ঘরের কোণে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে রাত্রি। পরনের দামি বেনারসি শাড়িটা এখন লণ্ডভণ্ড, জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে ধস্তাধস্তির চিহ্ন নিয়ে। সেই শাড়ির ভাঁজে মুখ লুকিয়ে সে এক কোণে কুঁকড়ে আছে। রাত্রির ছোট বোন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বসে আছে, যেন আগলে রাখতে চাইছে কোনো এক অদৃশ্য দানবের হাত থেকে। রাত্রির আতঙ্কিত চোখ দুটির দৃষ্টি বারবার স্থির হচ্ছে সামনের সোফাটার ওপর। বিয়ের জন্য সাজানো ঘরটা কিছুক্ষণের মধ্যেই লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
সেখানে অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে হৃদ মেহরোজ। এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে সে যেন এই মুহূর্তের বিভীষিকা উপভোগ করছে। তার চেহারায় কোনো অনুশোচনা নেই, বরং এক অদ্ভুত শীতল প্রশান্তি। মাঝেমধ্যে সে শান্ত চোখে রাত্রির দিকে তাকাচ্ছে, আর সেই চাহনিতে বিঁধে আছে এক তীব্র অধিকারবোধ আর উন্মাদনা। ঘরের গুমোট অন্ধকারে শুধু হৃদ-এর স্থির বসে থাকাটাই রাত্রির হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বিছানার ওপর পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন এহসান সাহেব আর তার স্ত্রী আয়শা বেগম। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও যে ঘরটা ছিল বিয়ের সাজে ঝলমলে, আলোকসজ্জায় উজ্জ্বল—এখন তা যেন এক বিধ্বস্ত রণক্ষেত্র। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দামী কাঁচের টুকরো, উল্টে আছে ফুলদানি, আর দেয়াল থেকে খসে পড়া উৎসবের সাজগুলো এখন উপহাসের মতো ঝুলে আছে।
এহসান সাহেবের দুহাতে মুখ ঢাকা, আঙুলের ফাঁক দিয়ে হয়তো ঝরে পড়ছে তিলে তিলে জমানো সম্মান হারানোর যন্ত্রণা। পাশে বসে আয়শা বেগম অঝোরে কাঁদছেন, তবে কোনো শব্দ নেই। সেই কান্নায় কান পাতলে শুধু বুকফাটা হাহাকার শোনা যায়। কিছুক্ষণ আগেও যারা মেহমানদের হাসিমুখে আপ্যায়ন করছিলেন, হৃদ মেহরোজের এক মুহূর্তের উন্মাদনা তাদের পুরো পৃথিবীটাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এই সাজানো গোছানো সংসারটা যে এক নিমেষে হৃদ-এর ব্যক্তিগত জেদের কাছে হার মেনে যাবে, সেটা তাদের দুঃস্বপ্নেও ছিল না।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে মেঝের ওপর অসার হয়ে পড়ে আছে ঈশান। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা এখন ধুলো আর রক্তে মাখামাখি। কিছুক্ষণ আগে হৃদ-এর হিংসেভরা প্রবল আক্রোশ আর উপর্যুপরি মারের চোট সহ্য করতে পারেনি ও; শরীরের সব শক্তি হারিয়ে এখন সে সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন।
হৃদ মেহরোজ সোফায় বসে নির্বিকারভাবে নিজের হাতের তালুর লালচে দাগগুলো দেখছে। ঈশানের ওই নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে হৃদ-এর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি। তার কাছে এটা কেবল একটা মারামারি ছিল না, এটা ছিল তার সাম্রাজ্য থেকে একজন 'অনুপ্রবেশকারী'কে সরিয়ে দেওয়ার উল্লাস।
পুরো ঘরে এক অদ্ভুত বিভীষিকা বিরাজ করছে। একদিকে মেঝেতে পড়ে থাকা আরিয়ান, অন্যদিকে কোণঠাসা রাত্রি আর তার পরিবার। হৃদ শান্ত গলায় রাত্রির দিকে তাকিয়ে বলল,
"খুব তো শখ হয়েছিল অন্য কারো হাত ধরে ঘর বাঁধার? দেখলে তো রাত্রি, আমার দেওয়া ব্যথা সইবার ক্ষমতাও ওর নেই। এই দুর্বল মানুষটা তোমাকে আগলে রাখত কীভাবে?"
হৃদ মেহরোজ ধীরপায়ে সোফা ছেড়ে উঠল। তার প্রতিটি কদমে এক অদ্ভুত ছন্দ, যেন সে কোনো বিজয়ী সম্রাট। মেঝেতে পড়ে থাকা ঈশানের নিথর দেহটা ডিঙিয়ে সে সরাসরি গিয়ে দাঁড়াল রাত্রির সামনে। রাত্রির ছোট বোনটি ভয়ে আরও বেশি কুঁকড়ে গেল, কিন্তু হৃদ-এর সেদিকে খেয়াল নেই। তার পুরো জগৎ এখন রাত্রিকে কেন্দ্র করে।
হৃদ নিচু হয়ে রাত্রির থুতনিটা আলতো করে ধরে মুখটা ওপরে তুলল। রাত্রির চোখের পানি আর ছিঁড়ে যাওয়া বেনারসি দেখে হৃদ-এর চোখে কোনো মায়া জাগল না, বরং এক ধরণের পাশবিক তৃপ্তি খেলা করে গেল। সে ফিসফিস করে, কিন্তু বরফশীতল গলায় বলল—
"দেখলে তো রাত্রি? তোমার সেই তথাকথিত রক্ষাকর্তা এখন আমার পায়ের কাছে নিথর হয়ে পড়ে আছে। তোমার বাবা-মা? ওনারা তো এখন নিজের সম্মান বাঁচাতেই দিশেহারা। আর তোমার ওই হবু বর... ও তো এই যুদ্ধের ময়দান থেকে অনেক আগেই হেরে বিদায় নিয়েছে।"
হৃদ একটু থামল, তার আঙুলগুলো রাত্রির চুলের ভাঁজে বিলি কাটছে।
"এখন তোমার কাছে কোনো অপশন নেই, জান। তোমার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই মুহূর্তে এই বিধ্বস্ত ঘরেই তুমি আমাকে বিয়ে করবে। কারণ, আমি না থাকলে তোমাকে গ্রহণ করার মতো সাহস এই পৃথিবীর আর কারো নেই। রাজি তো?"
