গোধূলি_সংকেত

গোধূলি_সংকেত

 এই পরিবারের একসাথে খাওয়ার দাওয়াতেই আমার মা আমার স্বামীকে সবার সামনে বলেছিলেন, "যাও, আগে তোমার দুলাভাইকে এক গ্লাস পানি এনে দাও। গরিবের কাজই তো সেবা করা!" আমি ভেবেছিলাম, আমার স্বামী হয়তো অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখান থেকেই চলে যাবে। কিন্তু সে এরপর যা করেছিল, তা দেখে ঘরে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর আমার মা... তিনি লজ্জায় মাথা তুলেও তাকাতে পারেননি!

আমার স্বামীর নাম সাদমান। সে কোনো বড় ব্যবসায়ী নয়, কোটি টাকার মালিকও নয়। খুব সাধারণ একটা চাকরি করে। মাস শেষে যা বেতন পায়, সেটা দিয়েই সংসার চালায়। কিন্তু মানুষ হিসেবে ওর মতো সৎ, ভদ্র, দায়িত্ববান আর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি।
সাদমান যখন আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, আমি ওর ব্যাংক ব্যালেন্স দেখিনি। আমি দেখেছিলাম একজন মানুষকে, যার পাশে দাঁড়ালে সারাজীবন নিরাপদ থাকা যায়।
কিন্তু আমার মা কখনো সেভাবে ভাবতে পারেননি।
মায়ের কাছে মানুষের মূল্য মানেই টাকা। কার বাড়ি কত বড়, কার গাড়ি কত দামী, কার হাতে কত সম্পদ—এসব দিয়েই তিনি মানুষ বিচার করতেন।
আর সেই কারণেই আমাদের পরিবারে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিল আমার বড় আপার স্বামী, রায়হান।
রায়হানের নিজের ব্যবসা আছে। ভালো বাড়ি, দামি গাড়ি, টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই। মা সবসময় তাকে নিয়েই গর্ব করতেন। আর সেই তুলনায় সাদমানকে যেন কখনোই মানুষ বলেই মনে করতেন না।
আমাদের বিয়েতেও মা প্রথমে রাজি হননি। অনেক অনুরোধ, অনেক বোঝানোর পর শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু মন থেকে কোনোদিনও আমাকে ক্ষমা করেননি। আর সাদমানকেও জামাই হিসেবে মেনে নিতে পারেননি।
বিয়ের পর যতবারই মায়ের বাড়িতে গেছি, ততবারই কোনো না কোনোভাবে সাদমানকে ছোট করার চেষ্টা হয়েছে।
মা সুযোগ পেলেই বলতেন,
— "দেখেছিস? রায়হান এই ঈদে তোর আপাকে কত সুন্দর স্বর্ণের বালা দিয়েছে!"
আবার কখনো বলতেন,
— "ওরা কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন ঘুরে এলো। জীবন বলতে এটাকেই বলে। শুধু ঘরে বসে থাকলে তো সংসার চলে, জীবন চলে না।"
প্রতিবারই আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকতাম।
আর সাদমান?
সে শুধু হালকা করে হাসত।
খুব শান্ত গলায় বলত,
— "দোয়া করবেন আম্মা। আল্লাহ যদি সামর্থ্য দেন, একদিন আমিও আমার স্ত্রীকে তার প্রাপ্য সব সুখ দেওয়ার চেষ্টা করব।"
মা তখন ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিতেন,
— "আগে নিজের অবস্থা ঠিক করো, তারপর বড় বড় কথা বলো।"
প্রতিটি কথাই আমার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধত।
অনেকবার মাকে বলেছি,
— "আম্মা, এসব বলবেন না। আমরা ভালো আছি। টাকার অভাব থাকলেও সম্মানের অভাব নেই।"
কিন্তু মা কখনো শুনতেন না।
বরং বলতেন,
— "এখন বুঝবি না। একদিন অভাব যখন দরজায় কড়া নাড়বে, তখন আমার কথাই মনে পড়বে।"
এইভাবেই বছরের পর বছর কেটে গেছে।
প্রতিটি পারিবারিক অনুষ্ঠান, প্রতিটি দাওয়াত, প্রতিটি ঈদ—সব জায়গাতেই একই অপমান, একই তুলনা।
