মায়া বাড়ির সামনের দেয়ালে লেখা লাল অক্ষরগুলোর দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। রাস্তার ওপাশে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে, কেউ আবার মোবাইল বের করে ছবি তুলছে।
তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে রাগ জমতে লাগল।
এটা শুধু ভয় দেখানো নয়।
এটা ছিল তার সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা।
এটা ছিল তাকে সমাজের চোখে অপরাধী বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
মায়া গভীর শ্বাস নিল। তারপর মোবাইল বের করে দেয়ালের ছবি তুলল। বিভিন্ন দিক থেকে একাধিক ছবি নিল। এরপর নিরাপত্তারক্ষীকে ডাকল।
"রাতের সিসিটিভি ফুটেজ দরকার।"
নিরাপত্তারক্ষী মাথা নাড়ল।
"ম্যাডাম, আমি এখনই বের করছি।"
দশ মিনিট পর মায়া নিজের স্টাডি রুমে বসে ফুটেজ দেখতে লাগল।
রাত তিনটা বেজে বারো মিনিট।
একটি কালো হুডি পরা মানুষ দেয়ালের কাছে আসে।
মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি।
তার উচ্চতা।
তার শরীরের গঠন।
কোথায় যেন দেখা।
মায়া ভিডিও বারবার চালাতে লাগল।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল।
ইয়াসিনের অফিসের একজন কর্মচারী।
নাম সাদমান।
সে আগে দু-একবার ইয়াসিনের সঙ্গে মায়ার বাড়িতে এসেছিল।
নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও প্রমাণ দরকার ছিল।
তবু তার সন্দেহ শক্ত হতে শুরু করল।
অফিসে পৌঁছানোর পর সে পুরো বিষয়টি নাদিয়াকে জানাল।
নাদিয়া মনোযোগ দিয়ে সব শুনল।
তারপর বলল,
"আমার মনে হয় বিষয়টা আমাদের ধারণার চেয়েও বড়।"
"কেন?"
নাদিয়া একটি ফাইল এগিয়ে দিল।
"গত দুই সপ্তাহে আমরা আটজন ক্লায়েন্ট হারিয়েছি। কিন্তু আজ সকালে আমি আরেকটা তথ্য পেয়েছি।"
মায়া ভ্রু কুঁচকাল।
"কী তথ্য?"
"একজন ক্লায়েন্ট বলেছে, কেউ তাদের কাছে ফোন করে তোমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বাজে কথা বলেছে।"
মায়ার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
"কী ধরনের কথা?"
"তুমি নাকি আর্থিক প্রতারণা করো। তুমি নাকি মানসিকভাবে অস্থিতিশীল। এমনকি এটাও বলা হয়েছে যে তোমার বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্ত চলছে।"
মায়া হতবাক হয়ে গেল।
"এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।"
"আমি জানি।"
"কিন্তু কেউ পরিকল্পিতভাবে এসব ছড়াচ্ছে।"
নাদিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
"ঠিক সেটাই আমিও ভাবছি।"
মায়া চেয়ারে হেলান দিল।
তার মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলছিল।
কিছুদিন আগেও সে ভেবেছিল বিয়ে ভেঙে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু এখন বুঝতে পারছে।
বিয়ে ভাঙা ছিল শুধু শুরু।
ইয়াসিন এবং রেহানা সহজে হার মানার মানুষ নয়।
ওরা প্রতিশোধ নিতে চাইছে।
আর প্রতিশোধের লক্ষ্য শুধু মায়া নয়।
তার ব্যবসা।
তার ভবিষ্যৎ।
তার সম্মান।
সবকিছু।
সেদিন দুপুরে মায়া আইনজীবী আরিফের সঙ্গে আবার দেখা করল।
সব তথ্য বিস্তারিতভাবে জানাল।
আরিফ নোট নিতে নিতে বললেন,
"আপনার কাছে এখনো সরাসরি প্রমাণ নেই যে ইয়াসিন এসব করছে।"
"আমি জানি।"
"তাহলে আমাদের কাজ হবে প্রমাণ খুঁজে বের করা।"
"কীভাবে?"
আরিফ সামান্য হাসলেন।
"যারা নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবে, তারা সাধারণত একটা ভুল করেই বসে।"
"কী ভুল?"
"তারা ভাবতে শুরু করে, তারা ধরা পড়বে না।"
মায়া চুপ করে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
"তাহলে?"
"আমরা অপেক্ষা করব।"
মায়া বিরক্ত হলো।
"অপেক্ষা?"
"হ্যাঁ। কারণ ওরা থামবে না। আর যত বেশি এগোবে, তত বেশি ভুল করবে।"
বিকেলের দিকে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় সে লক্ষ্য করল একটি গাড়ি রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।
কালো রঙের এসইউভি।
কয়েক মিনিট আগেও ছিল।
এখনও আছে।
মায়া কিছু না বলে নিজের গাড়িতে উঠল।
তার ড্রাইভার রফিক গাড়ি চালানো শুরু করল।
পাঁচ মিনিট পর মায়া পিছনের আয়নায় তাকিয়ে দেখল।
একই গাড়ি।
তাদের পেছনে আসছে।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
সে আবার তাকাল।
হ্যাঁ।
গাড়িটি এখনও পেছনে।
আরও দশ মিনিট।
এখনও।
মায়া শান্ত গলায় বলল,
"রফিক, সামনে ডানদিকে মোড় নাও।"
রফিক নির্দেশ মেনে নিল।
কালো গাড়িটিও মোড় নিল।
এবার আর সন্দেহ রইল না।
তাদের অনুসরণ করা হচ্ছে।
মায়ার হাত অজান্তেই নিজের পেটের উপর চলে গেল।
শিশুটি।
তার সন্তান।
সে এখন একা নয়।
যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে সন্তানের নিরাপত্তা ভাবতে হবে।
"রফিক, সরাসরি থানায় যাও।"
রফিক অবাক হয়ে তাকাল।
"থানায়?"
