ধোঁয়াশার শেষে

ধোঁয়াশার শেষে

 সেদিন যখন জানতে পারলাম আমি অন্তঃসত্ত্বা তখন বুকে একরাশ আনন্দ বাসা বাঁধে। গাইনোকলজিস্ট এর সামনে বসেই তাকে আবেগে বলে উঠি

-- ম্যাম, ক্যান কাই কল মাই হাজবেন্ড?
খুশিতে থরথর করে কাপছিল আমার হাত পা। বুকের মধ্যে সে কি ঝড়! অবস্থা ছিলো আমার চেয়ার থেকে উঠে লাফালাফি করার মতো। মাতৃত্ব! কি অদ্ভুত জিনিস। আলভি কে ফোন করে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলি
-- আলভি খুশির খবর আছে। আমাদের বাসায় ছোট অতিথি আসছে।
আলভি এহেন খুশির খবর শোনার পর বলে
-- বাসায় ফিরে কথা হবে।
মনটা ভীষণ খারাপ হয়। বুকের মাঝে গুমোট মন খারাপ বাসা বাঁধে। তবুও তা দমিয়ে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসি। হয়তোবা তার কাজের চাপ বেশি। বাসায় ফিরে তার অপেক্ষা। সঙ্গে আমার অদ্ভুত আনন্দ। আলভি বাসায় ফিরল বিকেলে। চারটায় তার অফিস ছুটে হলে। ঘেমে নেয়ে একাকার সে যখন বাসায় ফেরে তখন এক গ্লাস পানি তার দিকে এগিয়ে দিলে সে করে বসে অভাবনীয় আচরণ। আমাকে এড়িয়ে সে বিছানায় বসে। হাতের ব্যাগ ছুড়ে দেয় বিছানায় অবলীলায়। মুখ শুকিয়ে আছে তার। দু'কান লাল। সাদা শার্ট থেকে টাই খুলল এলোমেলো ভঙ্গিতে।
-- কি হয়েছে? তোমার? শরীর খারাপ? অসুস্থ?
অস্থির নিয়ে তাকে একথা জিজ্ঞেস করলেই সে ধাক্কা দিলো আমাকে। দুপা পিছিয়ে আসি। অবাক হই অনেকটা। আলভি দ্বিধাহীনভাবে উচ্চারণ
-- কি এসব জারা? তুমি এতোটা কেয়ারলেস? সিরিয়াসলি? হসপিটালে গিয়ে আমাকে ফোন করে জানালে আমাদের বেবি আসছে। হোয়াট? আশ্চর্য আমি।
আমি আলভির এমন কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বুক ঢিপঢিপ করছে ক্রমশই। নিজের এমন অনুভূতি পাশে রেখে জানতে চাইলাম
-- তুমি কি খুশি না?
আলভি রক্তচক্ষু নিয়ে চাইলো আমার দিকে। যেন কোনো ভুল প্রশ্ন করেছি আমি যা কিনা করার কথাই ছিল না। আলভি আমার দু-হাত ঝাঁকিয়ে জবাব দিলো রুক্ষ কন্ঠে
-- আমাদের বিয়ের দু’মাস চলছে। জাস্ট দু মাস। এতো জলদি কে বাচ্চা নেয়? আমাদের সংসারের হাল তোমার অজানা?
-- তাতে কি হয়েছে? তুমি এমন করছো কেন? মনে হচ্ছে বাচ্চা অন্য কারো আমার তোমার নয়৷ তুমি বুঝতে পারছো? ও আমাদের ভালোবাসা। আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী।
আলভি ক্ষেপে উঠলো। তিক্ত স্বরে উচ্চ কন্ঠে বলল
-- কি ভালোবাসা? সংসার চলছে না তুমি ভালোবাসার চিন্তা করছো? শোন জারা, গ্রাম্য ভাষায় প্লিজ এটা বলতে এসো না আমাকে যে মুখ কাটবেন যিনি আহার দেবেন তিনি। বি রিয়েলিস্টিক জারা। তোমার সস্তা আবেগ দিয়ে সংসার চলবে না।
আমি হা হয়ে গেলাম আলভির ব্যবহারে। তবুও তার নিকট গিয়ে পরম ভালোবাসা দিয়ে তার হাতে হাত রেখে বললাম
-- আমি টিউশনি করাবো। তুমি চিন্তা কোরো না সব ঠিক হয়ে যাবে। পাশের বাসার আন্টির ছেলে ক্লাস সিক্স এ পড়ে। ওকে পড়ানোর জন্য বলেছে আন্টি। আমি পড়াবো। আর তুমি না বলেছিলে, আমি তোমার পাশে থাকলে তুমি সবকিছু পারবে। সফলতা আসবেই তোমার। আমি সবসময় তোমার সঙ্গে আছি আলভি।
হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে আলভি ফ্রিজের নিকট যায়। ঠান্ডা পানির বোতল বের করে বলে
-- কত মাস? দেড় নাকি?
-- হুম।
-- অপারেশন করবে দুইদিন পর। শুক্রবারে নিয়ে যাবো।
আমার কলিজায় যেন তীর বিধলো। এমন কথা স্বপ্নেও আশা করিনি তার থেকে। ছন্নছাড়া মন নিয়ে আলভির পাশে দাড়িয়ে বলতে চাইলাম কিছু। কিন্তু সে হাত উঁচিয়ে জানিয়ে দিলো
-- শুনতে চাইছি না।
আমার কন্ঠ রুদ্ধ হলো। নিমিষেই মা হওয়ার স্বপ্নের শহর বিবর্ণ হলো। সব আনন্দ মাটির নিচে বিলীন হলো। চোখ থেকে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো মেঝেতে। আলভি ফিরেও তাকাল না৷ সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শার্ট খুলে তোয়ালে নিয়ে চলে গেলো ওয়াশরুমের দিকে।
ভার্সিটির প্রথম দিনে। নিষ্পাপ মুখের যে আলভিকে দেখে আমি প্রেমে পরেছিলাম সে আলভির সঙ্গে এই আলভির যেন কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছি না আমি। দু মাস আগে যে আমার হাতে হাত রেখে বলেছিল নিশির আঁধারে
-- এই শক্ত করে ধরলাম হাত। কখনো ছাড়ব না। তোমাকে সুন্দর একটা জীবন দিতে পারবো কিনা জানি না। কিন্তু আমি তোমাকে আমার সবটুকু ভালোবাসা দেব জারা।
এমন কথা শুনেই তো আমি বিয়ের পোষাকে সেই রাতেই তার হাত ধরে পালিয়েছিলাম। আজ তার এমন ব্যাবহার আমার কলিজা যেন হাজার খন্ড করে দিয়েছে।
.
