স্বামী বলেছিল, “বাড়িটা বিক্রি করে আমার মায়ের সঙ্গে গিয়ে থাকো।” আমি না বলার পরের রাতেই সে এমন কিছু করল, যা আমার জীবনটাই বদলে দিল।
পরদিন সকাল।
সারা শরীর ব্যথায় অবশ হয়ে ছিল আমার। বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে ছিলাম। ঠিক তখনই রাশেদ একটা মেকআপের ব্যাগ ছুড়ে মারল বিছানার ওপর।
ঠান্ডা গলায় বলল,
— "মা আজ দুপুরে খেতে আসবে। মুখের দাগগুলো ঢেকে ফেলো। হাসিমুখে থাকবে। কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে।"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
রাশেদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিল। যেন গত রাতের ঘটনাটা তার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।
গত রাতেই তার মা রহিমা বেগম বসার ঘরে বসে সিদ্ধান্ত শুনিয়েছিলেন,
— "এই বাড়িটা বিক্রি করে দাও। আমাদের পুরনো বাড়িটা অনেক বড়। সবাই একসঙ্গে থাকলে খরচও কমবে।"
কিন্তু আমি জানতাম, আসল উদ্দেশ্য অন্য।
আমার বাবার রেখে যাওয়া এই বাড়িটা বিক্রি হলে টাকাটা তাদের হাতে যাবে। তারপর আমি হয়ে যাব সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
আমি শান্ত গলায় বলেছিলাম,
— "আমি আমার বাবার বাড়ি বিক্রি করব না। আর কারও সঙ্গে গিয়ে থাকবও না।"
এই একটুকু কথাই যেন রাশেদের অহংকারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
সেই রাতেই সে আমাকে ভয় দেখাতে শুরু করে।
ভাবছিল, আমি ভেঙে পড়ব।
আমি রাজি হয়ে যাব।
আজ সকালে সে আবার মেকআপ ব্যাগটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
— "কনসিলার লাগাও। মা যেন ভাবে তুমি বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলে। দুপুরে ভালো করে খাওয়াবে। তারপর বাড়ি বিক্রির কাগজপত্র নিয়ে বসব।"
আমি নিচু স্বরে বললাম,
— "এই বাড়ি আমার।"
রাশেদ ঠান্ডা হাসল।
— "বেশিদিন থাকবে না।"
সকাল ৭টা ৪২ মিনিটে সে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা কানে আসতেই আমি ধীরে ধীরে বিছানার নিচে হাত ঢুকালাম।
সেখানে একটা ছোট মোবাইল ফোন লুকিয়ে রাখা ছিল।
ফোনটার কথা রাশেদ কোনোদিন জানত না।
তিন মাস আগে কিনেছিলাম।
যেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, এই মানুষটার সঙ্গে থাকাটা আর নিরাপদ নয়।
আমি ঢাকার একটি স্বনামধন্য অডিট ও ফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানে ফরেনসিক অডিটর হিসেবে কাজ করি।
আমার কাজই হলো জালিয়াতি ধরা, লুকানো অর্থের হিসাব বের করা, আর এমন প্রমাণ সংরক্ষণ করা যেগুলো অপরাধীরা মনে করে কেউ কোনোদিন খুঁজে পাবে না।
ভয় আমাকে এতদিন চুপ করিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা কখনো হারিয়ে যায়নি।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দাগগুলোর ছবি তুললাম।
পাশে সেদিনের বাংলা পত্রিকাটা রেখে সময়-তারিখসহ ছবি সংরক্ষণ করলাম।
এরপর খুললাম আমার গোপন ক্লাউড ফোল্ডার।
ফোল্ডারের নাম ছিল—
"বিদ্যুৎ বিল ২০২৬"
বাইরে থেকে সাধারণ ফাইল মনে হলেও ভেতরে ছিল একের পর এক ভয়ঙ্কর সত্য।
রাশেদের ভয় দেখানোর অডিও রেকর্ডিং।
রহিমা বেগমের ভয়েস মেসেজ, যেখানে তিনি আমাকে বাড়ির দলিল নিজের নামে করে দিতে চাপ দিচ্ছেন।
আমার এনআইডি ব্যবহার করে গোপনে নেওয়া ঋণের কাগজপত্র।
আর এমন সব কথোপকথন, যেখানে তারা পরিকল্পনা করছিল আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ প্রমাণ করে বাড়িটা দখল করার।
মাসের পর মাস আমি চুপচাপ সব প্রমাণ জমিয়ে রেখেছিলাম।
শুধু জানতাম না, কোন দিন এগুলো ব্যবহার করার সাহস পাব।
আজ বুঝলাম...
আর দেরি করলে হয়তো বাঁচব না।
আমি ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট খুললাম।
পাঁচ বছর ধরে যে নম্বরে কখনো ফোন করিনি, সেটাতেই কল দিলাম।
দ্বিতীয়বার রিং হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ।
— "হ্যালো... মীরা?"
আমার গলা কেঁপে উঠল।
— "আব্বু... আমাকে নিয়ে যান। আমার খুব দরকার আপনার।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর এমন একটি কণ্ঠ ভেসে এল, যেটা শুনলে রাশেদের বুক কেঁপে উঠবে।
— "মা, তুমি যেখানে আছো, ঠিকানাটা বলো। আমি আসছি। এবার কেউ তোমার একটা চুলও বাঁকা করতে পারবে না।"
আমি জানতাম না, দুপুরে যখন রাশেদ আর তার মা দরজা খুলে ঘরে ঢুকবে...
তখন তাদের জন্য এমন একজন অপেক্ষা করবে, যার উপস্থিতি তাদের সমস্ত পরিকল্পনা মুহূর্তেই ভেঙে দেবে।

0 Comments