প্রশ্ন ছিল, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার আগে সে নিজেকে কতটা বাঁচাতে পারবে।
সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রুশা অনেকক্ষণ গাড়ির ভেতরে বসে ছিল। শহরের ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছিল, মানুষ নিজেদের জীবনের কাজে ব্যস্ত ছিল, অথচ তার মনে হচ্ছিল পৃথিবী যেন হঠাৎ থেমে গেছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেও সে নিজেকে একজন সুখী, সফল এবং স্থিতিশীল নারী বলে ভাবত। তার একটি সুন্দর সংসার ছিল, ভালো চাকরি ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা ছিল। আজ সবকিছু একই জায়গায় আছে, কিন্তু তার জীবনের ভিত্তিটাই যেন ভেঙে পড়েছে।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে দেখল মিস্টার ইয়াসিন ড্রয়িংরুমে বসে আছে। টেবিলের ওপর কয়েকটি পুরোনো ছবি ছড়িয়ে রাখা। তাদের বিয়ের ছবি। প্রথম বাড়ি কেনার সময়ের ছবি। পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার ছবি। এমনকি তাদের সপ্তম বিবাহবার্ষিকীর ছবিও সেখানে ছিল।
ইয়াসিন ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
রুশা একবারও এগিয়ে গেল না।
সে জানত এই ছবিগুলো এখন আর কোনো অর্থ বহন করে না।
যে মানুষ স্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি, সে স্মৃতিকে সামনে রেখে অনুশোচনা দেখালেও সেই অনুশোচনার মূল্য খুব বেশি থাকে না।
ইয়াসিন ধীরে বলল,
আমরা কি সত্যিই সব শেষ করে ফেলছি?
রুশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিল,
আমরা না। তুমি অনেক আগেই শেষ করে ফেলেছ।
ইয়াসিন মাথা নিচু করল।
রুশা আর দাঁড়াল না।
সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।
পরদিন সকালেই সে একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর অফিসে পৌঁছাল।
মহিলার নাম ছিল সাবরিনা রহমান।
দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে তিনি বিবাহবিচ্ছেদ এবং আর্থিক প্রতারণা সংক্রান্ত মামলায় কাজ করছেন।
রুশা প্রথমে ভেবেছিল, নিজের জীবনের গল্প কাউকে বলতে গেলে হয়তো ভেঙে পড়বে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে পুরো ঘটনা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।
মার্সিডিজের দুর্ঘটনা।
তানহা।
গোপন অ্যাপার্টমেন্ট।
ব্যাংক হিসাব থেকে উধাও হওয়া টাকা।
সবকিছু।
সাবরিনা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
তারপর সামনে রাখা ফাইল বন্ধ করে বললেন,
আপনি কি আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করতে প্রস্তুত?
রুশা এক মুহূর্তও সময় নিল না।
হ্যাঁ।
সাবরিনা মাথা নেড়ে বললেন,
তাহলে প্রথম কাজ হবে সমস্ত আর্থিক নথি সুরক্ষিত করা। আমি অনেক মামলায় দেখেছি, যখন একজন প্রতারক বুঝতে পারে সত্য প্রকাশ হতে যাচ্ছে, তখন সে দ্রুত প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করে।
রুশার বুক ধক করে উঠল।
মানে ইয়াসিনও এমন কিছু করতে পারে?