রাতে আলভির সঙ্গে কথা হলো না আমার। একই ছাদের নিচে থাকার পরও কথা হলো না। একই বিছানায় থাকলেও তাকে এড়িয়ে চললাম। অনুরূপ সেও। তার মুখ আর চোখ যেন আমাকে সম্পূর্ণভাবে পরিহার করল৷
পেরিয়ে গেলো দু'টো দিন। শুক্রবার আসতে আর কয়েক ঘন্টা বাকি। ঘুম হলো আমার। এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে বড্ড দোটানায়। আলভি বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমায়। দোটানা আর আলভির একটু আগে বলা কথা আমাকে পুরোপুরি ভাবে গ্রাস করল। ভাবতে হলল আমার নতুন করে। আলভি তৈরি হয়ে আমার চোখে চোখ রেখে বলল
-- তুমি কি চাও আমাদের বাচ্চা একটা খারাপ জীবনযাপন করুক? কষ্টে থাকুক? জারা, আমার স্যালারি সামান্য। এটা নিয়ে বাসা ভাড়া, খাওয়া পড়া এসবই হয় না। বেবি আসলে অনেক খরচ। ওকে আমরা কষ্ট দেবো? আমি কি বাবা না ওর? আমিও চাই আমাদের ঘরে একটা পিচ্চি কেউ আসুক। আমার দু হাতে তাকে স্পর্শ করি। কিন্তু, কিন্তু জারা সে এসে কষ্ট পাবে তার বাবার থেকে এটা আমি কিভাবে মানবো? তখন আমার নিজেকে অপরাধী মনে হবে। প্লিজ জারা। একটু বোঝ? আবেগ দিয়ে বিচার কোরো না। আবেগে সংসার হয় না। বাস্তব অনেক কঠিন। অনেক জারা।
তার এমন জথা আমার বুকে গেঁথে যায়। ভাবি দ্বিতীয় বার। তারপর সিদ্ধান্ত নেই আলভির কথায়। সেও তো বাবা। কষ্ট হলেও নিজেকে শক্ত রাখি। উপস্থিত হই হসপিটালে। অপেক্ষায় বসে থাকি ভেতর থেকে ডাক আসার। একটা সময় ডেকে পাঠানো হয় ডাক্তারের নিকট। ভেতরে ঢুকে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলি। আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালে তিনি কেমনতর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। আমি তাকে জানাই
-- আমার বাবা-মা আমার সাইডে নেই। আমার স্বামী আমার একমাত্র আশ্রয়। আমি তার সিদ্ধান্ত একমত।
ডাক্তার কেবল শান্ত কন্ঠে বলেন
-- মা হওয়া গর্বের কাজ। আর মা হাওয়ায় সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার মিসেস জারা। আপনি কি আপনার সিদ্ধান্তে অটুট?
আমি তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে পারলাম না। ভেতর থেকে অদৃশ্য জড়তা আটকে ধরছিল। ডাক্তার পুনরায় বলেন
-- দশ মিনিট দিলাম আপনাকে। ভাবুন।
এরপর আমাকে রুম থেকে বের করে দেওয়া হলো। বাইরে আসতেই আলভি চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে? আমি জানালাম
-- কিছু না। একটু পর আবার দেখা করতে বলল
আলভি আমাকে হালকা করে জড়িয়ে ধরলো। বলল
-- ভয় পাচ্ছো?
-- উহু
-- কিচ্ছু হবে না। ভয় পেও না।
কথার মাঝে আলভির ফোন বেজে ওঠে। আলভি রিসিভ করে না। অতঃপর নার্স তাকে ডেকে পাঠালে সে চলে যায়। ফেন রেখে যায় ভুল করে আমার নিকট। আমি অপেক্ষায় ছিলাম তার ফিরে আসার। এমন সময়ই দ্বিতীয় বারের মতো ফোন বাজে তার। স্ক্রিনে লেখা ওঠে " মাই লাভ"। চোখদুটো ছানাবড়া হয় যেন আমার। নিশ্বাস আটকে আসে। চোখের পলক ফেলার কথা ভুলে ঢ়াই বেমালুম। হাত পা শীতল হয়ে জমে যায়৷ এরইমাঝে ফোনের রিং বন্ধ হয়। অতঃপর ম্যাসেজ আসে
" হেই? বউয়ের কাছে নাকি? আর ভালো লাগে না। তুমি কবে আমার হবে? বেইবি কবে? তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করছে।"
চৈত্রের শেষ বিকেলের শুষ্কতা যেন বাসা বাঁধে জারার চোখেমুখে। দৃষ্টি ফেরাতে পারে না সে আলভির ফোনের স্ক্রিন থেকে। দলিতমথিত হয়ে যাওয়া হৃদয় নিয়ে সে তাকিয়ে থাকে। কখন যেন চোখ ভরে ওঠে লোনাজলে। ঘোলা হয়ে যায় দৃষ্টি। আকাশ যেন ভেঙে পড়ে তার মাথায়। এমন সময়ই ডেকে ওঠে পেছন থেকে আলভি। বিদ্যুৎ গতিতে চোখের জল হাতের পিঠে মুছে সারা দেয় জারা। আলভির চোখমুখ ভরা রাগে। নিজের মাথার চুল অস্থির ভঙ্গিতে টেনে সে জারাকে বলে
