গল্পঃঅক্ষর

গল্পঃঅক্ষর


আমি কোনো কথা না বলে মোবাইল বের করলাম।
হোয়াটসঅ্যাপের সেই স্ক্রিনশট খুলে মেহরীনের সামনে ধরলাম।
শান্ত গলায় বললাম,
— আমি ভুল বুঝিনি। এই কথাগুলো কার? এই সন্তানের বাবা কে? কতদিন ধরে রাশেদের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক? সত্যিটা বলো। আমাকে আর মিথ্যা বোলো না।
মেয়েটার মুখ মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল।
সে কাঁপতে কাঁপতে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
এক হাত দিয়ে নিজের পেটটা আড়াল করে বলল,
— আপা, বিশ্বাস করুন... উনিই আমাকে এই সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। প্রায় এক বছর হলো আমাদের গোপনে বিয়ে হয়েছে। উনি সবসময় বলতেন, একটা সন্তানের জন্য তিনি খুব কষ্ট পান। তারপর যখন আমি গত মাসে জানতে পারলাম আমি মা হতে চলেছি, উনি বলেছিলেন সবকিছু ঠিক করে আপনাকে জানাবেন।
সে একটু থেমে আবার বলল,
— কাল হাসপাতালে আপনার রক্তক্ষরণের পর উনি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। ডাক্তার নাকি বলেছিলেন, এটা বড় কোনো রোগের লক্ষণ নয়, মানসিক ধাক্কা বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণেও এমন হতে পারে। তখন থেকেই উনি ভয় পাচ্ছিলেন, আপনি হয়তো সব জেনে গেছেন। আবার আমার গর্ভের সন্তান নিয়েও খুব চিন্তায় ছিলেন।
তার কথা শেষ হতেই আমার অদ্ভুতভাবে হাসি পেয়ে গেল।
সেই হাসির মধ্যে আনন্দ ছিল না।
ছিল অপমান, যন্ত্রণা আর নিজের ওপর ভেঙে পড়া বিশ্বাসের শব্দ।
তাহলে আমার শরীর আগেই বুঝে গিয়েছিল, আমার জীবনে কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে।
যে মানুষটাকে আমি এতদিন নিজের সবকিছু ভেবেছি, তার ভয়টা আমার জন্য ছিল না।
ছিল অন্য এক নারীর গর্ভে বেড়ে ওঠা সন্তানের জন্য।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
মেহরীনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম,
— তোমার জন্য আমার কোনো অভিশাপ নেই। শুধু একটা কথা মনে রেখো, যে মানুষ একবার নিজের সবচেয়ে আপন মানুষটাকে ঠকাতে পারে, সে আবারও পারবে। বিশ্বাস ভাঙার অভ্যাস যার আছে, সে একদিন না একদিন সবার বিশ্বাসই ভাঙে।
কথা শেষ করে অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম।
চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল।
তবুও মাথাটা নিচু করিনি।
একটা সিএনজি নিয়ে সোজা বাসায় ফিরলাম।
দরজা খুলতেই দেখি রাশেদ ড্রয়িংরুমে অস্থির হয়ে হাঁটাহাঁটি করছে।
আমাকে দেখেই ছুটে এলো।
— কোথায় ছিলে? আমি যেই ডাক্তারের কথা বলেছিলে, সেখানে ফোন করেছি। তারা বলেছে তুমি যাওনি। কোথায় গিয়েছিলে?
আমি ব্যাগটা মেঝেতে রেখে তার দিকে তাকালাম।
শান্ত অথচ কঠিন কণ্ঠে বললাম,
— আমি মেহরীনের কাছে গিয়েছিলাম। তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী... আর তোমাদের অনাগত সন্তানের মায়ের কাছে।
আমার কথা শুনে রাশেদ যেন পাথর হয়ে গেল।
মুখের সব রং উধাও হয়ে গেল।
অনেক কষ্টে বলল,
— নাদিয়া... আমি... আমি সব বুঝিয়ে বলতে পারব।
আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না।
বুকের ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট একসঙ্গে বেরিয়ে এলো।
— কী বুঝাবে? যে বিশ বছরের সংসারকে তুমি এক মুহূর্তে ভেঙে দিলে? যে আমি তোমার সঙ্গে সুখে-দুঃখে থেকেছি, সন্তান না হওয়ার কষ্ট ভাগ করে নিয়েছি, আর তুমি আমার অজান্তে আরেকটা সংসার গড়ে তুলেছ? হাসপাতালে আমার চোখের সামনে তুমি কেঁদেছিলে, অথচ সেই কান্নাও আমার জন্য ছিল না!
রাশেদ কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে এগিয়ে এলো।
আমার দুই কাঁধ ধরতে গিয়ে বলল,
— আমি তোমাকেই ভালোবাসি। তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ। আমি ভুল করেছি। একটা সন্তানের লোভে শয়তানের ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি সব শেষ করে দেব। ওকে ছেড়ে দেব। শুধু তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।
আমি তার হাত সরিয়ে দিলাম।
ঘৃণায় আমার শরীর কেঁপে উঠছিল।
— আজ তুমি তাকে ছেড়ে দিতে চাও, কাল হয়তো আরেকজনকে ছেড়ে দিতে চাইবে। যে মানুষ নিজের সুবিধার জন্য একজন মানুষকে ব্যবহার করতে পারে, সে কাউকেই সত্যিকারের ভালোবাসে না।
আমি শোবার ঘরে ঢুকে আলমারি খুললাম।
একটা বড় ব্যাগ বের করে নিজের কাপড়চোপড় আর দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিতে শুরু করলাম।
রাশেদ পেছন পেছন এসে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল।
— প্লিজ, সংসারটা ভেঙে দিও না। মানুষ কী বলবে? তোমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন... সবাই জানলে আমি মুখ দেখাব কীভাবে?
আমি ব্যাগের চেইন টেনে বন্ধ করলাম।
তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— এখনও তোমার চিন্তা শুধু মানুষ কী বলবে? আমার ভাঙা জীবনটা নিয়ে তোমার কোনো আফসোস নেই?
আমি আরও দৃঢ় গলায় বললাম,
— এই ফ্ল্যাট আমার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির টাকায় কেনা। তুমি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এখান থেকে চলে যাবে। এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে বিচ্ছেদের কাগজ পাঠিয়ে দেবে। যদি না দাও, তাহলে আমি আইনের আশ্রয় নেব। সত্যিটা লুকিয়ে রাখব না।
ব্যাগটা হাতে তুলে নিলাম।
একবার চারপাশে তাকালাম।
এই ঘরেই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো ছিল।
আজ সেই ঘরটাই আমার কাছে অচেনা।
রাশেদের দিকে শেষবারের মতো তাকালাম।
যে মানুষটাকে একসময় ছাড়া একটা দিনও কল্পনা করতে পারতাম না, আজ তার সঙ্গে একই ছাদের নিচে এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছিল না।
আমি দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম।
মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু একটু করে হালকা হচ্ছে।
শরীরও যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছিল।
হয়তো সত্যিটা জেনে যাওয়ার পর আমার ভেতরের দীর্ঘদিনের অস্থিরতাও ভেঙে পড়েছিল।
আমি সোজা বড় ভাইয়ের বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম।
সামনের পথটা সহজ হবে না, সেটা আমি জানতাম।
তবু মাথা উঁচু করে বাঁচার সাহস, মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
সেদিনই বুঝেছিলাম—
এটা আমার জীবনের শেষ নয়।
বরং নতুন করে বেঁচে ওঠার শুরু।

Post a Comment

0 Comments