গ্র্যান্ড হ্যালস হোটেলের কাঁচঘেরা লাউঞ্জে তখন গভীর রাতের নরম আলো ছড়িয়ে আছে। বাইরে শিকাগো শহর ঝলমল করছে, কিন্তু আমার ভেতরে যেন সব আলো নিভে গেছে। ফোনের স্ক্রিনে এখনও ইয়াসিনের মেসেজটা জ্বলছে।
“আমি সত্য জানতে চাই।”
একটা সময় ছিল, যখন এই মানুষটার একটা ছোট্ট মেসেজ দেখলেও আমার বুক ধকধক করত। আমি অপেক্ষা করতাম তার একটা ফোনের জন্য। একটা কথার জন্য। একটা আশ্বাসের জন্য।
কিন্তু আজ…
আজ সেই একই মানুষ আমার সামনে দাঁড়িয়েও অচেনা লাগে।
কারণ আমি বুঝতে পারছি, পাঁচ বছর আগে শুধু একটা বিয়ে ভাঙেনি।
আমার পুরো জীবন পরিকল্পনা করে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
আমি ধীরে ফোনটা টেবিলের ওপর রাখলাম।
সাইরা চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে ক্লান্তি, অপরাধবোধ আর অদ্ভুত এক সহানুভূতি।
“তুমি ঠিক আছ?” সে আস্তে জিজ্ঞেস করল।
আমি হালকা হেসে ফেললাম।
“না।”
একটা সোজা উত্তর।
কারণ আমি আর অভিনয় করতে পারছি না।
আমি এত বছর ধরে নিজেকে শক্ত রেখেছি। নিজেকে বলেছি আমি ভালো আছি। আমি সফল। আমি ভাঙিনি।
কিন্তু সত্যি হলো—
মানুষ যত শক্তই হোক, কিছু ক্ষত কখনও পুরোপুরি শুকায় না।
আমি ধীরে সোফায় হেলান দিলাম।
আয়ান, জিদান আর রায়ান পাশের সোফায় বসে গরম চকোলেট খাচ্ছে। তারা এখনও পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। তাদের কাছে আজকের রাত শুধু একটা অদ্ভুত রাত, যেখানে অনেক মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তারা সব বুঝবে।
আর সেই চিন্তাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়।
আমি চাই না আমার সন্তানরা ঘৃণা নিয়ে বড় হোক।
ঠিক তখন সাইরা নিচু গলায় বলল, “তুমি কি জানো আজকের পর কী হবে?”
আমি তাকালাম তার দিকে।
সে তিক্তভাবে হাসল।
“আগামীকাল সকাল থেকে মিডিয়া পাগল হয়ে যাবে। ইয়াসিন পরিবারের শেয়ার পড়ে যাবে। রাজনৈতিক লোকেরা দূরে সরে যাবে। আর সেলিনা…”
সে থামল।
তারপর ধীরে বলল,
“সে তোমাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে।”
আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম, “সে ইতিমধ্যেই করেছে।”
সাইরা মাথা নাড়ল।
“না রুহানি। এবার ব্যাপারটা অন্যরকম।”
তার চোখ সরু হয়ে গেল।
“আজ তুমি আর সেই আগের অসহায় মেয়ে নও। আজ তুমি তার জন্য হুমকি।”
আমি চুপ করে গেলাম।
কারণ সে ভুল বলছে না।
পাঁচ বছর আগে আমার কিছু ছিল না।
আজ আমার নিজের সাম্রাজ্য আছে।
ক্ষমতা আছে।
মিডিয়া আছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
সত্য এখন আমার পাশে।
ঠিক তখন আমার ফোন আবার বেজে উঠল।
এইবার আমার সহকারী মেহরিন।
আমি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে দ্রুত গলা ভেসে এলো।
“ম্যাম, পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।”
“কী হয়েছে?”
“আপনার আর মিস্টার ইয়াসিনের খবর এখন সব নিউজ চ্যানেলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড করছে। আর…”
সে থেমে গেল।
“আর কী?”