আমি দেখতাম, সাদমান সবকিছু নীরবে সহ্য করছে।
আমার জন্য।
শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তার আত্মসম্মান বারবার আঘাত পেলেও সে কখনো কাউকে অসম্মান করেনি।
অবশেষে সেই দিনটা এল।
মা বড় করে দুপুরের খাবারের আয়োজন করলেন।
সব খালা, মামা, চাচাতো-ফুফাতো আত্মীয়—প্রায় সবাই এসেছে।
দাওয়াতটা যেন বিশেষভাবে আয়োজন করা হয়েছে রায়হান আর আমার বড় আপাকে ঘিরেই।
আমরা যখন পৌঁছালাম, খুব সাধারণ পোশাক পরে গিয়েছিলাম।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কিন্তু একেবারেই সাধারণ।
অন্যদিকে রায়হান আর আপা যেন বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছে। আপার হাতে ভারী স্বর্ণের গয়না, দুজনের পোশাকেও ছিল আভিজাত্যের ছাপ।
মা শুরু থেকেই সবাইকে শোনাচ্ছিলেন,
— "এই আয়োজনের অনেকটাই রায়হানের সাহায্যে হয়েছে। ও না থাকলে এত কিছু করা সম্ভব হতো না।"
এরপর একটার পর একটা গল্প।
কখন কী কিনে দিয়েছে, কোথায় নিয়ে গেছে, কত টাকা খরচ করেছে...
আত্মীয়রাও আগ্রহ নিয়ে শুনছিল।
বড় আপার মুখে তখন গর্বের হাসি।
রায়হানও এমনভাবে বসেছিল, যেন পুরো ঘরের কেন্দ্রবিন্দুই সে।
আমি চুপচাপ বসে ছিলাম।
মাথা নিচু করে।
মনে হচ্ছিল, প্রতিটি কথা যেন আমার স্বামীর দিকে ছুড়ে মারা হচ্ছে।
তবুও সাদমান শান্ত।
একবারও কোনো বিরক্তির চিহ্ন নেই তার মুখে।
হঠাৎ খাওয়ার মাঝখানে রায়হান বলল,
— "পানিটা শেষ হয়ে গেছে। আমি উঠে নিয়ে আসি।"
আমার বড় আপা তাড়াতাড়ি বলল,
— "না, তুমি বসো। আমি এনে দিচ্ছি।"
রায়হান তার হাত ধরে হেসে বলল,
— "থাক, আমি নিয়ে আসছি।"
ঠিক তখনই মা দ্রুত বলে উঠলেন,
— "না না, তোমাদের কেউ উঠবে না। তোমরা বসে খাও। সারাদিন এত কষ্ট করো, একটু আরাম করো।"
এরপর হঠাৎ তিনি পানির জগটা হাতে তুলে নিয়ে সোজা সাদমানের দিকে তাকালেন।
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি।
চারপাশের সবাই স্পষ্ট শুনতে পেল।
মা বললেন,
— "এই সাদমান, তুমি যাও। রায়হানকে এক গ্লাস পানি এনে দাও। গরিব মানুষের কাজই তো সেবা করা!"
কথাটা বলেই তিনি এমনভাবে হেসে উঠলেন, যেন খুব মজার একটা কথা বলেছেন।
কয়েকজন আত্মীয়ও অস্বস্তিকর হাসি হাসল।
আমার মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
রাগে, অপমানে, লজ্জায় পুরো শরীর কাঁপছিল।
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম।
ভাবছিলাম, আজ আর এক মুহূর্তও এখানে থাকব না।
কিন্তু ঠিক তখনই সাদমান শক্ত করে আমার হাতটা ধরে ফেলল।
আমি তার দিকে তাকালাম।
চোখে আমার পানি জমে গেছে।
আর তার মুখে...
অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি।
সেই হাসিতে অপমানের কোনো চিহ্ন ছিল না।
সে খুব ধীরে উঠে দাঁড়াল।
এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াল, যেন কেউ তাকে ছোট করতে পারেনি।
আর তারপর...
সে এমন একটা কাজ করল, যার জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সবাই অবাক হয়ে শুধু তার দিকেই তাকিয়ে রইল।
আর আমার মা...
তিনি যেন মুহূর্তের মধ্যেই পাথর হয়ে গেলেন।
মুখে কোনো কথা নেই।
চোখ তুলে তাকানোর সাহসটুকুও যেন হারিয়ে ফেললেন।

Post a Comment

0 Comments