মিস্টার ইয়াসিনের মুখের রঙ ধীরে ধীরে সাদা হয়ে গেল। যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার সমস্ত আত্মবিশ্বাস, সমস্ত অহংকার এবং সমস্ত নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ ভেঙে ধুলোয় মিশে গেছে। হলরুমে উপস্থিত শত শত অতিথি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
কেউ ফিসফিস করে কথা বলছিল, কেউ আবার অবিশ্বাস নিয়ে একবার আমার দিকে, একবার মাহবুব করিমের দিকে তাকাচ্ছিল। কিছুক্ষণ আগেও আমি ছিলাম তাদের চোখে একজন সাধারণ মেয়ে, যে নিজের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার অপমান চুপচাপ সহ্য করেছে। অথচ এখন একই মানুষগুলো বুঝতে পারছিল, তারা এতদিন একজন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে চিনেইনি।
তানহা রহমানের মুখের হাসি সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেছে। তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার বাবা সামিউল রহমান সামনের সারিতে বসে ছিলেন।
এতক্ষণ পর্যন্ত তিনি এই বিয়েকে নিজের আরেকটি সফল ব্যবসায়িক চুক্তি হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু এখন তার মুখেও উদ্বেগের ছাপ দেখা দিল। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন করিম ট্রাস্টের নাম কতটা শক্তিশালী।
দেশের বহু ঐতিহাসিক সম্পদ, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং বিলিয়ন ডলারের সম্পদ সেই ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয়।
মিস্টার ইয়াসিন কাঁপা গলায় বলল, না, এটা কোনো ভুল। নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। এই সম্পত্তি আমাদের পরিবারের হাতে প্রায় বিশ বছর ধরে আছে।
মাহবুব করিম শান্ত স্বরে বললেন, আপনাদের হাতে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল। মালিকানা কখনোই ছিল না। আর সেই দায়িত্বের মেয়াদ তিন মাস আগে শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। আপনার আইন বিভাগ সেই নোটিশ গ্রহণও করেছে।
হলরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আইনজীবী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বিষয়টি নিশ্চিত করলেন।
শারমিন চৌধুরীর মুখে অবিশ্বাস। তিনি বললেন, আমরা কোনো নোটিশ পাইনি।
আইনজীবী ফাইল খুলে একটি কাগজ বের করলেন।
তিনি বললেন, এটি গ্রহণের স্বাক্ষর। আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রধান আইনি উপদেষ্টা নিজ হাতে স্বাক্ষর করেছেন।
শারমিন চৌধুরী যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
আমি নীরবে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলাম। আমার ভেতরে কোনো উল্লাস ছিল না। ছিল শুধু এক ধরনের শান্তি। গতকাল এই মানুষগুলো আমাকে অপমান করেছিল। তারা ভেবেছিল আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। অথচ আজ তাদের নিজেদের তৈরি মঞ্চেই সত্য প্রকাশ পাচ্ছে।
মিস্টার ইয়াসিন হঠাৎ আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে প্রথমবারের মতো ভয়।
সে বলল, মিথিলা... তুমি এসব জানাতে পারতে।
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালাম।
তারপর শান্ত স্বরে বললাম, তুমি কি আমাকে সুযোগ দিয়েছিলে?
সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ উত্তর তার জানা ছিল।
গতকাল সে আমার বিয়ের পোশাক আবর্জনার ব্যাগে ভরে দিয়েছিল। আমার কান্নাকে উপহাস করেছিল। আমাকে এমনভাবে সরিয়ে দিয়েছিল যেন আমি তার জীবনের একটি তুচ্ছ ভুল।
আজ সেই ভুলের মূল্য তাকে দিতে হচ্ছে।
ঠিক তখন সামিউল রহমান উঠে দাঁড়ালেন।
হলরুম আবার নীরব হয়ে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে এলেন।
তার মুখ কঠিন।
তিনি প্রথমে মাহবুব করিমের দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে।
অবশেষে মিস্টার ইয়াসিনের দিকে ফিরে বললেন, তুমি আমাকে বলেছিলে এই সম্পত্তি তোমাদের পারিবারিক মালিকানাধীন।
মিস্টার ইয়াসিন কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
সামিউল রহমান আবার বললেন, তুমি আমাকে বলেছিলে এই প্রাসাদ, এই জমি, এই ব্র্যান্ড সব তোমাদের।
কিন্তু এখন বুঝছি বাস্তবতা ভিন্ন।
তার কণ্ঠে স্পষ্ট অসন্তোষ।
তানহা দ্রুত এগিয়ে এসে বলল, বাবা, নিশ্চয়ই কোনো ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে।
কিন্তু সামিউল রহমান মেয়ের কথায় গুরুত্ব দিলেন না।
তিনি ব্যবসায়ী মানুষ।
অনুভূতির চেয়ে বাস্তবতা তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সোজা বললেন, আমি মিথ্যার ওপর কোনো অংশীদারিত্ব গড়ি না।