“ইয়াসিন পরিবারের স্টক পড়তে শুরু করেছে।”
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
অবশেষে শুরু হলো।
মেহরিন আবার বলল, “আরও একটা ব্যাপার আছে।”
“বলো।”
“কিছু সাংবাদিক আপনার পুরোনো ডিভোর্স কেস আবার তুলছে। তারা বলছে পাঁচ বছর আগে যা হয়েছিল সেটা নাকি সাজানো ছিল।”
আমি ধীরে বললাম, “তাদের বলতে দাও।”
সত্য যত বের হবে, তত ভালো।
কল শেষ করে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর সাইরার দিকে তাকালাম।
“তুমি আমাকে এসব কেন বলছ?”
সে মৃদু হাসল।
“কারণ আমি বোকা নই।”
আমি কিছু বললাম না।
সে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল।
“আজ আমি প্রথমবার বুঝলাম, আমি একটা মৃত সম্পর্ককে বিয়ে করতে যাচ্ছিলাম।”
তার কণ্ঠে কষ্ট ছিল।
“ইয়াসিন কখনও আমাকে ভালোবাসেনি। আর আমি এমন একজন মানুষকে বিয়ে করতে চাই না, যার হৃদয় অন্য কারও কাছে রয়ে গেছে।”
আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
আমি ভেবেছিলাম সাইরা অহংকারী হবে। নিষ্ঠুর হবে।
কিন্তু সে ক্লান্ত।
একজন নারী, যাকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক চুক্তির জন্য।
হয়তো আমাদের জীবনের পথ আলাদা, কিন্তু ক্ষতগুলো খুব আলাদা নয়।
ঠিক তখন রায়ান দৌড়ে এসে আমার কোলে উঠে বসল।
“মা, আমি ঘুম পাচ্ছে।”
আমি তার কপালে চুমু খেলাম।
“আর একটু সোনা।”
সে আধো ঘুমে বলল, “আজ ওই মানুষটা কাঁদছিল কেন?”
আমি থেমে গেলাম।
সে ইয়াসিনের কথা বলছে।
আমি উত্তর দেওয়ার আগে সাইরা আস্তে বলল,
“কারণ কখনও কখনও মানুষ খুব দেরিতে বুঝতে পারে তারা কী হারিয়েছে।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
সে নিচে তাকিয়ে আছে।
হয়তো সে নিজের কথাও বলছে।
হঠাৎ আমার ফোনে আবার মেসেজ এলো।
ইয়াসিন।
“আমি হোটেলের নিচে আছি।”
আমার বুক ধীরে কেঁপে উঠল।
সে এখানে এসেছে?
আমি দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম। কাঁচের জানালার কাছে গিয়ে নিচে তাকালাম।
হোটেলের সামনে কালো গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াসিন।
একাই।
কোনো সিকিউরিটি নেই। কোনো মিডিয়া নেই।
শুধু সে।
উপরে দাঁড়িয়েও বুঝতে পারছিলাম, সে ভেঙে পড়েছে।
তার কাঁধ ঝুঁকে আছে।
টাই আলগা।
চোখ ক্লান্ত।
এই মানুষটাকে আমি আগে কখনও এমন দেখিনি।
সাইরা ধীরে উঠে এসে পাশে দাঁড়াল।
নিচে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর আস্তে বলল,
“সে সত্যিই জানত না।”
আমি ঠাণ্ডাভাবে বললাম, “জানুক বা না জানুক, সে আমার পাশে দাঁড়ায়নি।”
সাইরা কোনো উত্তর দিল না।
কারণ এই কথার জবাব নেই।
কিছুক্ষণ পরে আমি নিচু গলায় বললাম, “আমি ওর সঙ্গে দেখা করব।”
সাইরা মাথা নাড়ল।
“তোমার উচিত।”
আমি ছেলেদের দিকে তাকালাম।
“মেহরিন পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে ওদের নিয়ে যাবে।”
সাইরা বলল, “আমি থাকব।”
আমি একটু দ্বিধা করলাম। তারপর মাথা নাড়লাম।
দশ মিনিট পরে আমি হোটেলের নিচে নামলাম।
লবির দরজা খুলতেই ঠাণ্ডা বাতাস মুখে লাগল।
ইয়াসিন আমাকে দেখেই সোজা হয়ে দাঁড়াল।
কয়েক সেকেন্ড আমরা শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
পাঁচ বছর।
পাঁচটা দীর্ঘ বছর।
কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে যেন গতকালই সব শেষ হয়েছিল।
সে ধীরে বলল, “ধন্যবাদ… দেখা করতে আসার জন্য।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আমি জানতাম না।”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছিল।
“আমি শপথ করে বলছি রুহানি, আমি কিছুই জানতাম না।”
আমি ঠাণ্ডা চোখে তাকালাম।
“তুমি কী জাননি?”