রাত্রির কান্নার শব্দ তখন থেমে গেছে, বদলে সেখানে জায়গা নিয়েছে এক জমাটবদ্ধ হাহাকার। হৃদ-এর উন্মাদনা এখন স্পষ্ট—সে রাত্রিকে ভালোবাসে না, সে রাত্রিকে জয় করতে চায়।
রাত্রি ঘৃণাভরা চোখে হৃদ-এর দিকে তাকাল। তার ভেতরে জমা হওয়া ভয়টা মুহূর্তেই যেন প্রচণ্ড এক জেদে রূপান্তরিত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে সে চিৎকার করে উঠল— "আমি মরে যাব হৃদ! বিষ খেয়ে মরব, ছাদ থেকে লাফ দেব... তবুও তোমার মতো একটা জানোয়ারকে আমি কোনোদিন বিয়ে করব না!"
'মরব' শব্দটা কানে যেতেই হৃদ-এর চেহারার সেই কৃত্রিম শান্ত ভাবটা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কপালে রাগের রগগুলো ফুলে উঠল। ঝড়ের বেগে সে রাত্রির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার দুই কাঁধ খামচে ধরল। রাত্রির ছোট বোনটা ছিটকে দূরে সরে গেল ভয়ে। হৃদ রাত্রিকে নিজের বুকের সাথে সজোরে চেপে ধরে তার কানে ফিসফিস করে গর্জে উঠল—
"মরবে? মরে যাওয়ার শখ হয়েছে তোমার?"
হৃদ-এর গলার স্বর এখন অস্বাভাবিক নিচু, যা আর্তনাদের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। সে রাত্রির চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিদ্রূপের হাসি হাসল।
"তুমি না হয় মরে গেলে রাত্রি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছ, তোমার ওই অসহায় বাবা-মা আর আদরের ছোট বোনটার কী হবে? আমি যদি এখন ওই ড্রয়িংরুমে আগুন ধরিয়ে দেই, তবে তুমি পরপারে যাওয়ার আগেই তোমার পুরো পরিবার ছাই হয়ে যাবে। তুমি কি চাও—আমার জন্য তোমার সাথে সাথে ওরাও মরে যাক?"
কথাটা শুনে রাত্রির সারা শরীর হিম হয়ে এল। হৃদ-এর চোখে কোনো ঠাট্টা নেই, আছে এক অমানবিক জেদ। সে জানে, এই মানুষটা যা বলছে, তা করতে তার হাত একটুও কাঁপবে না। রাত্রির ভেতরের সবটুকু প্রতিবাদ এক নিমেষে জল হয়ে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে হৃদ-এর চোখের দিকে তাকাল; সেখানে সে কেবল নিজের ধ্বংস দেখতে পাচ্ছে।
রাত্রির শরীর থরথর করে কাঁপছে। হৃদ-এর চোখের সেই অমানবিক স্থিরতা দেখে তার কলিজা শুকিয়ে আসছে। সে কোনোমতে তোতলামি করে বলে উঠল—
"তুমি... তুমি এটা করতে পারো না হৃদ! তুমি এতটা নিচে নামতে পারো না। ওরা তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি... ওরা তো নির্দোষ!"
হৃদ একটা শুকনো হাসল। সেই হাসিতে কোনো মমতা নেই, আছে এক বুকভরা বিষাদ আর পাগলামি। সে রাত্রির গালে নিজের হাতটা খুব আলতো করে বুলিয়ে দিল, যেন সে কোনো দামি কাঁচের পুতুল ছুঁয়ে দেখছে।
"আমি সব পারি রাত্রি। তুমি তো জানো, আমার ওপর যখন জেদ চেপে বসে, তখন আমার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। আর নির্দোষ? এই পৃথিবীতে আমার জন্য তুমি ছাড়া আর কেউ নির্দোষ নয়। তুমি রাজি না হওয়া মানে—তুমি নিজেই তোমার পরিবারকে বিপদে ফেলছ। দায়টা কিন্তু তোমার, আমার নয়।"
হৃদ পকেট থেকে একটা লাইটার বের করল। খট করে ছোট একটা আগুন জ্বলে উঠল অন্ধকার ঘরে। সে লাইটারের শিখাটার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
"বলো রাত্রি, কী দেখব আমি? তোমার হাতের মেহেদি, নাকি তোমার এই সুন্দর বাড়ির ধ্বংসস্তূপ?"
রাত্রি এবার ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। তার আর লড়াই করার কোনো শক্তি নেই। নিজের পরিবারের কথা ভেবে তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে, হৃদ এখন আর কোনো মানুষ নয়—সে এক বিভীষিকা, যাকে কেবল নিজের জীবন দিয়েই শান্ত করা সম্ভব।

0 Comments