" যাই হয়ে যাক তুমি আমার কথা শুনবে জারা। ডাক্তারের কি আসে যায় বাচ্চা নিয়ে? বুঝলাম না আমি৷"
জারা একটু আগের ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। তবুও চোখে মুখে সজীবতা ফুটিয়ে বলল
" তুমি ভেবো না৷ আমাকে ডাকছে বোধ হয়। আমি ভেতরে যাই।"
আলভির ফোন তার হাতে স্থানান্তর করে দিয়ে জারা ডাক্তারের কক্ষে প্রবেশ করে। হেঁটে যাওয়ার মুহূর্তে সে ফিরে চায় একবার পেছন পানে। আলভির ঠোঁটে মুচকি হাসি। চোখ নিবদ্ধ ফোনে। হাতের আঙ্গুল খেলছে কিবোর্ডকে কেন্দ্র করে। জারা বিমর্ষ হয়ে এলো। কাচ ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়ার মতোই সে গুড়িয়ে যাচ্ছে ভেতর ও বাহির থেকে। হন্টন দশায় ভেবে নিলো জীবন দিয়ে হলেও সে আগলে রাখবে তার অনাগত সন্তানকে।
দশ মিনিট পর আলভির অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে দিয়ে জারা জানালো অপারেশন দু'দিন পর করা হবে। যে কথাটা ছিল নিছকই মিথ্যা। জারা কখনো অপারেশন করাবে না। উপরন্তু সে আলভির ঘনিষ্ঠতা দেখার জন্য তার ভেতরের ঝড়ও প্রকাশ করবে না। আলভি বাচ্চার বিষয়ে জেনে কিছুটা হতাশ হলো যেন। তবে বেশি কিছু প্রকাশ করল না। বাড়ি ফিরতে চাইল জারাকে নিয়ে। পথিমধ্যে তার ফোন বাজে। জারা আড় চোখে পরখ করে বোঝে এটা সেই নারীর ডাক। যে নারী তার ঘরে ঢুকেছে সাপ হয়ে। আবারও দমকে আসতে চায় কান্না। তবে তা খুব কষ্টে দমিয়ে রাখতে হয়। আলভি মাঝপথে সিএনজি থেকে নেমে যায়। জারাকে বাড়িমুখো হতে হয় একাকী। সুযোগ হাত ছাড়া করে না দুঃখরা৷ কষ্ট জারাকে ডাকে হাতছানি দিয়ে। গুমড়ে মরা আর্তনাদ ঠেলেঠুলে বাইরে আসতে চায় যেন। জারা নি:শব্দে কেঁদে যায়। বাসার সামনে সিএনজি এলে সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে লাগে। পেছন থেকে ডেকে ওঠে চালক। অদ্ভুত দৃষ্টিতে জারার পানে তাকিয়ে বলে
" আপনার ব্যাগ।"
জারা ফিরে আসে। ব্যাগ নিয়ে পুনরায় সে ছুটে প্রবেশ করে বাসায়। আলভি ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছিল রাস্তায় বিধায় চালক চলে যায় নিজ গন্তব্যে। জারা ঘরে ফিরে শাড়ির আঁচল মুখে ঠেসে দেয়। চিৎকার গুলো বেরিয়ে আসে। তবে শব্দ হয় ক্ষীণ। গলাকাটা মুরগির মতো তড়পায় জারা। হাতের নিকট থাকা ফুলদানি ছুড়ে ফেলে মেঝেতে। ভেঙে গুড়িয়ে যায় তা। হঠাৎ জারার চোখ পড়ে ওয়ারড্রবের দিকে। সে হন্যে হয়ে ছুটে। পথিমধ্যে থাকা ভাঙা ফুলদানি খচ খচ করে বিঁধে যায় তার পায়ে। তবুও যেন ব্যাথা অনুভব হয় না। প্রিয় পুরুষের বিশ্বাসঘাতকতার কষ্টের কাছে এ কষ্ট যেন বড্ড নগন্য। চারটা ড্রয়ার তোলপাড় করে, কাপড় মেঝেতে ছুড়ে, ছিটিয়েও জারা কোনো হদিস পায় না পরনারীটির। জারা এবার যায় ড্রেসিং এর নিকট। তবে সে হয়তোবা ভুলে গেছে আলভি বোকা নয় এমনকি পরকীয়ায় আসক্ত কোনো পুরুষই বোকা হয় না। পর নারীতে আসক্ত হয়ে ওরা শুধু দক্ষ হয় ঘরের নারীকে বোকা বানাতে। সত্যিই কি দক্ষ হয়? নাকি সুযোগ নেয় নারীর তীব্র ভালোবাসার, কোমলতার।
.
ফাঁকা একটা এপার্টমেন্ট শুনশান। জানালা দিয়ে ছুটে আসা হাওয়া পর্দা দুলিয়ে বিদায় হচ্ছে। লিভিং রুমে বসা আলভি হা হয়ে তাকিয়ে দেখছে চারিপাশ। দামি আসবাবপত্র আর এপার্টমেন্টের মনোমুগ্ধকর নকশায় সে হারিয়ে যাচ্ছে যেন স্বপে। সামনে বসে থাকা মাহা ফোল্ডেবল সোফায় গা এলিয়ে দেয়। ঠোঁটে উদয় হয় তার বাঁকা হাসি। আলভির উদ্দেশ্যে বলে
" এটুকুতেই তুমি এতো খুশি? আমাদের বিয়ের পর আমরা বিদেশে যাবো সপ্তাহে সপ্তাহে। আমাদের প্রাইভেট কার নিয়ে লং ড্রাইভে যাবো অফিস শেষে। শুধু এই এপার্টমেন্ট কেন? পুরো একটা বাড়ি পাবে তুমি। "
চকচক করে ওঠে আলভির দু'চোখ। মাহা আরো বলে
" শুধু কি এগুলো? সঙ্গে তো আমাকেও পাবে তুমি। আচ্ছা বলো তো আলভি কে বেশি সুন্দরী? তোমার বউ নাকি আমি?"