"হ্যাঁ।"
কালো গাড়িটি আরও কিছুদূর পিছু নিল।
তারপর হঠাৎ অন্যদিকে চলে গেল।
মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সতর্ক হয়ে উঠেছে।
এটা আর সাধারণ ঝামেলা নয়।
এটা হয়রানি।
এটা ভয় দেখানো।
এটা চাপ সৃষ্টি করা।
এবং কেউ একজন চাইছে সে ভেঙে পড়ুক।
সেই রাতে বাড়ি ফিরে মায়া প্রথমবারের মতো সত্যিকারের ভয় অনুভব করল।
নিজের জন্য নয়।
সন্তানের জন্য।
সে দীর্ঘ সময় ধরে শিশুর ঘরে বসে রইল।
দেয়ালে আঁকা ছোট্ট তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে।
সাদা রঙের ছোট্ট খাটের দিকে তাকিয়ে।
যে শিশুটি এখনও জন্মায়নি, তার জন্য সে কত পরিকল্পনা করেছে।
কত স্বপ্ন দেখেছে।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
মায়া কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।
তারপর রিসিভ করল।
ওপাশে কোনো শব্দ নেই।
শুধু নিঃশ্বাসের আওয়াজ।
"হ্যালো?"
নীরবতা।
"কে বলছেন?"
কয়েক সেকেন্ড পরে কল কেটে গেল।
মায়ার গা শিউরে উঠল।
দুই মিনিট পর আবার কল।
একই ঘটনা।
তিন মিনিট পর আবার।
এরপর আবার।
এভাবে চলতে থাকল।
রাত বারোটা পর্যন্ত।
অবশেষে সে ফোন বন্ধ করে দিল।
কিন্তু তার ঘুম আর এলো না।
পরদিন সকালে নতুন বিপদ অপেক্ষা করছিল।
তার অফিসের সামনে সাংবাদিকদের ভিড়।
মাইক্রোফোন।
ক্যামেরা।
চিৎকার।
প্রশ্ন।
"ম্যাম, আপনার বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ কি সত্য?"
"আপনার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কারণ কী?"
"আপনি কি সত্যিই বিনিয়োগকারীদের টাকা আত্মসাৎ করেছেন?"
মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল।
কে এসব ছড়াচ্ছে?
কে?
তারপর সে একজন সাংবাদিকের হাতে থাকা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে একটি খবর দেখতে পেল।
একটি অজ্ঞাত ব্লগে লেখা হয়েছে—
মায়া নাকি ব্যবসায়িক প্রতারণা করেছে।
মায়া নাকি তার বাগদত্তাকে আর্থিকভাবে ধ্বংস করেছে।
মায়া নাকি মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
প্রতিটি শব্দ মিথ্যা।
প্রতিটি বাক্য পরিকল্পিত।
প্রতিটি অভিযোগ বিষের মতো।
মায়া ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল।
এটা হঠাৎ করে হয়নি।
অনেক দিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কেউ একজন তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।
অফিসে ঢুকে দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে তার ফোনে একটি মেসেজ এলো।
অচেনা নম্বর।
মাত্র একটি লাইন।
"এখনও সময় আছে।"
মায়ার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল।
আরেকটি মেসেজ।
"সবকিছু থামাতে চাইলে ইয়াসিনের সঙ্গে দেখা করো।"
এবার সে নিশ্চিত।
এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
এটা পরিকল্পিত।
এবং ইয়াসিন এর মাঝখানে আছে।
মায়া ফোন শক্ত করে ধরল।
অনেক দিন ধরে সে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে।
অনেক দিন ধরে সে শুধু আঘাত সহ্য করেছে।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
কারণ তার শত্রুরা ভাবছে সে দুর্বল।
তারা ভাবছে সে ভেঙে পড়বে।
তারা ভাবছে সে হার মেনে নেবে।
মায়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর আবার খুলল।
তার দৃষ্টি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
অনেক বেশি দৃঢ়।
সে ডেস্কের উপর থাকা একটি ফাইল খুলল।
সেখানে ইয়াসিনের কোম্পানি সম্পর্কে কিছু পুরোনো তথ্য ছিল।
কিছু আর্থিক রিপোর্ট।
কিছু বিনিয়োগ সংক্রান্ত নথি।
যেগুলো সে আগে গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু আজ হঠাৎ একটি সংখ্যা তার চোখে আটকে গেল।
একটি বড় অঙ্কের অর্থ।
যা কোথাও হিসাবের সঙ্গে মিলছে না।
মায়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
সে দ্রুত আরও কাগজ উল্টাতে লাগল।
তারপর আরেকটি অসঙ্গতি।
তারপর আরেকটি।
তার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
যদি সে ঠিক হয়...
তাহলে ইয়াসিন শুধু ব্যর্থ ব্যবসায়ী নয়।
তার চেয়েও বড় কিছু লুকিয়ে আছে।
আর সেই গোপন সত্য প্রকাশ পেলে শুধু তার নয়—
ইয়াসিনের পুরো সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে পারে।
মায়া ধীরে ধীরে ফাইল বন্ধ করল।
তার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল।
এবার আর সে পালাবে না।
এবার সে খুঁজে বের করবে সত্য।
আর সত্য যদি সত্যিই তার ধারণার মতো হয়
তাহলে খুব শিগগিরই খেলা ঘুরে যাবে।

0 Comments