ঈদের তিনদিন পর বাপের বাড়ি এসেছে কাজী বাড়ির চার মেয়ে। সেজো মেয়ে হামিদার মেজাজ কিছুটা রুক্ষ বটে। বাবা - মা, ভাই বোন কিংবা ভাবির সাথে বনিবনা না হলেই বাড়ি মাথায় তুলে। শশুর বাড়িতে নিজ শাশুড়ীর সঙ্গেও তার বনিবনা খুব একটা হয়না বললেই চলে।তাই মাসের বেশিরভাগ সময়ই সে বাপের বাড়িতে থাকে। স্বামী মালেশিয়া প্রবাসী। একটা আড়াই বছরের ছেলে সন্তান আছে।
কাজী সাহেবের চারটি মেয়ে দুটি ছেলে। বড় ছেলে বিয়ে করেছে দুটো ছেলে সন্তান আছে। মেয়েদের সে বড় ভালোবাসে। তাই তো ঈদের পর সব-কয়টা মেয়েকে একসঙ্গে করতে না পারলে মন আনচান করতে থাকে। মেয়েদের মনেও তাড়াহুড়ো কখন বাবার বাড়ি এসে পৌঁছাবে। হামিদা সবার আগেই এসে উপস্থিত হলো। তার পরক্ষণেই ছোট এবং বড় বোন চলে আসলো। হামিদা নিজ কোলের ছেলেকে ঠেলেঠুলে বোনদের কোলে দিলো। ছেলেটার নাম রিমন। ছেলেকে খালাদের কোলে দিতে দিতে বলছে "রিমন দেখো তো তোমার খালামনিরা তোমার জন্য কি মজা এনেছে।"
বড় বোন কামরুন্নাহারের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালোই। তার একটাই সাত বছর বয়সী ছেলে। বাবার বাড়িতে আসার সময় হাত ভরে ফলমূল আর বাড়ির বাচ্চাদের জন্য চিপস চকলেট নিয়ে আসেন। ছোট বোনের সদ্য বিবাহ হয়েছে। সাথে নতুন জামাই এসেছে অতএব সে-ও কম কিছু নিয়ে আসেনি। হামিদা বেশ খুশী হলো বোনদের এতো বাজার-সদাই আনতে দেখে। নিজেও বেশ আয়েশ করেই জানালো সে আসার সময় শ'খানেক লিচু আর আম নিয়ে এসেছে।
সবার শেষে উপস্থিত হলো মেঝো বোন আদিবা। আদিবা চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে, অপ্রয়োজনীয় কাজ কিংবা কথা কোনো টাই তার থেকে আশা করা যায় না। শশুর বাড়িতে সম্মান খুব একটা পায় না বললেই চলে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা কিছুটা কম কারণ বিয়ের চার বছরের তার কোনো সন্তান হয়নি। স্বামীর আয়ও বেশি নয়। শশুর বাড়িতে আসার সময় হাত ভরে ফলমূল নিয়ে আসতে পারে না তবে চেষ্টার কমতি থাকে না। মাঝেসাঝে আদিবার সঙ্গে একটুখানি বাকবিতন্ডায় হয়েই যায়।
আজ আদিবা একা এসেছে, শশুর বাড়ির কেউ বা স্বামীও সঙ্গে আসেনি। বাড়ির বাচ্চাদের জন্য চিপস চকলেট আর কিছু জুস নিয়ে এসেছে দেখতে পেয়েই হামিদা মজার ছলে বলে উঠলো, " আপু শুধু বাচ্চাদের জন্য চিপস চকলেট নিয়ে চলে আসছেন? বড়দের জন্য কিছু আনলেন না যে?"
