরাধবোধও।
কারণ তার অতীতই আজ তার বর্তমানকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে সামনে তাকালেন।
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভয়ংকর দৃঢ়।
“তানভীর… তুমি আমার কোম্পানির ডিরেক্টর ছিলে। কেন?”
তানভীর হালকা হাসল।
“কারণ তুমি সবসময় সবার ওপর ভরসা করো, ইয়াসিন।”
“আর সেই ভরসাটাই তোমার দুর্বলতা।”
জালাল পাশ থেকে হেসে উঠল।
“আমি তো শুধু কাজটা করেছি।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“তোমরা দুজন একসাথে?”
তানভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“শুধু আমি আর জালাল না… আরও অনেকে আছে।”
এই কথাটা শুনে সুহাসিনীর শরীর কেঁপে উঠল।
তার মনে একটা পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠল—
শালবনপুরের সেই রাত।
অন্ধকার ঘর।
চেয়ারম্যানের হাসি।
আর একদল লোক যারা সত্য লুকিয়ে রেখেছিল।
সে হঠাৎ গাড়ির দরজা খুলে নিচে নেমে এলো।
“থামুন!”
সবাই তাকাল।
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“আপনারা আমাকে নিয়ে যা খুশি করুন… কিন্তু ওকে ছেড়ে দিন।”
ইয়াসিন দ্রুত তার দিকে ফিরলেন।
“না, তুমি এখানে আসবে না।”
কিন্তু সুহাসিনী এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“সব আমার জন্য শুরু হয়েছে।”
তানভীর মুচকি হাসল।
“না সুহাসিনী… তুমি শুধু চাবি।”
“মানে?”
তানভীর ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি সেই একমাত্র সাক্ষী, যে দেখেছিল আসল খুনটা।”
জালাল ধীরে ধীরে বলল,
“আর আজ তুমি যদি কথা বলো… তাহলে চেয়ারম্যান, পুলিশ… সবাই শেষ।”
ইয়াসিন এক ধাপ এগোলেন।
“তাহলে সত্যটা কী?”
তানভীর চুপ করে গেল কয়েক সেকেন্ড।
তারপর বলল,
“সেই সাংবাদিক শুধু খুন হয়নি…”
“সে সরকারের একটা বড় দুর্নীতির ফাইল বহন করছিল।”
“আর সেই ফাইলের মধ্যে ছিল আমাদের নাম।”
বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল।
তানভীর আবার বলল,
“তাই তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। আর দায় চাপানো হয়েছিল জালালের ওপর।”
জালাল হেসে বলল,
“আমি শুধু বলির পাঁঠা।”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
“তাহলে এখন কী চাও?”
তানভীরের চোখ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তোমার সব সম্পত্তি।”
“আর সুহাসিনীকে আমাদের কাছে দিতে হবে।”
এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসিনের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“তুমি ভুল মানুষ বেছে নিয়েছ।”
তানভীর হাত তুলল।
“তাহলে শেষ করি?”
ঠিক তখন হঠাৎ পেছন থেকে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।
সবাই থমকে গেল।
দূরে পুলিশের গাড়ি।
লাল আলো ঝলমল করছে।
জালাল চিৎকার করে উঠল,
“কে খবর দিল?!”
তানভীরের মুখে প্রথমবার অস্থিরতা দেখা গেল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি শুধু ব্যবসায়ী না… আমি প্রস্তুতও।”
গাড়ি থামল।
ডজনখানেক পুলিশ নেমে এলো।
সাথে একজন সিনিয়র অফিসার।
তিনি সামনে এসে বললেন,
“তানভীর রহমান, জালাল মিয়া… তোমরা সবাই ঘিরে আছো।”
তানভীর দাঁত চেপে বলল,
“তুমি আগে থেকে জানো?”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন,
“আমি সন্দেহ করেছিলাম।”
“তাই আইনজীবীর মাধ্যমে সব ট্র্যাক করেছি।”
জালাল পেছনে সরে যেতে লাগল।
“না… এটা হতে পারে না…”
পুলিশ এগিয়ে এলো।
হঠাৎ জালাল অস্ত্র তুলে ধরল।
“কেউ সামনে আসবে না!”
