'আমি যখনই অসুস্থ হতাম শাশুড়ি মা আমাকে আমার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। আমাদের বিয়ের বয়স ছয় বছর। চার বছরের একটা মেয়েও আছে। গত ছয় বছর যাবত খেয়াল করে দেখেছি যখনই আমি কিংবা আমার মেয়ে অসুস্থ হতাম, শাশুড়ি মা আমাদের আমার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। সুস্থ হলেই আবার আসতে বলতেন। বিষয়টা এমন না যে, আমার যাতে দেখাশুনা উত্তম হয় সে কারণে তিনি আমাকে বাবার বাড়ি পাঠাতেন। আসলে তিনি আমার অসুস্থতা নামক উটকো ঝামেলা নিজের কাঁধে নিতে চাইতেন না। আমি ঘরে অসুস্থ হয়ে থাকলে ঘরের সব কাজ তো তাকে করতে হতোই, সাথে আমার মেয়ের এবং আমার দেখভালও তাকে করতে হতো। এই প্যারা তিনি নিতে চাইতেন না।'
খুশি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'আপু, আপনার স্বামী কী করেন? মানে সে-ও তো আপনাদের খেয়াল রাখতে পারে বা তার মায়ের এমন কাজে বাধা দিতে পারতেন। নাকি তিনি...! মানে বুঝতেই পারছেন কী বুঝাতে চাচ্ছি।'
তনু খানিক হেসে বলল, 'না না আপু, তেমন কিছু না। আমার স্বামী জায়েদ খুবই ভালো মানুষ। আমাকেও খুব ভালোবাসে যত্ন করে। ও ওর মাকেও খুব ভালোবাসে। তবে তার অন্যায় কথার প্রতিবাদ ও সবসময় করতে পারে না।
আসলে সবসময় তো সব কথা বলতে পারে না। মাঝে মাঝে চেয়েও কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় না। কিছু সময় চুপ করে থাকা ছাড়া, করার মতো, বলার মতো কিছু থাকে না। আর সবচেয়ে বড়ো বিষয় হচ্ছে শাশুড়ি মা যে আমার সাথে এমনটা করেন তা আমি সহজে কখনো জায়েদকে বলি না।'
'কেন বলেন না?'
'ইচ্ছা করেই বলি না। ও ওর মাকে খুব ভালোবাসে। মা ছেলের মধ্যে কোনো ঝামেলা হোক তা আমি চাই না। আমি সেদিন জায়েদের জীবনে এসে নিশ্চয়ই ওর জন্মদাত্রী মাকে ওর থেকে দূর করতে পারি না? সেটা অন্যায়, মস্ত বড়ো পাপ।'
'হ্যাঁ, আপনার কথা সত্যি। তাই বলে অন্যায় মুখ বুঝে সহ্য করবেন?'
'আমার হয়ে জায়েদ তো ওর মাকে বলে। ও কাছে থাকলে শাশুড়ি মা আমাকে কষ্টও দিতে পারেন না।'
'তিনি কোথায় থাকেন?'
'জায়েদ চাকরি করেন সেই সুদূর চট্টগ্রামে। কয়েক মাস পর পর বাড়িতে আসেন। ও চাইলেও আমার অসুস্থতায় খেয়াল রাখা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। দূরে থাকার সুযোগ নিয়ে তার মা তাকে সবসময় তাকে এটা বুঝাতে চায় অসুস্থ হলে আমার সেবাযত্ন বাবার বাসায় ভালো হবে। তিনি বুড়ো মানুষ আমার দেখাশোনা ঠিকভাবে করতে পারবেন না। আমি আমার মায়ের কাছে ভালো থাকব।
জায়েদ সরল মনে তার কথা মেনে নিত। আসলে ও যে বুঝত না তেমন না। আমার ভালোর জন্য আর মায়ের মন রাখার জন্য বুঝেও চুপ থাকত। তাছাড়া ও ভাবত সত্যি বাবার বাড়ি থাকলে আমি ভালো থাকব। যেটা আসলেও সত্যি। মায়ের মতো যত্ন কে-ই বা করতে পারে। ও আমার ভালোটা ভেবে ওর মায়ের কথা মেনে নিত।
তবে শাশুড়ি মায়ের কথা শুনে আমার তখন তাকে মুখ ফুটে খুব বলতে ইচ্ছা করত, আপনিও তো আমার মা। আমার মা যেমন আমার অসুস্থতায় আমার দেখাশোনা করেন, আপনিও মাঝে মাঝে করতে পারেন। আমি তো আপনার অসুস্থতায় সবসময় আপনার সেবা যত্ন করি। বিয়ের পর এত বছরে যতবার আপনি অসুস্থ হয়েছে নিজের সবটা দিয়ে আপনার সেবা করেছি। কই আপনি তো কখনো আমার অসুস্থতায় আমার যত্ন নেন না।
আমার তো দূরের কথা আমার বাচ্চা মেয়েটার কিছু হলেও একটু দেখাশোনা করেন না, আমার কাজে একটু হেল্প করেন না, কিন্তু অনেক কিছু চিন্তা করে চুপ হয়ে থাকি সর্বদা। ভাবি, কী দরকার সংসারে বাড়তি ঝামেলা করার?