আলভি সেকেন্ড পরিমাণ সময়ও ব্যায় না করে বলে দেয়
" অবশ্যই তুমি। তুমি কি জানো? এই বাড়ি, এপার্টমেন্ট এসবের চাইতে সবচেয়ে বেশি দামি তুমি?"
" যাহ! এতোটাও সুন্দরী নই আমি।"
মাহা লজ্জা পায়। আলভি শব্দ করে হাসে। চোখে মুখে ফুটে ওঠে তার কামনা। বাসনার তাড়নায় এগিয়ে যায় মাহার নিকট। ধপ করে বসে পড়ে ফ্লোরে। মাহার মাথার পেছনে হাত দিয়ে ক্রমশ তার মুখটা এগিয়ে নিতেই মাহা ধাক্কা দেয়। আলভির দেহ সরে মাটিতে লুটিয়ে যায়৷ মাহা তার বুকের ওপর পা রেখে ফিসফিস করে বলে
" আগে বিয়ে তারপর সব। বিয়ের আগে এতো সুযোগ দিলে তুমি ছেড়ে যাবে আমাকে। আমি তো জারা নই আলভি।"
" তুমিই তো বলছিলে আমাকে ছুয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তোমার। "
" ইচ্ছেটা তুলে রাখলাম। এবার বলো বিয়ে করবে কবে?"
" জারা বিদায় হলে।"
" তো বিদায় করছো না কেন?"
" বুঝতে পারছি না কি বলব।"
মাহা রক্তচক্ষুতে তাকায়। আলভি আলগোছে মাহার পা বুকের ওপর থেকে নামিয়ে বলে শান্ত হতে। একটা ব্যাবস্থা সে শীঘ্রই করবে। মাহার মন শান্ত হয় না। আলভি উপায়ন্তর না পেয়ে মাহাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। অতঃপর হাতের ফোনটা নিয়ে জারার নাম্বারে টেক্সট পাঠায়
" আমার বাসায় ফিরতে রাত হবে। "
.
এলোমেলো ভঙ্গিতে মেঝেতে স্তুপ হয়ে ছড়িয়ে থাকা কাপড়ের ওপর মাথা রেখে জারা শয়ন দশায় ফোনের শব্দ শ্রবণ করে। উঠে যাওয়ার শক্তি বা সাধ্য হয় না। পায়ের ক্ষত থেকে গড়িয়ে পরছে রক্ত। খুবই শান্ত গতিতে। মেঝের একাংশ লাল হয়ে গেছে সেই রক্তের ছোপে। নয়ন জল নয়নেই শুকিয়ে যায় জারার। এই শোকে কখন যেন সে বন্ধ করে নিয়েছিল চোখ। এশার আজান বাতাসে বাতাবরণ করলেও তা পৌঁছায় না জারার কানে। আবারও টুং করে শব্দ হয়। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে আলভির দ্বিতীয় ম্যাসেজ।
" আজ ফিরতে পারবো না জারা। অফিসে আছি। প্রচুর কাজ। কাল অফিস করে তারপর বাসায় ফিরব। "
.
ঘুম ছুটে যায় কলিং বেলের ধ্বনিতে। পিটপিট করে চোখ খুলে জারা সন্ধান পায় আঁধারের। খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে এসেছে এক ফালি চাঁদের আলো। সেই আলোয় আবছা দেখে জারা উঠে দাঁড়ায়। কে যেন দরজার ওপাশে অস্থির হয়ে বেল বাজিয়ে যাচ্ছে। জারা ঘরের লাইট জ্বালায় ব্যাথায় জর্জরিত পা নিয়ে। অতঃপর খুব ধীর পায়ে সে এগিয়ে যায় দরজার নিকট। ছিটকিনি খুলে সামনে তাকাতেই দেখা মেলে উপমার। গম্ভীর চোখ মুখ। হাতে ব্যাগ সমেত কালো কোট। পরনে সাদা শাড়ি। জারা সামান্য অবাক হয়। আচমকা উপমার উপস্থিতি তাকে ভরকে দেয়। উপমা জারাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। জারা ব্যাথাতুর শব্দ করে। উপমা আতঙ্ক নিয়ে পিছনে ফেরে। জারা বসে পরেছে মাটিতে। দু'পা ভাজে মুড়িয়ে সে দেখছে ক্ষত। রক্তের ধারা বেড়ে গেছে উপমার ধাক্কায়। উপমা চিৎকার দিয়ে ওঠে আপু বলে। জারা হাত দিয়ে বোঝায় সে ঠিক আছে। উপমা চিৎকার করে।
" কি ঠিক আছিস? কিছুই ঠিক নেই তুই। বারবার বলেছিলাম এই থার্ডক্লাস ছেলেকে বিয়ে করিস না আপু। কিন্তু তুই মা, বাবা, আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এলি। "
" তুই ঠিকানা পেলি কোথায়?"
" জোগাড় করেছি।"
জারা কথা বাড়ায় না। দু মাস পর বেনকে দেখে তার অনুশোচনা বেড়ে পাহাড়সম হয়েছে। উপমা জারাকে দাড় করায়। বেডরুমের আগে একটা ছোট রুমের ন্যায় কক্ষ আছে এখানে। সম্পূর্ণ গল্পটি পেয়ে যাবেন Sneh0 পেইজে সে কক্ষ দরজার নিকট। পুরোটা ফাঁকা। কেবল একটা সিঙ্গেল সোফা আছে। উপমা সেই সোফাতেই বসিয়ে দেয় জারাকে। অতঃপর গভীর কন্ঠে বলে
" আলভি কোথায়?"
জারা ঠাট নিয়ে বলে
" তোর বড় আলভি। সম্মান দিয়ে কথা বল।"
" একজন ল পড়ুয়া স্টুডেন্ট হিসেবে অপরাধীকে সম্মান করলে পুরো ল ডিপার্টমেন্টকে অসম্মান করা হবে। ওর মতো জা*নো*য়া*র কে আমি হাতের কাছে পেলে টুকরো টুকরো করে দেবো বুঝলি?"