সবাই থমকে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সুহাসিনী সামনে এগিয়ে গেল।
“থামো!”
জালাল অবাক হয়ে তাকাল।
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পারো… কিন্তু সত্য লুকাতে পারবে না।”
তার চোখে এবার ভয় নেই।
শুধু সাহস।
তানভীর চিৎকার করে বলল,
“থামাও ওকে!”
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কারণ পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।
হঠাৎ গুলির শব্দ।
একটা বিশৃঙ্খলা।
সবাই ছুটে যাচ্ছে।
ধোঁয়া, বৃষ্টি, চিৎকার।
ইয়াসিন সুহাসিনীকে টেনে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেলেন।
“চোখ বন্ধ করো!”
কিছুক্ষণ পর সব থেমে গেল।
জালাল ধরা পড়েছে।
তানভীরও।
রাতের অন্ধকারে সত্য ধীরে ধীরে বের হয়ে এলো।
পরদিন সকাল।
ঢাকার বড় মিডিয়া হেডলাইন—
“বড় দুর্নীতি চক্রের পর্দা ফাঁস”
“ব্যবসায়ী সিইওর সাহসিকতায় ধরা পড়ল অপরাধীরা”
অফিসের সবাই স্তব্ধ।
যারা তাকে সন্দেহ করেছিল, তারা এখন চুপ।
অন্যদিকে বাড়িতে শান্ত পরিবেশ।
সুহাসিনী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
সকাল সূর্যের আলো তার মুখে পড়ছে।
ইয়াসিন এসে পাশে দাঁড়ালেন।
“এখন ভয় নেই।”
সুহাসিনী ধীরে ধীরে বলল,
“আমি কখনো ভাবিনি সত্য বের হবে।”
ইয়াসিন তার দিকে তাকালেন।
“তুমি সাহস না দেখালে কিছুই সম্ভব হতো না।”
একটু নীরবতা।
তারপর সুহাসিনী বলল,
“আমি কি সত্যিই আপনার জীবনের অংশ হতে পারব?”
ইয়াসিন হালকা হাসলেন।
“তুমি তো আগেই হয়েছ।”
সে চোখ নামাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“কিন্তু সমাজ…”
ইয়াসিন থামিয়ে দিলেন।
“সমাজ না… তুমি আর আমি ঠিক করব।”
সুহাসিনী চোখ ভিজে গেল।
কিন্তু এবার সেটা কষ্টের না।
শান্তির।
কিছুদিন পর।
বাড়িতে ছোট্ট অনুষ্ঠান।
হামিম, রাফি, লায়না এসেছে।
তাদের হাসি পুরো বাড়ি ভরে দিয়েছে।
রাহিমা খাতুন এবার নিজে এসে সুহাসিনীর পাশে দাঁড়ালেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি ভুল বুঝেছিলাম।”
এই কথাটা শুনে সুহাসিনী চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নত করল।
“সব ঠিক আছে।”
ইয়াসিন দূর থেকে তাকিয়ে হাসলেন।
জীবনে প্রথমবার তার ঘর সত্যিকারের শান্ত।
শেষ দৃশ্য।
শহরের আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।
ইয়াসিন আর সুহাসিনী একসাথে দাঁড়িয়ে আছে।
বাতাসে হালকা ছোঁয়া।
কোনো ভয় নেই।
কোনো গুজব নেই।
শুধু সত্য।
ইয়াসিন ধীরে বললেন,
“জীবন কখনো সহজ ছিল না।”
সুহাসিনী তাকাল। কিন্তু এখন? তিনি হাসলেন। এখন শুরু হয়েছে। ক্যামেরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। শেষ হয় একটি গল্প গুজব দিয়ে শুরু, সত্য দিয়ে শেষ।
'''সমাপ্ত'''

Post a Comment

0 Comments