সম্পত্তির_লোভ
“একদম মুখ বন্ধ রাখো!” রিয়া চিৎকার করে উঠল।
পুরো ড্রয়িংরুমে তখন এমন একটা নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, যেন কেউ শ্বাস নিতেও ভয় পাচ্ছে। সাঈদের মুখে ঘাম জমে গেছে। এতক্ষণ যে মানুষটা নিজেকে এই বাড়ির মালিক ভাবছিল, সে এখন দাঁড়িয়ে আছে একেবারে নিঃস্ব মানুষের মতো।
আমি শক্ত করে রাইসাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। ছোট্ট মেয়েটা তখনো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে। জানেই না, তার মায়ের রেখে যাওয়া শেষ যুদ্ধটা আজ জিতে গেছে।
রিয়া দাঁত চেপে সাঈদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি বলেছিলে সবকিছু তোমার নামে হবে! এই বাড়ি, গাড়ি, বিজনেস—সব! এখন কী হলো? একটা বাচ্চার দয়ার ওপর বাঁচতে হবে তোমাকে?”
সাঈদ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আমি জানতাম না তনিমা এমন উইল করেছে!”
“জানতে না? নাকি তুমি এতটাই ব্যস্ত ছিলে আমার সাথে ঘুরতে, যে নিজের বউ কী করছে সেটাই খেয়াল করোনি?” — রিয়া বিষাক্ত গলায় বলল।
ব্যারিস্টার রফিক সাহেব গম্ভীর মুখে আবার বললেন,
“উইলের এখনো একটা অংশ বাকি আছে।”
সাঈদ বিরক্ত হয়ে চিৎকার করল,
“আর কী বাকি আছে?”
রফিক সাহেব ধীরে ধীরে শেষ পাতাটা খুললেন। তারপর স্পষ্ট গলায় পড়তে শুরু করলেন—
“আমার মৃত্যুর জন্য যদি কখনো কোনো তদন্ত হয়, তাহলে আমার ব্যক্তিগত ডায়েরি, মোবাইল ফোন এবং লকারে রাখা পেনড্রাইভ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সেখানে আমার স্বামী সাঈদ চৌধুরী এবং রিয়া হাসানের সম্পর্ক ও আমার ওপর চলা মানসিক নির্যাতনের সমস্ত প্রমাণ সংরক্ষিত আছে।”
কথাটা শুনে আমার বুকটা ধক করে উঠল।
আর সাঈদ…
সে যেন হঠাৎ করেই পাথর হয়ে গেল।
রিয়ার মুখের রঙ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল। ও তোতলাতে লাগল,
“পে… পেনড্রাইভ?”
আমি এবার বুঝলাম, তনিমা শুধু নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎই নিরাপদ করেনি… নিজের মৃত্যুর বিচারও নিশ্চিত করে গেছে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পুলিশের সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।
সাঈদ চমকে উঠে বলল,
“পু… পুলিশ এখানে কেন?”
কয়েক সেকেন্ড পর দুজন পুলিশ অফিসার ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। তাদের সাথে ছিলেন তনিমার কলেজের বান্ধবী নীলা।
নীলাকে দেখে রিয়ার মুখ শুকিয়ে গেল।
নীলা সরাসরি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“আন্টি… তনিমা মারা যাওয়ার তিনদিন আগে আমাকে একটা পার্সেল দিয়ে বলেছিল, যদি ওর কিছু হয় তাহলে যেন আমি এটা পুলিশের হাতে দেই।”
অফিসারদের একজন হাতে থাকা ছোট্ট বাদামি খামটা ওপরে তুলে ধরলেন।
“এই খামের ভেতরে থাকা পেনড্রাইভে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভিডিও এবং ভয়েস রেকর্ড পাওয়া গেছে,” অফিসার বললেন। “মিসেস তনিমার মৃত্যুকে এখন আর স্বাভাবিকভাবে দেখা হচ্ছে না।”
সাঈদ এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল।
“অফিসার, আপনি ভুল বুঝছেন! তনিমা অসুস্থ ছিল!”
পুলিশ অফিসার ঠান্ডা গলায় বললেন,
“অসুস্থ ছিল, ঠিক। কিন্তু সেই অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়মিত মানসিকভাবে নির্যাতন করা, চিকিৎসার সময় প্রেমিকাকে নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া, আর মৃত্যুর আগের রাতে তাকে একা রেখে পার্টি করা—এসবও কিন্তু রেকর্ডে আছে।”
রিয়ার ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল।
হঠাৎ ও সাঈদের দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলল,
“সব দোষ ওর! ও-ই আমাকে বলেছিল তনিমা বেশিদিন বাঁচবে না!”
সাঈদও ক্ষেপে উঠে বলল,
“তুমিও তো চাইতে তনিমা মরুক! প্রতিদিন বলতে—‘ও মরলেই আমরা ফ্রি’!”
দুজন দুজনকে দোষ দিতে দিতে একসময় প্রায় মারামারিতে জড়িয়ে গেল।
আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না।
তনিমার ছবিটার দিকে তাকিয়ে শুধু মনে হচ্ছিল—মেয়েটা কতটা কষ্ট নিয়ে বেঁচে ছিল!
ঠিক তখনই আমার কোলে থাকা রাইসা হালকা নড়ে উঠল।
ঘুম জড়ানো চোখে ও ফিসফিস করে বলল,
“নানু… মা কোথায়?”
প্রশ্নটা শুনে আমার বুকটা যেন ছিঁড়ে গেল।
আমি মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি আটকাতে চেষ্টা করলাম।
আর ঠিক তখনই পুলিশ অফিসার সাঈদ আর রিয়ার দিকে এগিয়ে এসে বললেন—
“আপনাদের দুজনকেই আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।”

0 Comments