এই গল্পের সকল পর্ব এবং আপডেট জানতে "Sneh0" পেইজটাকে ফলো করতে পারেন।
জারা অবাক হয়। ভয় জেঁকে ধরে তাকে। উপমা কি কিছু জেনে গেছে?
জারার ভয়কে জয় করে উপমা নিজের ফোন ঘেটে বের করে একটা ছবি। ঘোলাটে তার দৃশ্য তবুও স্পষ্ট বোঝা যায় আলভি কারো ঠোঁটের স্বাদে মাতোয়ারা হয়ে রয়েছে। জারা এমন দৃশ্য দেখে কেঁপে ওঠে ভেতর থেকে। দপ করে জ্বলে ওঠে বিষাদ বাতি। উপমা উনুনের ন্যায় জলন্ত চোখ নিয়ে বলে
-- আলভি অসম্মানের যোগ্যও নয়। ও তো কুকুর বেড়ালের সমান।
জারা নিশ্চুপ রয়। উপমার সব কথা তার কান অব্দি পৌঁছায় না। উপমা তথ্য জোগাড় করে এনেছে। কাল যখন রাস্তায় সে এমন দৃশ্য দেখেছে তৎক্ষনাৎ সে পিছু নেয় তাদের। জানতে পারে মেয়েটা আলভির অফিসের চেয়ারম্যানের মেয়ে। এক মাসের সম্পর্ক তাদের। মাহা মেয়েটা প্রচন্ড চালাক। হয়তোবা সে আলভির সুদর্শন চেহারায় নজর দিয়েছে। অতঃপর ফাঁদে ফেলে নিজের করতে চাইছে। জারা সমস্ত তথ্য জানার পর মাথায় হাত রাখে। উপমা বোনকে শান্তনা দেওয়া বাণী খুঁজে পায় না। হঠাৎ সে অনুভব করে জারার অন্যরকম পরিবর্তন। উপমা যেহেতু ল ডিপার্টমেন্টের একজন স্টুডেন্ট। তার কাছে নিশ্চয়ই খোঁজ থাকবে ভালো কোনো এডভোকেট অথবা ব্যারিস্টারের।
.
পায়ে পট্টি বেঁধে ঘর গুছিয়ে ঝকঝকে করে জারা তৈরি হলো নতুন পোশাকে। হাত ভর্তি তার কাঁচের চুরিতে। গায়ে জরানো কালো শাড়ি। ঠোঁটে গাড় মেরুন লিপস্টিক। মোহনীয় এক রূপে সে অপেক্ষায় বসে রইলো আলভির বাসায় ফেরার। খাবার টেবিল থেকে সমস্ত প্লেট, বাসন গ্লাস সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আছে জ্বালানো মোম, সতেজ গোলাপের পাপড়ি। খাবার হিসেবে লেবুর জুস সঙ্গে পায়েস, মিষ্টি আর পোলাও, মাংস। আরো আছে বোরহানি, তেহেরী। সবই আলভির ভীষণ প্রিয়। জারা গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে খাবারের পানে। তার হাতের নিকট পরে থাকে গতরাতে আলভির করা দু'টো ম্যাসেজ।
ক্লান্ত আর অবসন্ন দেহ নিয়ে বাসায় ফিরে বিস্মিত হয় আলভি। আলো আঁধারের সন্ধিক্ষণে কে যেন বসে আছে টেবিলে। ঘরময় ফুলের সুবাস। ধীর পায়ে আর শান্ত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক চোখ ঘোরানোর মুহূর্তে দৃষ্টিতে বাঁধা পড়ে মুচকি হাসি ঠোঁটে রাখা জারার পানে। আটকে যায় আলভি সেখানেই। পলক পরে না যেন। জারা চেয়ার থেকে উঠে আসে। পরম যত্নে আলভির হাত থেকে ব্যাগ আর কোট নিয়ে তার বাহুতে মাথা রেখে বুকে হাত রেখে আঁকিবুঁকি করতে করতে মোলায়েম সুরে বলে
" আজকের আয়োজন শুধু তোমার জন্য। কেমন হয়েছে? "
আলভি গাঢ় দৃষ্টিতে তাকায় জারার পানে। কালো শাড়ির রঙ ছাপিয়ে জারার ফর্সাা ত্বক যেন ঝিলমিল করছিল মোমের রক্তিম আলোয়। সে কি উপেক্ষা করতে পারবে আজ জারাকে? চোখের পলকে জারার কোমড় পেচিয়ে ধরে এক হাতে। জারা ছাড়িয়ে নিয়ে নিজেকে। খাবার টেবিলে এগিয়ে গিয়ে বাটি থেকে পায়েস নেয় প্লেটে। মিষ্টি রাখে দু'টো। বলে
"অফিস থেকে এসেছো। আগে কিছু খেয়ে নাও। "
আলভি দ্বিমত করে না। পেটে তার ক্ষুধা। টেবিলে সাজানো খাবার তাকে সত্যিই আকর্ষণ করছে। সে এগিয়ে যায়। জারা চেয়ার টেনে বসার ব্যাবস্থা করে নিজে দাড়িয়ে থাকে পাশে। আলভি দু চামচ পায়েস খেয়ে যেন স্বাদে পাগলপ্রায় হয়। জারার হাতের পায়েস সত্যিই অনন্য। নিজে আরো একটু নেয়। খাওয়া শেষ হলে পানি পান করে সে। অতঃপর জারার নিকে আবারও লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে এক পদ দুপা করে এগিয়ে যায় জারার নিকট। জারার ঠোঁটে রহস্যের হাসি। আলভি যখন জারার খুব নিকটে পৌঁছায় তখন সে কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই মাথা ঘুরে যায় তার। চোখ বুঁজে আসে অলস্যে। হঠাৎই ঢলে পড়ে সে জারার কাঁধে। অতঃপর? অতঃপর জ্ঞানশূন্য। জারা হাসে। রহস্যের হাসি রূপ নেয় লুকিয়ে রাখা কষ্ট ও ক্ষিপ্রতায়। পায়েসে মেশানো ঘুমের ওষুধ সঠিক সময়ে কাজ করেছে। শুধু পায়েস কেন? প্রতিটা খাবারে সে মিশিয়েছিল ঘুমের ওষুধ।
আলভির টলতে থাকা দেহকে মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে জারা নিজের কাজে লেগে পড়ে। পকেট হাতড়িয়ে বের করে আলভির ফোন। অতঃপর আলভির ফিঙ্গার দিয়ে লক খুলে সে প্রথমেই ঢোকে ম্যাসেঞ্জারে। সেখানে পেয়ে যায় মাহাকে। তাদের হাসি, তামাশা আর প্রেমলিলা দেখে নিয়ে গ্যালারি থেকে আলভি ও মাহার রঙ তামাশাভরা ফটো নিজের ফোনে সেন্ড করে। ম্যাসেজের কিছু স্ক্রিনশটও নিয়ে নেয়। অতঃপর হঠাৎ তার মনে হয় একবার কি বাজিয়ে দেখবে মাহা নামক মেয়েটাকে? যদি সে প্রমাণ করতে পারে তারা জারার অনাগত সন্তানকে ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই মেরে ফেলার মতো প্ল্যানে যুক্ত ছিলো তবে কি ওদের শাস্তি দেবে আদালত? ভাবনাটা মনে জায়গা নিতেই জারা ঢিপঢিপ করা বক্ষ নিয়ে কম্পমান হাতে লিখে মাহার হোয়াটসঅ্যাপে