এবার ঈদে জায়েদ বাড়িতে আসলো। বাড়িতে তখন প্রচুর কাজের চাপ। তাছাড়া দ্বিতীয়বারের মতো আমি কনসিভ করেছিলাম। ছয় মাস চলছিল। শরীরটা বেশ ভারী ছিল। কাজ করতে বেশ কষ্টই হয়। তা-ও সব কাজ করার চেষ্টা করতাম। ঝিলিক মানে আমার মেয়েটাও জ্বর বাধিয়ে ফেলেছিল।
ঘরের এত কাজ আর অতিথি আপ্যায়ন করতে গিয়ে আমার শরীরটাও বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। প্রচণ্ড জ্বর উঠে বিছানা থেকে উঠার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলি। জায়েদ আমার বেশ দেখাশোনা করতে লাগল, কিন্তু শাশুড়ি মায়ের বিষয়টা হজম হলো না। তিনি আমার সাথে বেশ চিল্লাপাল্লা শুরু করলেন। তার কথার ধরণগুলো ঠিক এমন।
'বলি তোমার কি কান্ড জ্ঞান মোটেও নেই? ঘরে এত মেহমান, তার মধ্যে জায়েদ চার মাস পর বাড়ি আসল আর তুমি অসুখ বাঁধিয়ে শুয়ে আছো? এখন স্বামীকে দিয়ে সেবা করানোর মতো পাপ করছ?
তোমাদের এত নরম শরীর। বাচ্চা আমাদেরও হয়েছে। আমরাও বাচ্চা পেটে নিয়ে দুনিয়ার কাজ করেছি। ঢেঁকিতে পাড় পর্যন্ত দিয়েছি। তোমাদের মতো দিন দিন অসুস্থ হবার বাহানা করিনি। যা-ই হোক তোমার ভাইকে ফোন করে তোমাকে নিয়ে যেতে বলো। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে।'
জায়েদ ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
'তার প্রয়োজন নেই, মা। আমি আছি ওর দেখাশুনা করার জন্য। তাদের ঠ্যাকা পরেনি আমার স্ত্রী অসুস্থতায় তারাই কেবল সবসময় দেখাশুনা করবে।'
শাশুড়ি বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন,
'তাদের মেয়ের দেখাশোনা তারা না করলে কে করবে?'
জায়েদ বেশ শক্ত কন্ঠেই বলল,
'তাদের মেয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব তাদের ততদিন ছিল যতদিন মেয়ে অবিবাহিত ছিল; এখন না। এখন যেটুকু দেখাশোনা করছেন সেটা তাদের মহত্ত্ব।'
তার কথার উপর শাশুড়ি আর কিছু বললেন না। রাগ করে চলে গেলেন। আমি কিছুই বললাম না। আসলে অসুস্থ ক্লান্ত শরীরটা কথা বলার অনুমতি দিচ্ছিল না। জায়েদ চুপ করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। জায়েদের হাতটা টেনে নিয়ে আমি জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে রইলাম।
জায়েদ আমার কাছে এসে বলল, 'বেশি খারাপ লাগছে?'
'হুঁ।'
'কিছু খাবে?'
'উহু।'
'সরি।'
'কেন?'