সে গভীর নিঃশ্বাস নিল।
“তুমি প্রেগন্যান্ট ছিলে।”
আমার বুক শক্ত হয়ে গেল।
“আর?”
সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
“মা এসব করেছে।”
আমি তিক্তভাবে হেসে উঠলাম।
“তোমার মা শুধু এসব করেনি ইয়াসিন। সে আমার পুরো জীবন ধ্বংস করেছে।”
ইয়াসিন মুখ তুলে তাকাল।
তার চোখ লাল।
“আমি জানি।”
“না। তুমি জানো না।”
আমার গলা এবার কাঁপছিল।
“তুমি জানো না একা তিনটা সন্তান জন্ম দেওয়া কেমন। তুমি জানো না হাসপাতালের বিল দিতে না পেরে রাতভর কাঁদা কেমন। তুমি জানো না নিজের বাচ্চাদের জন্য দিনে আঠারো ঘণ্টা কাজ করা কেমন।”
ইয়াসিন চোখ বন্ধ করল।
আমি থামলাম না।
পাঁচ বছরের জমে থাকা কষ্ট বেরিয়ে আসছে।
“আর সবচেয়ে বড় কথা, তুমি জানো না কেমন লাগে যখন যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো, সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তোমাকে ভেঙে যেতে দেখে।”
ইয়াসিনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কাপুরুষ ছিলাম।”
আমি চুপ করে গেলাম।
কারণ এই প্রথম সে সত্যি কথা বলেছে।
সে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
“কিন্তু আমি কখনও তোমাকে ভালোবাসা বন্ধ করিনি।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
এই কথাটা আমি বহু বছর শুনতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আজ শুনেও শান্তি লাগছে না।
আমি ধীরে বললাম,
“ভালোবাসা যথেষ্ট না।”
ইয়াসিন মাথা নিচু করল।
“আমি জানি।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি কি… ওদের আবার দেখতে পারি?”
আমার চোখ সরু হয়ে গেল।
“তুমি কি বাবা হতে চাও এখন?”
সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি সবসময় হতে চেয়েছিলাম। শুধু জানতাম না।”
আমি গভীরভাবে তার দিকে তাকালাম।
সে মিথ্যে বলছে না।
আমি বুঝতে পারছি।
কিন্তু সত্যি হলেও অতীত মুছে যায় না।
আমি ধীরে বললাম,
“ওরা খেলনা না ইয়াসিন। আজ দেখে ভালো লাগল বলে কাল ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
সে মাথা নাড়ল।
“আমি ভুলব না।”
তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যেটা আগে কমই দেখেছি।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—
“মা।”
ইয়াসিন ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে কলটা কেটে দিল।
আমি অবাক হলাম।
সে আগে কখনও সেলিনার ফোন কাটত না।
ইয়াসিন নিচু গলায় বলল,
“আমি আজ প্রথমবার বুঝলাম, আমার মা আসলে কে।”
আমি ঠাণ্ডা স্বরে বললাম,
“অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
সে কষ্টের হাসি দিল।
“হয়তো।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“কিন্তু আমি ঠিক করতে চাই।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কারণ কিছু ভাঙা জিনিস জোড়া লাগে।
আর কিছু ভাঙা জিনিস শুধু দাগ হয়ে বেঁচে থাকে।
ঠিক তখন হঠাৎ দূরে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল।
কয়েকজন সাংবাদিক আমাদের দেখে ফেলেছে।
ইয়াসিন বিরক্ত হয়ে তাকাল।
কিন্তু আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম—
এটাই কেবল শুরু।
কারণ আগামীকাল সকাল থেকে পুরো পৃথিবী আমাদের যুদ্ধ দেখবে।
আর সেই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষটা এখনও নিজের চাল দেয়নি।
সেলিনা ইয়াসিন।

0 Comments