" জারা তো অপারেশন করে ফেলেছে? "
মিনিট দুয়েক গড়িয়ে যেতেই ম্যাসেজ সিন হয়৷ উত্তর আসে ওপাশ থেকে
" কিসের অপারেশন? "
জারা ভাবে। একটু ভাবতেই তার মাথায় আসে মাহা হয়তোবা এ সম্পর্কে অবগত নয়। সে চটজলদি বলে
" আরে কিছু না। বাদ দাও।"
মাত্র গাড়ি থেকে নেমে বাসার গেইটের নিকট গিয়েছিল মাহা। হঠাৎ থমকে দাড়ায় সে। বিষয়টা গোলমাল লাগে তার। কিছু একটা ভেবে মাহা তৎক্ষনাৎ রওনা হয় আলভির বাসার উদ্দেশ্যে। জারা তখন ফোন করে সংগ্রহ করা সব ফটো পাঠিয়ে দেয় উপমার নিকট। একটু পরই হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। জারা চমকে ওঠে। এ-সময়ে কে হতে পারে? দরজা খুলবে না পণ করলেও কলিং বেলের শব্দ থামে না। তা যেন সেকেন্ডের সঙ্গে বাড়তে থাকে। জারা দরজার নিকট এগিয়ে যায়। দরজা খুলতেই দেখা মেলে ফর্মাল ড্রেস পরিহিত এক মেয়ের। মেয়েটাকে প্রথম দেখায় চিনতে পারল না জারা। তবে দৃষ্টি একটু গাঢ় করতেই বুকের খাচার পাখি লাফিয়ে উঠলো। মস্তিষ্ক জানান দিল এই সেই মেয়ে যে জারার আজন্মকালের শত্রু হয়ে উঠেছে।
মাহা কুঁচকানো ভ্রুতে তাকিয়ে থাকে জারার পানে। অতঃপর জিজ্ঞেস করে
" আলভি কোথায়? "
" কেন?"
মাহা জবাব দেয় না। জারার সাজসজ্জা তার মনে সন্দেহের বীজ বপন করে। সে ঘরে ঢোকে জারাকে এড়িয়ে। জারা বাঁধা দিতে চেয়েও যেন পারে না। ঠাঁই দাড়িয়ে থাকে দরজার নিকট। বুকের সঙ্গে দু-হাত আড়াআড়ি ভাবে রেখে সে পরখ করে মাহার আচরণ। মাহা ঘরে আলভির স্থির দেহ দেখে রাগ সমেত ফিরে আসে জারার নিকট। তবে জারা ভীষণ স্বাভাবিক যেন। মাহা দাঁতে দাঁত চেপে বলে
" কি করেছো ওর সঙ্গে তুমি? "
জারা হাসে। মুচকি হাসি দিয়ে সে বিছানার ওপর বসে। পায়ের ওপর পা তুলে হাতে একটা জলন্ত মন নিয়ে জবাব দেয়
" এই ধরো ঠকে যাওয়ার আগেই একটু শক্ত হয়ে পরকীয়া করা পুরুষ কে বিষ খাইয়ে দিয়েছি।"
মাহার চোখেমুখে যেন ঘোর অমাবস্যা নামে। সে দুপা পিছিয়ে যায়। জারা টেবিল থেকে আলভির আধ খাওয়া পায়েস এনে মাহার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে
" খাবে? আলভির এঁটো। ভালোবাসা গাঢ় হবে। খাও খাও। ওপারে গাঢ় ভালোবাসা নিয়ে সুখে থাকবে তোমরা। জারা নামক কাটা থাকবে না।"
মাহা ত্রাসে মেঝেতে পরে যায়৷ জারা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল তার দিকে। মাহা দ্রুত এঘর ছেড়ে একরকম পালিয়ে যায় যেন। জারা তখন শব্দ করে হাসে। মিনিট না গড়াতেই তার হাসি পরিণত হয় কান্নাতে। হাতে থাকা আলভির এঁটো পায়েসের বাটি থেকে ছুড়ে ফেলে অজানা দিকে।
ভোরের প্রথম আলো জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হয়ে সরু রশ্মির আদলে ঘরে প্রবেশ করে। ঝিলিক খেলে আলভির চোখেমুখে। চোখের পাতা খুলে যায় আলভির। তড়াক করে উঠে বসে। মনে করার চেষ্টা করে কেন সে এভাবে ফ্লোরে পরে আছে।
সুধীর হয়ে কিছু সময় ভাবতেই আলভি বুঝে যায় গত রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা। নিজের ফোনটা ছিলো তার পায়ের নিকট। খপ করে ফোন হাতে নিয়ে অস্থির চিত্তে অন করতেই দেখতে পায় মাহার কল। সতেরো বার কল করেছে মাহা। আলভি উঠে দাড়িয়ে ফোন করতে যাবে তখনই চোখ পরে তার সামনে চেয়ারে বসে থাকা জারার পানে৷ এক হাত গালে রেখে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে সে। চোখে শান্ত ভাব কিন্তু যেন ভয়ঙ্কর কিছু রাখা। আলভি থতমত খেয়ে যায়। জারা আস্তে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে পরে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে গোছাতে গোছাতে বলে
" আসি আমি। থানায় দেখা হবে আলভি আহসান। "
কথাটা বলেই মুচকি হাসে জারা। আলভির অন্তরাত্মা লাফিয়ে ওঠে। তড়াক করে সে জারার হাত ধরে। বিনয়ের সুরে বলে
" জারা, না প্লিজ যেও না। আমি এক্সপ্লেইন করছি। তুমি কি জানতে পেরেছো আমাকে বলো। আমি সব উত্তর দিচ্ছি। "
জারা ঝাড়া দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে
" এ টু জেড। সবই জেনেছি। তোমার মতো কা পুরুষের সঙ্গে আমি আর থাকবো না।"