'যে সময় তোমার পাশে থাকা দরকার তখনই থাকতে পারছি না।'
'আমি চুপ করে ওর বুকে মুখ গুজলাম।'
জায়েদ পেটে হাত দিয়ে বলল,
'এবার তো কম ছুটি নিয়েছি। তিনদিন পর চলে যাব। তবে দুই মাস পর মানে কোরবানীর আগে লম্বা ছুটি নিয়ে আসার চেষ্টা করব। তখন তো তোমার ডেলিভারি ডেটও। তবে কাল তোমাকে তোমার বাবার বাসায় দিয়ে যাব। বাবুর জন্ম হওয়া পর্যন্ত বাকি কয়টা মাস সেখানেই থাকবে।'
আমি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। গত কদিন যাবত শরীরটা সঙ্গ দিচ্ছে না। কাজ করতে কষ্ট হয়, ক্লান্ত লাগে খুব। আমি জানি প্রেগনেন্ট অবস্থায় পরিশ্রম করা ভালো, কিন্তু এত পরিশ্রম আমার বাচ্চাটার জন্য হয়তো হানিকর।
তবে এ কথা শাশুড়ি মাকে কে বোঝাবে? তিনি তো পারলে আরও কাজ বাড়িয়ে দেন।
ননদ যখন প্রেগনেন্ট ছিল, তখন শাশুড়ি শুরু থেকে নিজের কাছে এনে রেখেছিলেন। টানা এক বছর ননদ আমার শ্বশুর বাড়ি ছিল। আমার মা-ও বলেছিলেন আমাকে কাছে রাখবেন, কিন্তু শাশুড়ি রাজি হননি।
মানুষ একজন কিন্তু তার বিবেক দুই জায়গায় দুই রকম কাজ করে। জায়েদ অবশ্য বলেছিল আমার মায়ের কাছে থাকতে, কিন্তু আমি যাইনি মূলত জায়েদের জন্য। কারণ জায়েদ ছুটিতে আমার বাড়ি আসবে নাকি ওর বাড়ি যাবে এ কারণে।
কদিন-ই বা ছুটি পায়। সে কদিন বাড়ি থেকে বিভিন্ন কাজ করার সাথে সাথে নিজেও একটু রিলাক্স থাকতে চায়। তাছাড়া আমি আর মেয়েটা না থাকলে বাড়ি আসতেও চায় না।
আমাদের বাড়ি যে রিলাক্সে থাকতে পারবে না তা নয়, তবে ওর বাবার ভাষ্য মতে শ্বশুর বাড়ি বারবার যাওয়া ঠিক না। আর বেড়াতে গেলে তিন দিনের বেশি থাকা ঠিক না। সম্মান নাকি কমে যায়।
আমি জানি না এমন ফালতু লজিক কে আবিষ্কার করছে? তবে যে-ই করছে সে প্রচণ্ড নীচু চিন্তার মানুষ ছিল।
আমার খালাতো বোনের স্বামীকে দেখি প্রায়ই খালার বাসায় বেড়াতে আসে, বেশ কদিন বেড়ায়। তাদের সাথে এমনভাবে থাকে যেন ঘরের বড়ো ছেলে। খালা জামাইকে নিয়ে কত গর্ব করে! খুব গর্ব করে বলেন, জামাই না ছেলে পেয়েছি। তারা তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়। তাকে প্রচুর সম্মান করে। ভাইয়াকে দেখি আপুর এত এত যত্ন করে।
আমরা অনেকেই খালাকে বা খালাতো বোনটাকে হিংসা করি। কারণ রিপন ভাইয়া যেমন ভালো ছেলে তেমন ভালো জামাই তেমন ভালো স্বামী। সে যা-ই হোক খালাতো বোনের সংসারের মতো তো আমার চলবে না। তার স্বামী সংসার সব ভালো। সে ভালো আছে, দোয়া করি ভালো থাকুক। জায়েদও ভালো স্বামী, ভালো বাবা, ভালো জামাই। তবে সমাজের কিছু ফালতু নিয়ম কানুন ওর মস্তিষ্কে সেট হয়ে গেছে।
পরের দিন সকালে জায়েদ আমাকে বাবার বাড়ি দিয়ে আসার কথা বললে মা বেশ রাগ করে বললেন,
'এখন তো কেবল ছয় মাস চলে। এত তাড়াতাড়ি ওদের বাড়ি গিয়ে কী করবে? নয় মাসে পড়ুক তখন যাবে। ও চলে গেলে আমি ঘর একা সামলাবো কী করে?'
জায়েদ কিছুক্ষণ চুপ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মা বললেন,
'কীরে চুপ করে আছিস যে?'
জায়েদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
'মা, তোমার বিবেক বুদ্ধি দেখে আমি হতভম্ব।'
'মানে?'