সাবরিনা বললেন,
আমি নিশ্চিত করে কিছু বলছি না। কিন্তু প্রস্তুত থাকাই ভালো।
সেদিনই তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা শুরু করলেন।
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রুশার মনে হলো, বহুদিন পর সে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজের হাতে নিচ্ছে।
কিন্তু ঠিক সেই সময় অন্যদিকে আরেকটি ঝড় তৈরি হচ্ছিল।
তানহা তার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে বসে ছিল।
গত কয়েক সপ্তাহে তার জীবনও বদলে গেছে।
দুর্ঘটনার পর থেকে পুলিশ বারবার যোগাযোগ করছে।
বীমা কোম্পানির লোকজন প্রশ্ন করছে।
আর সবচেয়ে বড় বিষয়, ইয়াসিন আগের মতো নেই।
আগে সে প্রায় প্রতিদিন সময় দিত।
এখন ফোন ধরতেও দেরি করে।
তানহার মনে অস্বস্তি জমতে শুরু করেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় ইয়াসিন সেখানে পৌঁছালে তানহা সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
তোমার স্ত্রী কি সত্যিই ডিভোর্সের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
ইয়াসিন চুপ করে রইল।
তানহা আবার বলল,
আমাকে সত্যি বলো।
ইয়াসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
হ্যাঁ।
তানহার মুখের রং বদলে গেল।
কিন্তু তুমি তো বলেছিলে তোমাদের সম্পর্ক অনেক আগেই শেষ।
তোমরা শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে একসঙ্গে আছ।
ইয়াসিন কিছু বলল না।
এই নীরবতা তানহার ভালো লাগল না।
তার মনে প্রথমবারের মতো সন্দেহ জাগল।
সে কি পুরো সময়টাই মিথ্যার মধ্যে ছিল?
এদিকে রুশা নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু এক সপ্তাহ পর এমন একটি ফোন পেল, যা পুরো পরিস্থিতিকে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দিল।
ফোনটি এসেছিল ব্যাংক থেকে।
ম্যাডাম, আপনার যৌথ অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত কিছু অস্বাভাবিক তথ্য আমরা পেয়েছি।
রুশা দ্রুত ব্যাংকে পৌঁছাল।
সেখানে একজন সিনিয়র কর্মকর্তা তাকে একটি রিপোর্ট দেখালেন।
রিপোর্ট দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
গত দুই বছরে শুধু টাকা সরানো হয়নি।
তার নামে একটি ব্যক্তিগত ঋণও নেওয়া হয়েছে।
প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার ডলার।
রুশা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
এটা অসম্ভব।
আমি কোনো ঋণ নিইনি।
কর্মকর্তা বললেন,
নথিতে আপনার ডিজিটাল অনুমোদন রয়েছে।
রুশার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে নথি পরীক্ষা করতে শুরু করল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল।
অনুমোদনটি জাল করা হয়েছে।
তার স্বাক্ষরের অনুকরণ করা হয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তা গম্ভীর মুখে বললেন,
যদি এটি সত্যি হয়, তাহলে এটি শুধু বিবাহবিচ্ছেদের বিষয় নয়। এটি ফৌজদারি অপরাধও হতে পারে।
রুশা চুপচাপ বসে রইল।
মার্সিডিজের দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হওয়া ঘটনাগুলো এখন এক ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে ইয়াসিনের সামনে রিপোর্টটা রাখল।
ইয়াসিন প্রথম পৃষ্ঠা দেখেই স্থির হয়ে গেল।
রুশা বলল,
এবার কী ব্যাখ্যা করবে?
ইয়াসিন কাঁপা গলায় বলল,
আমি ভেবেছিলাম পরে সব ঠিক করে দেব।
রুশা বিশ্বাস করতে পারছিল না।
মানে তুমি স্বীকার করছ?
ইয়াসিন চোখ বন্ধ করল।
আমি ব্যবসায় কিছু সমস্যায় পড়েছিলাম।
টাকা দরকার ছিল।
তাই...
তাই আমার পরিচয় ব্যবহার করেছ?
আমার স্বাক্ষর জাল করেছ?
আমার নামে ঋণ নিয়েছ?
ইয়াসিন কোনো উত্তর দিল না।
রুশা অনুভব করল তার সামনে বসে থাকা মানুষটি আসলে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি।
আট বছর ধরে সে কাকে ভালোবেসেছে?
একজন স্বামীকে?