আলভি হাতের ফোন এক আছাড়ে ভেঙে ফেলে। ব্যাগ থেকে অফিসের আইডি কার্ড এনে দেশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার চোখমুখে বাসা বাঁধে রক্তিম আভা। জারা এসব শান্ত ভঙ্গিতে দেখে। আলভি এবার কাতর কন্ঠে জারার চোখে চোখ রেখে বলে
" প্লিজ জারা আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি থাকতে পারবো না। "
জারা প্রতিত্তোরে করে না। আলভি জারার পায়ে পড়ে এবার। চোখে পানি আসে তার। রুদ্ধ হয়ে আসা কন্ঠ নিয়ে বলে
" সাময়িক মোহে না হয় একটা ভুল করেছি জারা৷ ক্ষমা করো প্লিজ। তুমি চলে যাওয়ার কথা বললে আমার নিশ্বাস আটকে আসে। "
জারার চোখে জল জমে। আলভির চোখের পানি তার পায়ের পাতায় পড়তেই বুকে তোলপাড় শুরু হয়। আলভি কথা দেয় সে দ্বিতীয় বার এমন ভুল করবে না। কিন্তু জারা তবুও ব্যাগ নিয়ে দরজার নিকট এগিয়ে গেলে আলভি সামনে দাড়িয়ে ঢাল হয়। জারাকে কোনো ভাবেই সে যেতে দিতে রাজি নয়। আলভির এতো মেহনতের পর জারার মনে বাসা বাঁধে মায়া। রাতে আলভি জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আশ্বাস দেয়, স্বপ্ন দেখায় নতুন জীবনের। তারা চলে যাবে এ শহর ছেড়ে। ছোট বাবুকে নিয়ে ঘর বাঁধবে খুব সুখে। আলভি বলে তাদের ঘরের নাম হবে 'সুখ নীড়'। এমন নাম আর কথা শুনে কোনো রমনীর বুঝি সাধ্য নেই প্রিয় পুরুষকে অবহেলা করার। তার সঙ্গে বিচ্ছেদ টানার। ক্রমশ জারা নরম হয়। আর একটা সুযোগ কি সে দেবে আলভিকে?
.
দিনকাল বেশ গেলো। জারা ঠিকঠাক কথা বলে না আলভির সঙ্গে। তবে আলভি সঙ্গ ছাড়ে না তার। হাজারো উপায়ে মানানোর চেষ্টা করে। দু'দিন পর পরিস্থিতি পরখ করে জারা উপমাকে নিষেধ করে এডভোকেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। উপরন্তু অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ডিভোর্স হয় না। সবকিছু পিছু ফেলে জারা চেষ্টা করলো নতুন ভোরে নতুন করে সংসার গুছিয়ে নিতে। আলভি সেই ভোরে জারার হাত ধরে পাড়ি জমালো নতুন শহরে। বসন্তের বাতাবরণ সেদিন আকাশে বাতাসে। কোকিলের কুহুতান মন গহীনে সুর বোনে। আলভি জারাকে নিয়ে চলে আসে মফস্বলে। বলে এটা তার নিজ গ্রাম। আলভি এতিম হওয়ার তার বাবা ছিল না। আছে শুধু মাটি, ভিটা। সেই ভিটাতে পুরোনো এক বাড়ি। বাড়ির বেছনে প্রায় দীর্ঘ এক জঙ্গলের পথ। শেয়ার ডাক নিশিকে করে ভুতুড়ে। শুনশান নীরব এই বাড়িতে জারার প্রথম রাতে আলভি তাকে চাঁদ দেখাতে নিয়ে যায় বাড়ির উঠোনে। হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা পৌঁছে যায় অজানা কোনো জায়গায়। একটা সময় আলভি স্থির হয়। জারার চোখে চোখ আর কপোলে দুহাত রেখে গাঢ় কন্ঠে বলে
" তুমি অনেক সুন্দর জারা।"
অদ্ভুত সে সুর। জারার কেন জানিনা কেঁপে ওঠে বক্ষ। সাদা শার্ট গায়ে জরানে আলভির মুখের অভিব্যাক্তি তাকে দেখতে দেয় না নিষ্ঠুর নিশি। জারা আলভিকে বুকের সবটুকু ভালোবাসা নিয়ে বলে
" জানো আলভি? কোনো মেয়ে তোমার দিকে নজর দিলে আমি সহ্য করতে পারি৷ কিন্তু আমি ছাড়া তুমি অন্য কারো দিকে তাকালে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি মৃত্যু যন্ত্রণাকে অনুভব করি।"
ম্লান জ্যোৎস্নার আলো ছুয়েছিল জারার বদন। কি মোহনীয় সেউ রূপ। কতটা মায়াবী এই নারী! কিন্তু আফসোস! তার প্রিয় পুরুষের মনে এতোটুকু মায়া হলো না। এতোটুকু দাগ কাটতে পারলো না। জারার বিশ্বাস পায়ে পিষে সে শক্ত লাঠি দিয়ে আঘাত করার ইশারা করে মাহাকে। পেছন থেকে মাহা তৎক্ষনাৎ আঘাত করে। জারা যেন অবাক হয়। তার কল্পনাতে ছিল না এ দৃশ্য। মাথার পেছনে হাত রাখতেই ভেজা কিছু অনুভব হয়। সে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে আঁধারের মাঝে আলভির পানে। আলভি তাকে ছেড়ে শক্ত করে হাত ধরে মাহার। বলে
" মাত্র জীবন শুরু করছি জারা। এভাবে নষ্ট করার প্ল্যান না করলেও পারতে। এইসব জেল, পুলিশ, কোর্ট জাস্ট বিরক্তিকর। এতোগুলা মানুষের দৌড়াদৌড়ির চাইতে ভালো একটা মানুষ নীরবে শেষ হয়ে যাওয়া। "
চোখের কোণে জল চিকচিক করে জারার। সীমাহীন কষ্ট তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে। ধুপ করে পড়ে যায় সে মাটিতে। আলভি মাহার হাতটা ধরে পেছন পথ ধরে। জারা শান্ত চোখে চাঁদের আধো আলোয় সে দৃশ্য দেখে কাতর হয়ে। কানে বাজে মাহার কন্ঠ
" শেয়াল কুকুর এসে এক রাতেই একে শেষ করবে হাহাহাহা"
মাহা কথাটা বলার পরই কিছু গড়িয়ে যাওয়ার আওয়াজ হয়। তারা পেছন ফিরে চায়। জারার অবচেতন দেহ গড়িয়ে পরে কোনো খাদে। তারা যেন খুশি হয় আরো বেশি।
.