'মানে তোমার মেয়ে জাকিয়া যখন কনসিভ করল, তখন সাথে সাথে তুমি তাকে এনে এখানে রাখলে। এক বছরের বেশি সময় এখানেই ছিল। বাচ্চা হওয়ার প্রায় চারমাস পর নিজের বাড়ি গেল।
তাকে তুমি এখানে রেখেছিলে যাতে তার সঠিক যত্ন হয়। অথচ তুমি নিজে তো তনুর যত্ন করছোই না, শেষ সময়ে ওর মা একটু যত্ন করবে তাতেও তোমার বাঁধছে। জানো তো মা, আমার সত্যি অবাক লাগছে।
তুমি মানুষ একজন অথচ তোমার বিবেক বিবেচনা দুই রকম। তনু অসুস্থ, তার উপর ঝিলিক ছোটো। ওকে সামলাতে হয়, ওর সব কাজ করতে হয়। তুমি তো ঝিলিকের দাদি, তুমি তো পারো ঝিলিককে একটু দেখাশোনা করতে? তা তো করছোই না উল্টো সংসারের সকল কাজ তনুর মাথায় চাপিয়ে দিয়েছো।
মা, তুমি কী মা হওনি? তোমার তখনকার কষ্টের কথা মনে পড়ছে না? তুমি, তনুর সাথে সবসময় অন্যায় করো। ও অসুস্থ হলে দ্রুত বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দাও, যাতে তোমার কষ্ট করতে না হয়। সুস্থ হবার আগেই বাড়ি ফেরার জন্য চিল্লাপাল্লা করো। তনু ভালো মেয়ে, কিন্তু সে নিজের ভালো বুঝে না; সে কারণে সবকিছু চুপচাপ সহ্য করে।
যে মেয়েরা নিজের ভালো একটু হলেও বুঝবে সে তোমার মতো শাশুড়ির সাথে মিলে সংসার করতে চাইবে না। আমি সংসারের শান্তির কথা ভেবে সবসময় চুপ থাকি। ভাবি তুমি কষ্ট পাবে।
তবে তোমার কষ্ট দেখতে গিয়ে আমি আমার স্ত্রী, সন্তানদের সাথে অন্যায় করছি। তুমি একটু তনুর খেয়াল না রাখতে পারো। ওর কষ্ট যাতে না বাড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে পারো? তুমি বরং ওর কষ্ট যাতে বাড়ে সে চেষ্টা করো।
এই যে ডাক্তার ওকে এখন বেশি বেশি বিশ্রাম করতে বলেছে তুমি করতে দিয়েছো? বিয়ের পর থেকে তনুকে আমি নিজের কাছে নিয়ে রাখতে চাইতাম। তনু কখনো যেতে চায়নি। ও সবসময় বলেছে, ও নিজে যৌথ পরিবারে বড়ো হয়েছে। মিলেমিশে থাকার মাঝে ও আনন্দ পায়।
ও এখানে তোমার সাথে বাবার সাথে থাকতে চায়। তবে ও যেমন তোমার সাথে মিলে থাকতে আনন্দ পায়, তুমি বোধহয় তেমন ওকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাও। মা, তুমি ওর সাথে যা করো সবই আমি শুনি জানি।
না তনু কখনো বলেনি। বলেছে বাবা নিজে। তিনি ফোন করে তোমার করা সকল কিছুই বলেন। তিনিই বলেন তনুকে আর ঝিলিককে নিয়ে যেতে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তনুর বেবি হলে আমি ওকে আমার কাছে নিয়ে যাব। ততদিন তনু, ঝিলিক তনুদের বাড়ি থাকবে। এখন নিলে সংসার নতুন করে সাজাতে গোছাতে তনুর কষ্ট হবে।'
শাশুড়ি মা হতভম্ব হয়ে বললেন, 'তুই বউ নিয়ে আলাদা হবি?'
জায়েদ কঠিন কণ্ঠে বলল, 'হ্যাঁ।'
'এত বড়ো পাপের কথা বলতে তো বুক কাঁপল না।'
'এখানে পাপের কী বললাম?'
'বউ নিয়ে আলাদা হবি। বাবা-মাকে দূরে রাখবি এটা পাপের না?'
পুরোটা পড়ুন বইতে কিংবা বইটই তে। দ্রুত পড়তে চাইলে বইটই থেকে সংগ্রহ করুন। ৩০% ছাড়ে আর হার্ডকাভার সংগ্রহ করতে চাইলে আমাকে ইনবক্স করুন। আগামী সাতদিন আমি অর্ডার নিব। আর ই-বুক লিংক কমেন্ট বক্সে দেওয়া হলো।

0 Comments