এই একটি বাক্য যেন মিস্টার ইয়াসিনের বুকের ওপর আঘাত করল।
কারণ তার নতুন রিসোর্ট প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ছিলেন সামিউল রহমান।
সেই বিনিয়োগ ছাড়া প্রকল্পটি কার্যত অচল।
সামিউল রহমান নিজের সহকারীকে ডাকলেন।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি ফাইল তার হাতে তুলে দেওয়া হলো।
তিনি ফাইল খুলে কিছু কাগজে স্বাক্ষর করলেন।
তারপর বললেন, আমাদের বিনিয়োগ চুক্তি এই মুহূর্ত থেকে স্থগিত করা হলো।
হলরুমে আবার গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
মিস্টার ইয়াসিন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
সে চিৎকার করে বলল, আপনি এমন করতে পারেন না।
সামিউল রহমান ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আমি আমার অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করব, সেটা আমার সিদ্ধান্ত।
তারপর তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না।
নিজের আসনে ফিরে গিয়ে বসে পড়লেন।
তানহার মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট।
কারণ সে বুঝতে পারছিল, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এদিকে অতিথিদের মধ্যে আলোচনা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
কেউ বলছে, করিম পরিবারের উত্তরাধিকারী এতদিন নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিল।
কেউ বলছে, ইয়াসিন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছে।
কেউ আবার বলছে, এ ঘটনা ব্যবসায়িক জগতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে।
আমি ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আমার উপস্থিতিতে চারপাশ আবার শান্ত হয়ে গেল।
মাহবুব করিম আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সিদ্ধান্ত আপনার।
আমি কিছুক্ষণ নীরব রইলাম।
তারপর বললাম, আজ কোনো প্রতিশোধের দিন নয়।
সবাই অবাক হয়ে গেল।
আমি বললাম, আমি কাউকে অপমান করতে আসিনি।
যা ঘটছে, তা শুধু আইনি প্রক্রিয়ার অংশ।
কিন্তু যারা অন্যকে অপমান করে নিজেদের শক্তিশালী ভাবে, তারা একদিন না একদিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই।
আমার কথা শুনে কয়েকজন অতিথি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
মিস্টার ইয়াসিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
গতকাল যে মানুষটি নিজেকে বিজয়ী ভাবছিল, আজ সে সবার সামনে অসহায়।
আমি আর কোনো কথা বললাম না।
ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে নেমে এলাম।
ঠিক তখনই একজন কর্মচারী দ্রুত ভেতরে ঢুকল।
তার মুখে উদ্বেগ।
সে সরাসরি মিস্টার ইয়াসিনের কাছে গিয়ে কিছু কাগজ দিল।
ইয়াসিন কাগজগুলো হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।
আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
শারমিন চৌধুরী উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?
ইয়াসিন উত্তর দিল না।
তার হাত কাঁপছিল।
অবশেষে কাগজগুলো মায়ের হাতে তুলে দিল।
শারমিন চৌধুরী পড়েই হতবাক হয়ে গেলেন।
কারণ সেটি ছিল ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নোটিশ।
রিসোর্ট প্রকল্পের ঋণ পর্যালোচনার জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ বিনিয়োগকারী সরে যাওয়ার খবর ব্যাংকের কাছেও পৌঁছে গেছে।
ঋণ না পেলে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে।
আর প্রকল্প বন্ধ হলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
শারমিন চৌধুরী চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার মুখে আর আগের অহংকার নেই।
আমি দূর থেকে সব দেখছিলাম।
কোনো আনন্দ লাগছিল না।
শুধু মনে হচ্ছিল, মানুষ নিজের কর্মফল থেকে কখনো পালাতে পারে না।
গতকাল তারা আমাকে তুচ্ছ ভেবেছিল।
আজ তারা বুঝতে পারছে, একজন মানুষের মূল্য তার অর্থ কিংবা অবস্থানে নয়।
তার চরিত্রে।
তার সম্মানে।
তার সততায়।
বাইরে তখন সূর্য ডুবতে শুরু করেছে।
সোনালি আলো জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে।
আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করলাম, আমার জীবনের একটি অধ্যায় সত্যিই শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু আমি তখনও জানতাম না, প্রকৃত ঝড় এখনও শুরুই হয়নি।
কারণ কয়েক ঘণ্টা পর এমন একটি সত্য প্রকাশ পেতে চলেছে, যা শুধু মিস্টার ইয়াসিনের ব্যবসা নয়, তার পুরো পরিবারের অতীতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে।

0 Comments