নাকি একজন দক্ষ প্রতারককে?
পরবর্তী কয়েক দিন রুশা আরও তথ্য খুঁজতে লাগল।
আর প্রতিদিনই নতুন কিছু সামনে আসছিল।
একটি ক্রেডিট কার্ড।
দুটি গোপন অ্যাকাউন্ট।
অপ্রকাশিত ঋণ।
আরও কয়েকটি সন্দেহজনক লেনদেন।
মনে হচ্ছিল, ইয়াসিন বছরের পর বছর ধরে নিজের চারপাশে মিথ্যার একটি দুর্গ তৈরি করেছে।
এবং এখন সেই দুর্গের দেয়ালগুলো একে একে ভেঙে পড়ছে।
অন্যদিকে তানহাও অস্বস্তিকর কিছু তথ্য জানতে শুরু করেছিল।
একদিন সে কাকতালীয়ভাবে ইয়াসিনের ল্যাপটপে একটি পুরোনো ইমেইল দেখতে পেল।
সেখানে অন্য এক নারীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ কথোপকথন ছিল।
তারিখ তিন বছর আগের।
তানহার বুক কেঁপে উঠল।
কারণ তখনো তার সঙ্গে ইয়াসিনের পরিচয় হয়নি।
মানে সে প্রথম নারী নয়।
সে বিশেষ কেউ নয়।
সে শুধু আরেকজন।
সেদিন রাতে তানহা প্রথমবার ইয়াসিনকে প্রশ্ন করল,
তোমার আগে আর কেউ ছিল?
ইয়াসিন উত্তর দিতে দেরি করল।
আর সেই দেরিই যথেষ্ট ছিল।
তানহার মনে হলো, সে যেন নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছে।
যেভাবে রুশাকে মিথ্যা বলা হয়েছিল, আজ ঠিক একইভাবে তাকেও মিথ্যা বলা হয়েছে।
এদিকে সাবরিনা রহমান দ্রুত মামলা প্রস্তুত করছিলেন।
একদিন তিনি রুশাকে ডেকে বললেন,
আমার মনে হচ্ছে বিষয়টি আপনার ধারণার চেয়েও বড়।
রুশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
মানে?
সাবরিনা একটি ফাইল এগিয়ে দিলেন।
আমরা প্রাথমিক তদন্তে এমন কিছু আর্থিক নথি পেয়েছি, যেগুলো ইঙ্গিত করছে আপনার স্বামী হয়তো কর্মস্থলেও কিছু অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।
রুশা হতবাক হয়ে গেল।
কর্মস্থলেও?
সাবরিনা বললেন,
এখনো নিশ্চিত নই। কিন্তু কয়েকটি লেনদেন খুবই সন্দেহজনক।
রুশা অনুভব করল, সে যেন এক অন্তহীন অন্ধকার গুহার ভেতর ঢুকে পড়েছে।
প্রতিটি বাঁক পেরোলেই নতুন সত্য অপেক্ষা করছে।
আর প্রতিটি সত্য আগেরটার চেয়েও ভয়ংকর।
সেদিন রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে ছিল সে।
বৃষ্টি হচ্ছিল।
ঠিক সেই রাতের মতো, যেদিন সে প্রথম জানতে পেরেছিল ইয়াসিনের প্রতারণার কথা।
কিন্তু আজ সে আগের রুশা নয়।
আজ সে জানে সামনে লড়াই আছে।
কষ্ট আছে।
আদালত আছে।
অসংখ্য অপমান আছে।
তবুও সে ভয় পাচ্ছে না।
কারণ এখন তার হাতে সত্য আছে।
আর সত্য একবার জেগে উঠলে, মিথ্যার সবচেয়ে শক্ত দুর্গও বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।
আর মিস্টার ইয়াসিনের সেই দুর্গের ভাঙন এখন আর শুরু হওয়ার অপেক্ষায় নেই।
সেটি ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

0 Comments