আদিবা বোরকা হিজাব খুলতে খুলতে বড় ভাইপোটাকে ডেকে বললো," একটু পানি খাওয়াও তো বাবা।" এরপর হামিদার উদ্দেশ্য বললো,"বাচ্চারা খেলেই বাচ্চার মায়েদের পেট ভরবে।"
হামিদার খুব একটা পছন্দ হলো না কথাটা। আদিবা একটু কাছে এসে রিমনকে কোলে নিতে চাইতেই হামিদা ছেলেকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে বললো, "আমার ছেলেকে কোলে নিতে হবে না আপা। আপনার আরও ভাইপো, বোনের ছেলে মেয়ে আছে তাদেরকে গিয়ে কোলে নেন।"
আদিবা সরে আসলো। তার বোনের স্বভাব সম্পর্কে সে অবগত। নিজের ছেলেকে খুব একটা কাছে নিতেও দেয় না।এসবে অবশ্য কষ্ট পায় মেয়েটা কিন্তু তা-ও মুখ ফুটে কিছু বলে না। রুম থেকে বের হয়ে এসে ভাবির সঙ্গে দেখা করতে আসলো।
বড় ভাবি রুমা। দেখতে শুনতে ভালো। দুটো সন্তানের মা। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক মধুর। বিয়ে করেছে তিন বছর প্রেম করে। শশুর বাড়ির লোকদের সঙ্গে মেলামেশা থাকলেও বনিবনা কমই। কখনো ভালো আবার কখনো ঝগড়াঝাটি চলে। প্রেমের বিয়ে বলে কম কথাও শুনতে হয়নি তাকে। আদিবা তখন অবিবাহিত ছিল। সবাই যখন ভাবিকে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ছোট করে, খোঁটা দিয়ে কথা বলতো আদিবা প্রতিবাদ করতো। ভাবির পাশে দাঁড়াতো। সেই ভাবিও আজকাল খুব একটা দেখতে পারে না আদিবাকে। শশুর বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো না, স্বামীও লাখপতি নয় এমন মেয়ের মান বাপের বাড়িতে খুব একটা থাকে না বোধহয়। অন্য ননদ আর ননাসের সঙ্গে যতটা তেলতেলে সম্পর্ক আদিবার সঙ্গে ততটাও নয়। কেবল জোর করে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে কেমন আছো? কখন আসলে? কখন যাবে? এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ।
কাজী বাড়ি এসে সবচেয়ে বেশি যার আদর যত্ন আদিবা পেয়ে থাকে সে'জন হচ্ছে তার মা শিরিনা বেগম। মায়ের ভালোবাসা সব মেয়ের জন্য থাকলেও আদিবার জন্য শিরিনা বেগমের একটু বেশিই মায়া কাজ করে। আদিবা কলপাড়ে এসে দেখলো মা সবজি ধুচ্ছে।
" আম্মা ভালো আছেন?"
তখন প্রায় মাগরিবের ওয়াক্ত। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। শিরিনা মেয়ের কন্ঠস্বর শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। স্মিত হেঁসে বললো, "আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ রাখছে ভালো। তুমি কেমন আছো আদিবা?"
" ভালো আছি আম্মা। আমাকে দেন আমি ধুয়ে দিচ্ছি। আজান পড়ে গেলো রান্না শেষ হয়নি এতক্ষণে ধোয়ামোছার কাজ হচ্ছে যে?"
কথাটা বলতে বলতে আদিবা মায়ের দিকে এগিয়ে গেলেও শিরিনা মেয়ের হাতে সবজির গামলাটা না দিয়েই বললো, " দেরি হয়ে গেলো। সবাই একসাথে হইছে তো আড্ডা দিতাছে। কাজকামের খবর নাই।
আদিবার কানে শোরগোল এসেছে। বড় ভাবি, আর বাকি বোনেরা মিলে আড্ডায় মেতেছে। আদিবাও জয়েন হবে তবে সে যেহেতু এখনই এসেছে বাড়িতে তাই সবার সাথে দেখা করার কাজটা সেরে নিচ্ছে। বাবা বাড়িতে নেই, বাজারে সে। রাতে আসবে। কাকি জেঠিমা দের সাথে দেখা করে আসলো। সব শেষে দাদীর সঙ্গে দেখা করলো। দাদী ছোট কাকার সঙ্গে থাকে। বাড়িতে আসলে আদিবার সর্বপ্রথম কাজ সবার দরজায় গিয়ে উপস্থিত হয়ে সালাম কালাম করা। অন্য সব বোনেরা ওতো তাড়াহুড়ো করে না এসবে। সামনে পড়লে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে নেয়। কিন্তু আদিবা বেশ দায়িত্ব নিয়েই সবার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে। বাপের বাড়ির বাতাসটাকেও তার বড় আপন আপন লাগে।
ঈদের কিছুদিন আগেই কাজী সাহেবের ছোট ছেলে রাশেদের বিয়ে পাকাপোক্ত করে রাখা হয়েছিল। পাশের গ্রামের হাশেম মোল্লার মেয়ে রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে। ঈদের পর অনুষ্ঠান করে মেয়ে উঠিয়ে আনা হবে কথা ছিল। সবাই বিয়েই নিয়েই আলাপ করছে। আদিবা মাগরিবের নামাজ পড়তে গেলো। নামাজ শেষ করে ফোন হাতে নিতেই ফিরোজের ফোনকল পেলো।
" আসসালামু আলাইকুম।"
" ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কখন গিয়ে পৌঁছালে?"