চাঁদের মলিন আলোয় জঙ্গলের পথটা যেন কোনো অতিপ্রাকৃত জগতে ঢুকে পড়েছে। উঁচু-নিচু, সংকীর্ণ রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে একটা প্রাইভেট কার। তার হেডলাইটের আলোয় চারপাশের গাছপালার ছায়াগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে—লম্বা, আঁকাবাঁকা আঙুলের মতো এগিয়ে আসছে অন্ধকার থেকে। ইউভানের বুকে আচমা ব্যাথা হয়। অদ্ভুত সে ব্যাথা। পাঁচ বছর পূর্বের ন্যায় স্বাদ এই ব্যাথার। সামনে থেকে ছুটে আসে একটা দমা হাওয়া। তা গাড়ির কাঁচে এসেই নিশ্বেস হয়ে যায়। ইউভান থমকে দাড়ায়। আচমকা ব্রেক কষে থামিয়ে নেয় গাড়ি। পাশে বসা আমাদের কপাল ঠাস করে এসে বাড়ি খায় সামনে ঝুলে। ঘুমে জড়িয়ে আসা চোখ খোলে সে তড়িৎ গতিতে। সামনে থেকে চশমা নিয়ে চোখে দেয় দ্রুত। অতঃপর ইউভানের পানে তাকিয়ে শুধায়
" কি হয়েছে স্যর?"
ইউভান মাথা নাড়ায় হালকা। বাম থেকে ডানে। আমাদ তার অর্থ খুঁজে পায় না। তবে ভাবতেও বসে না৷ ইউভানের কিছু কিছু কথা বা আচরণের অর্থ সে উদ্ধার করতে পারে না ঘন্টার পর ঘন্টা ভেবেও। ইউভান গাড়ির কাচ নামিয়ে হাওয়া অনুভব করে। চতুর দৃষ্টিতে কিছু খুঁজে বেড়ায় সে। অতঃপর হঠাৎই দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে লাগে অজানা দিলে। আমাদও পিছু নেয়। ইউভানকে বিরবির করে বলতে শোনা যায়
" এখানেই আছে। আশেপাশেই আছে৷ হ্যা এখানেই। "
আমাদ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে
" কি আছে এখানে? "
ইউভান আলতো করে হাত রেখে বলে
" আমার হৃদয়ের একাংশ।"
.
জারাকে গত রাত থেকে ফোন করে যাচ্ছে উপমা কিন্তু কোনো সারা নেই। এমনকি অতিরিক্ত ফোন করার কারণে এখন একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসছে। বলা হচ্ছে ফেন সুইচ অফ। উপমা অস্থির হয়ে ওঠে। ভয়ে বাবা-মা কে কিছু জানায় না। এমনকি এটাও জানায়নি যে আলভি বিপথে চলে গিয়েছিল। উপমা ঠিক করে সে পুলিশে রিপোর্ট করে নয়তো কোনো এডভোকেট সঙ্গে কথা বলবে। তার আগে সে আলভিকেও ফোন করল কিন্তু সারা পাওয়া গেলো না। বন্ধু বান্ধবদের এবিষয়ে জানিয়ে বুদ্ধি চাইলে ওরা বলল ব্যারিস্টারের সঙ্গে আলোচনা করতে। শহরে এক নতুন ব্যারিস্টার এসেছে। উনি পাঁচ মাসে মাত্র পাঁচটা কেইস লড়েছেন। আর পাঁচটাতেই জিতেছেন। কোনোভাবে তাকে রাজি করাতে পারলে বিষয়টা দ্রুত সমাধান হওয়া সম্ভব। উপমা নিশ্চিত জারা বড়সড় বিপদে আছে। তাই সকাল হতেই সে উপস্থিত এক প্রতিষ্ঠানে। যে প্রতিষ্ঠানে আছে নামকরা সেই ব্যারিস্টার। অ্যাডভেকেটের সঙ্গে কথা বলে সে অপেক্ষায় থাকে 'ইউভান' লিখে দরজার ঝুলিয়ে রাখা নেমপ্লেটের সামনে। বুক তার দুরুদুরু করছে। শুনেছে উনি অদ্ভুত কিসিমে’র। ওনার যদি পছন্দ হয় তবেই সেই ঝামেলা সমাধান করতে রাজি হন।

Post a Comment

0 Comments