পরনারীর_ছায়া

 

পরনারীর_ছায়া

বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা বছর আমার কাছে জীবনটা ছিল শ্রাবণের ভেজা দুপুরের মতো নরম, স্নিগ্ধ, আশাব্যঞ্জক। আমি বিশ্বাস করতাম, ভালোবাসা মানে দুটি মানুষের একই আকাশের নিচে পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটা। একজনের ক্লান্তিতে অন্যজনের কাঁধে আশ্রয় নেওয়া।

কিন্তু সময় বড় অদ্ভুত শিল্পী। সে কখন যে রঙিন ছবির ওপর ধূসরতার প্রলেপ দেয়, কেউ বুঝতে পারে না।
আমার নাম সুবর্ণা।আমার স্বামীর নাম ইমতিয়াজ তাইমুর।তিনি বেসরকারী অফিসের বেশ বড় পদেই চাকুরী করেন।আমাদের বিয়ের তখন তিন বছর চলছে।
একদিন আমি খেয়াল করলাম, আমার স্বামী আর আগের মতো চোখ তুলে অপলক ভাবে আমার দিকে তাকায় না। যে চোখ একসময় আমাকে দেখে বিস্মিত হতো, যেই চোখে আমি আমার জন্য ভালোবাসা দেখতাম, সেই চোখ যেন এখন অন্য কোথাও ব্যস্ত।তার চোখের দিকে তাকালেই আমার মনে হতো,ঘরের ভেতর মানুষটা থাকলেও মন যেন ঘরের বাইরে, অন্য কোনো অচেনার দিকে ছুটে চলেছে।
আমি প্রথম কয়টা দিন, বিষয়টা বুঝতে পেরেও কিছু বলেনি। কারণ ভালোবাসার মানুষকে সন্দেহ করতে আমার ভীষণ কষ্ট হতো। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কাজের চাপ বেড়েছে লোকটার, হয়তো জীবনের ক্লান্তিতে লোকটা এমন অদ্ভূত গোছের হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কিছু সত্য ঠিক শরতের কাশফুলের মতো ঝলমলে।যা দূর থেকে আন্দাজ করলেও ঠিক চিনে নেওয়া যায়।
এক সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি আমার স্বামীর ফোনে রিফা নামের এক মেয়ে কলিগের সাথে ঘনিষ্ঠতা পূর্ণ কথোপকথন দেখে ফেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার স্বামীর হৃদয়ে অন্য কারও ছায়া জন্ম নিয়েছে। মানুষটা এখন নতুন মুখের প্রশংসায় মুগ্ধ হচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম আমার স্বামি তাহলে এই নতুন কণ্ঠের অপেক্ষায় থাকে, নতুন কারও উপস্থিতিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
আমি এই ঘটনার এক সপ্তাহ পর আমার বাবাল বাড়ি চলে আসি।তবে অদ্ভুত ব্যপারটা কি জানেন?আমি এক মাসের বেশি বাবার বাড়িথেই আছি,তবুও আমার স্বামী এই এতো গুলো দিনের মাঝে একদিনও ফোন করে আমার খবর টুকুও নিল না। অথচ বিয়ের প্রথম কয়টা দিন আমাকে তিনি চোখের আড়ালও করতে চাইতেন না।তিনি বলতেন,
" তুমি আমার সুখ পাখি। সাবধান! বাপের বাড়ি যাওয়ার নাম একদম নিবে না। এই বরটা তো তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না,তা জানো না বুঝি। "
সন্ধ্যা নামার পর ছাদে এসে দেখলাম।আকাশে রূপালি চাঁদ ঝলমল করছে। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, আমার জীবনের আকাশ থেকে আলোটা যেন কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। আমি চাঁদটার দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাড়িয়ে । একটুও কান্না করতে পারছি না।শুনেছি অতি শোকে মানুষ নাকি পাথর হয়ে যায় আমিও তেমনটা হয়ে গিয়েছি বোধকরি। তাছাড়া কিছু কিছু দুঃখ এত গভীর হয় যে চোখের জলও সেখানে পৌঁছাতে পারে না।
রাতের পর রাত আমি ভাবতাম, একজন মানুষ কি সত্যিই আরেকজন মানুষকে এত সহজে ভুলে যেতে পারে? যে হাত ধরে সংসারের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই হাত কি অন্য কারও হাতের উষ্ণতা খুঁজে নিতে পারে?
উত্তর পায়নি আমি ।
---
এর মাসখানেক পর একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি একটি জিনিস বুঝেছিলাম কারও অবহেলা কখনো কারও মূল্য কমিয়ে দেয় না।যে মানুষ পরনারীর মোহে নিজের ঘরের ভালোবাসা দেখতে পায় না, তার দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা আছে; অবহেলিত মানুষের নয়।
আজকে সন্ধ্যার পর জানালার পাশে বসে ছিলাম। বাইরে কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরছিল।
আমি অল্প বিস্তর হেসে মনে মনে নিজেকে সান্তনা দিলাম,
"ভালোবাসা ভিক্ষা নয় যে চেয়ে নিতে হবে। ভালোবাসা তো সেই ফুল, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফোটে। জোর করে ফুটিয়ে রাখা যায় না।"
তারপর ধীরে ধীরে নিজের ভাঙা মনটাকে কুড়িয়ে নিলাম।কারণ জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—কখনো কখনো মানুষকে অন্যের ভালোবাসা হারিয়ে নিজের মর্যাদা খুঁজে নিতে হয়।আর সেই মর্যাদা টুকু যেকোনো বিশ্বাসঘাতকতার অন্ধকারের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল।
.......... সমাপ্ত..........

Post a Comment

0 Comments