" মাগরিবের কিছুক্ষণ আগেই।"
" জানালে না তো?"
" নামাজ শেষ করেই জানাবো ভেবেছি।"
ফিরোজ শেখ বললো, " ঠিক আছে রাখি।"
আদিবা কিছুটা আমতাআমতা করেই বললো," শুনুন।"
" হ্যাঁ বলো?"
" আপনি বিয়েতে আসবেন না?"
" দেখি চেষ্টা করবো।"
" আব্বা আম্মা আসবে তো?"
" কি জানি! তুমি আসার সময় তাদেরকে বলে আসোনি?"
" জি বলে এসেছি।"
" তাহলে আর কি? দাওয়াত তো পৌঁছে গেছে। পরে তোমার আব্বাকে বলিও আরেকবার দাওয়াত করতে।"
আদিবা বললো ঠিক আছে। এরপর কল কেটে দিলো। সারারাতে এইটুকুই তাদের আলাপ। এরপর কাল দিনে আর কল দিতেও পারে, না-ও দিতে পারে। রাতে একবার দিয়ে ভালো মন্দ খোঁজ নিবে ব্যস। বিয়ের চার বছরে আদিবার প্রাপ্তি এতোটুকুই। স্বামী তাকে খুব যে ভালোবাসে তেমনটা নয়, আবার খুব যে অবহেলা করে সেটাও নয়। যদি হতোই তাহলে তালাকের কথা মুখে আনতো হয়তো। যেটা উনি করেনি। আর তাই আদিবা এতোটুকুতেই খুশী।
পরদিন সকাল এগারোটা নাগাদ রাজিয়াদের বাড়ি থেকে তিন চারজন মুরব্বি এসেছেন বিয়ে নিয়ে আরও কিছু কথাবার্তা বলতে। বড় ভাবি রুমা এবং আদিবাই সমস্তটা দেখাশোনা করেছে। নাস্তা - পানি দিয়েছে। শিরিনা বেগম অনেক অসুস্থ মানুষ, প্রায় অসুস্থ থাকে। তাই সে অনেক কাজই করতে পারে না। রুমা এবং তার মেয়েরাই সামলায়। মেহমান যে এসেছে সেসবে তার কোনো কৃতিত্ব নেই।
হামিদা গিয়েছে গোসল করতে। তার ছেলেটা তখন ঘুমে। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে চিৎকার শুরু করলো। আদিবা হাতের কাজ ফেলে রেখে এদিকে আসতে পারলো না। শিরিনা বেগম বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনে ধীরেধীরে উঠে আসার চেষ্টা করলেন। ততক্ষণে হামিদা তড়িঘড়ি করে রুমে এসে দেখলো তার ছেলে কাঁদছে। এই দৃশ্য তার মোটেও হজম হলো না। ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে মেহমানের সামনেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলো এই বলে যে, এতো গুলো মানুষ থাকতেও তার ছেলে কাঁদবে কেনো? কেনো কেউ তার ছেলেকে কোলে তুলে নিলো না? রাগের চোটে মুখ দিয়ে যা আসলো তাই বললো।
বড় বোন কামরুন্নাহার এসে হামিদাকে একটা ধমক দিয়ে বললো, " এ ভাবে চেঁচামেচি করছো কেনো হামিদা? বাড়িতে মেহমান আছে ভুলে গিয়েছো? দিনদিন বেয়াদব হচ্ছো যে? মানসম্মান সব গিলে খাবে দেখছি।"
কামরুন্নাহার বড় বোন হয়ে এতোটুকু শাসন ছোট বোনকে করতেই পারে। কিন্তু হামিদার এসব হজম হলো না। সে ছেলেকে কোলে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো, যে বাড়িতে তাকে অপমান করা হয় সেই বাড়িতে আর সে পা রাখবে না।
আদিবা দূর থেকে সমস্ত দৃশ্যটাই নীরবে দেখল। বুক চিরে বেরিয়ে এলো একটা দীর্ঘশ্বাস। অতঃপর মনে মনে ভাবলো, অপমান যদি এত সহজে গায়ে লাগাতো তবে বাপের বাড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়ি কোথাও তার ঠাঁই হতো না।

0 Comments